সদর, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, দিরাই, ধর্মপাশা, জগন্নাথপুর, তাহিরপুর, দোয়ারাবাজার, বিশ্বম্ভরপুরের হাওরগুলো ডুবছে ফলন্ত বোরো ফসলসহ। ডুবছে দুর্বল ও দুর্নীতির তথাকথিত বাঁধ ভেঙে অগভীর নদী-খালের পানি ঢুকে, ডুবছে বৃষ্টির পানি জমে থেকে। শুধুই কি বোরো ধানের সবুজ চারাই ডুবছে? না, একই সাথে সলিল সমাধি হচ্ছে লক্ষ লক্ষ কৃষকের স্বপ্ন সাধের। স্বপ্নভাঙা এইসব কৃষক আগামী বছর কী খাবেন, কৃষি কাজ করার জন্য আনা ঋণ কীভাবে পরিশোধ করবেন এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় হাবুডুবু খাচ্ছেন। কৃষি সম্প্রসারণের উপ পরিচালক শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ২ হাজার হেক্টর বোরো জমি ডুবার কথা স্বীকার করলেও বাস্তব্ েডুবন্ত ফসলি জমির পরিমাণ এরচাইতে ঢের বেশি। স্থানীয় পত্র-পত্রিকাগুলোতে যেসব হাওর ডুবার খবর প্রকাশিত হয়েছে গতকাল, সেগুলো পড়লে যে কেউ কৃষি সম্প্রসারণের এই আধিকারিকের বক্তব্যকে উড়িয়ে দিবেন। না, এ নিছক পরিসংখ্যানের খেলা নয়। এ মানুষের জীবন-জীবিকার বাঁচা-মরার প্রশ্ন। কৃষকরা বারবারই ডুবছেন আর সরকারি দায়িত্বশীলরা ডুবার বিষয়টিকে হয় অস্বীকার করেছেন নয় পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। আর হাওরের ফসল রক্ষার কাজে নিয়োজিত অকার্যকর ও দুর্নীতিবাজ প্রতিষ্ঠান পানি উন্নয়ন বোর্ডের কথা শুনলেই কৃষকরা এখন প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলে উঠেন।
হাওর অঞ্চলের বোরো ফসল ডুবার প্রধান দুইটি কারণ হলোÑ নদী ও খালগুলো খনন না করা এবং পানি আটকানোর জন্য নির্মিত বাঁধের কাজে সীমাহীন দুর্নীতি। নদী খননের কোন প্রকল্প গ্রহণ বা চিন্তা-ভাবনা সরকারের আছে বলে মনে হয় না। তবে প্রতি বছর বাঁধ নির্মাণের জন্য বরাদ্দ করা হয় কোটি কোটি টাকা। এবার বরাদ্দ হয়েছিলো প্রায় ৫৯ কোটি টাকা। কৃষক ও সচেতনমহলের মতে এই ৫৮ কোটি টাকার আশি ভাগই লোপাট হয়েছে। এই বরাদ্দই যেন আসে কতিপয় রাঘব-বোয়ালের পেট মোটা করার জন্য। এবার নয়, প্রতিবার, বারবার। কৃষকরা আহাজারি করেন, গণমাধ্যম চিৎকার করে, কিছু মানুষ প্রতিবাদ করেন। এসব আহাজারি-চিৎকার-প্রতিবাদকে আঙুলের ঘসায় উড়েয়ে দিয়ে কয়েকজন অমিত ক্ষমতাধর ঠিকাদার আর তথাকথিত পিআইসি দিব্যি সর্বনাশের আগুনে নিজেদের তাওয়া গরম করে চলেছেন। এদের কেশাগ্র স্পর্শ করার ক্ষমতা নেই কারও। রাষ্ট্রযন্ত্র কেন এতোটা অসহায় এইসব দুর্নীতিবাজদের নিকট তার মাজেজা বুঝেন না কেউ। দুর্নীতি দমনের মহাযজ্ঞ সম্পাদনে নিয়োজিত যে কমিশন (দুদক) তারা কখনও কি হাওরের বাঁধ নিয়ে এতসব দুর্নীতির পেপার ক্লিপিংস সংগ্রহ করেন না? কই, একবারও তো দুদকের কোন তদন্ত দেখা গেলা না।
কৃষকের জমি জলমগ্ন হচ্ছে, তাঁদের কান্নায় বাতাস ভারী হচ্ছে আর সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে। রাজনৈতিক সরকারের রক্তবাহী শিরা উপশিরা হচ্ছে সংগঠন। সরকারি সংগঠন কি অন্ধ হয়ে এই প্রলয় নৃত্য উপভোগ করছেন? মাত্রই কয়েকজন ব্যক্তির লোভের আগুনে সরকার প্রধান তথা সরকারি দলের যে বদনাম হচ্ছে তাতে কিছুই আসে যায় না সংগঠনের স্থানীয় নেতাদের? মানুষের এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ তো ঘটে নির্বাচনের সময়। দেড় বছর পর হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচনটি নিয়ে কি এই দলটির স্থানীয় নেতৃত্বের কোন মাথা-ব্যথা নেই? এদিকে সরকারি দলের প্রধান ও সাধারণ সম্পাদক যে প্রতিনিয়ত দলকে জনসম্পৃক্ত করার তাগিদ দিচ্ছেন তাতে এত নিস্পৃহ কেন তারা?
দুর্নীতিবাজ ঠিকাদার, পিআইসি ও পাউবো কর্মকর্তাগণের বিচার চান কৃষক সমাজ। আর চান ফসল রক্ষায় স্থায়িত্বশীল উপায় উদ্ভাবন। নিজেদের ভাবমূতি পরিচ্ছন্ন রাখতে সরকারের প্রতি আমাদের আবেদন এই দুই কাজে তড়িৎ উদ্যোগ নিন। আর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারