- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

হাওরে খাদ্যচক্রে আঘাত

এনামুল হক এনি, ধর্মপাশা
অকাল বন্যায় ফসলডুবির ঘটনা হাওরপাড়ের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তায় বিরূপ প্রভাব ফেলার পাশাপাশি স্থল ও জলজ প্রাণীর পুরো খাদ্যচক্রে আঘাত হেনেছে। ফসল ডুবে যাওয়ায় কৃষক ধান সংগ্রহ করতে পারেনি। এতে একদিকে যেমন ধান-চালের অভাব, অন্যদিকে খড় সংগ্রহ করতে না পারায় দেখা দিয়েছে গো খাদ্যের সংকট। ফলে কৃষক গরু, ছাগলসহ গবাদিপশু বাধ্য হয়ে বিক্রি করে দিয়েছেন। অবশ্য গবাদিপশু বিক্রি করার প্রধান কারণ কৃষকের নিজের খাবার সংগ্রহ ও ঋণ পরিশোধ। এরই মধ্যে মাছের মড়ক দেখা দিয়েছে। এখন আবার হাওরের পানিতে খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে মরছে হাঁস; মরছে পাখ-পাখালিও।
হাওরাঞ্চলের পুরো বাস্তুসংস্থান প্রক্রিয়া যখন হুমকির মুখে, তখন গত বুধবার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহ কামাল ‘কোথাও একটি ছাগলও মরেনি’ বলে মন্তব্য করে হাওরবাসীর দুঃখের আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়েছেন। সচিব ওই সভায় বলেন, ‘দেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নামে একটি আইন আছে। এই আইনের ২২ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো এলাকার অর্ধেকের ওপরে জনসংখ্যা মরে যাওয়ার পর ওই এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করতে হয়। না জেনে যারা এমন সস্তা দাবি জানায় তাদের জ্ঞানই নেই। কিসের দুর্গত এলাকা? একটি ছাগলও তো মারা যায়নি।’
ফসলডুবির ঘটনায় সুনামগঞ্জ থেকে কিশোরগঞ্জ হাওরাঞ্চলের সর্বত্র জনপ্রতিনিধিদের থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক, কৃষক ও রাজনৈতিক সংগঠন হাওরকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি         
জানিয়ে আসছে। ধারাবাহিক আন্দোলনের কর্মসূচি দিয়েছে প্রতিবাদী মানুষের সংগঠন ‘হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন’।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, ‘২২ ধারার ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন সচিব। এই ধারায় রাষ্ট্রপতির ওপর দুর্গত এলাকার ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি যদি মনে করেন, ‘দেশের কোনো অঞ্চলে দুর্যোগের কোনো ঘটনা ঘটিয়াছে, যাহা মোকাবেলায় অতিরিক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং অধিকতর ক্ষয়ক্ষতি ও বিপর্যয় রোধে বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করা জরুরি ও আবশ্যক, তাহা হইলে সরকারি গেজেটে বিজ্ঞপ্তি জারির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলকে দুর্গত এলাকা হিসাবে ঘোষণা করিতে পারিবেন।’ হাওর আন্দোলনের এই নেতা বলেন, ‘সচিবের এই বক্তব্য অবিবেচনপ্রসূত, হাওরের মানুষ ও প্রাণিকুলের প্রতি চরম অন্যায়। এখন মাছের মড়ক লেগেছে। হাঁস ও পাখি মরছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ছাগলও মরবে। কঠিন হবে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা।’
গত কয়েকদিনে ধর্মপাশা উপজেলাতেই বিভিন্ন খামারিসহ গৃহস্থের প্রায় পাঁচ শতাধিক হাঁসের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার ডিঙ্গাপোতা হাওওে মারা গেছে কয়েকটি হাঁস। হাঁস ও পাখি মরছে হাকালুকি হাওরের মৌলভীবাজারের বড়লেখা অংশে। ধর্মপাশার রবিউর রহমানের খামারে হাঁস ছিল দেড় হাজারের মতো। গত দু’দিনে হাওরের বিষাক্ত পানিতে পচা মাছ খেয়ে অসুস্থ হয়ে ১২০টি মারা গেছে। ফলে বেঁচে থাকা অন্য হাঁসগুলো তিনি এখন আর হাওরের পানিতে ছাড়ছেন না। বাড়িতে রেখেই যতœ নিচ্ছেন তিনি। তবে আতঙ্কের বিষয়, যে কোনো হাঁস আক্রান্ত হওয়ার একদিনের মধ্যেই মারা যায়। রবিউর রহমানের বাড়ি ধর্মপাশা উপজেলার জয়শ্রী ইউনিয়নে বাদেহরিপুর গ্রামে। রবিউর রহমানের মতো ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নের সরিষাকান্দা ইসলামপুর গ্রামের খামারি আল আমিনেরও একই অবস্থা। আল আমিনের সাড়ে ৭০০ হাঁসের মধ্যে গত দু’দিনে ৭০টির মৃত্যু হয়েছে। তিনি তার হাঁসগুলো গত বৃহস্পতিবার দুপুরে পার্শ্ববর্তী জামালগঞ্জ উপজেলার সেলিমগঞ্জে আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠিয়েছেন।
ধর্মপাশা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আব্দুর রহিম মিয়া বলেন, ‘ধর্মপাশা উপজেলায় ২৬০ জন খামারি ও ছোটখাটো গৃহস্থ মিলিয়ে সাত লাখ ১৫ হাজার ৩১০টি হাঁস রয়েছে। এসব হাঁসের মধ্যে গত কয়েকদিনে প্রায় পাঁচ শতাধিক হাঁস মারা গেছে বলে স্থানীয়ভাবে জানতে পেরেছি।’
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার মাঘান-সিয়াধার ইউনিয়নের সিয়াধার গ্রামের চন্দন মিয়া বলেন, ‘আমার ৭০০ হাঁস আছে। ডিঙ্গাপোতা হাওরের পানি দূষিত হওয়ার কারণে খামারে রোগবালাই দেখা দিয়েছে এবং গত দুইদিনে ২০টি হাঁস মারা গেছে।’ এখন বাকিদের আর হাওরে নামতে দিচ্ছেন না তিনি।
নেত্রকোনার মাহনগঞ্জের গাগলাজুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, হাওরে ফসলডুবির পর কৃষকদের স্বপ্ন ছিল মাছ ধরে বেঁচে থাকার। এখন সবাই পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার আতঙ্কে ভুগছেন।
ইতিমধ্যে ধর্মপাশা ও মোহনগঞ্জের কয়েকটি হাওরের পানির উপাদান ও গুণাগুণ পরীক্ষা করা হয়েছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি গবেষক দল গত বুধবার সকালে ধর্মপাশার কাইঞ্জা ও ধারাম হাওরে এবং বৃহস্পতিবার মোহনগঞ্জের ডিঙ্গাপোতা হাওরের বিভিন্ন পয়েন্টের পানি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। গবেষণায় দেখা যায়, হাওরের পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ প্রতি লিটারে ৫ মিলিগ্রামের নিচে নেমে এসেছে এবং প্রতি লিটারে অ্যামোনিয়ার পরিমাণ বেড়েছে দশমিক পাঁচ (.৫) থেকে ১ মিলিগ্রাম পর্যন্ত। কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতি লিটারে অক্সিজেনের পরিমাণ ৬ মিলিগ্রামের বেশি এবং অ্যামোনিয়ার পরিমাণ প্রতি লিটারে শূন্য দশমিক শূন্য শূন্য দুই (.০০২) মিলিগ্রামের কম থাকার কথা। তবে বুধবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ধর্মপাশাসহ হাওরে কিছু এলাকায় টানা বৃষ্টিপাত হওয়ায় হাওরের পানির কিছুটা হলেও উন্নতি সাধন হতে পারে বলে জানান বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. সিরাজুম মনির।
মো. সিরাজুম মনির বলেন, ‘বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমানকে নিয়ে গত বুধবার ধর্মপাশা উপজেলার কাইঞ্জা ও ধারাম হাওরের বিভিন্ন পয়েন্টে পানির গুণাগুণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। এ সময় পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে কম এবং অ্যামোনিয়ার পরিমাণ স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়। পানিতে অক্সিজেন কমে যাওয়ায় অ্যামোনিয়া গ্যাসের প্রভাবে মাছ মরে যাচ্ছে। কাঁচা ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তা পঁচতে গিয়ে অক্সিজেন ব্যবহার বেশি হচ্ছে ফলে পানি তার স্বাভাবিক গুণাগুণ হারিয়েছে।

  • [১]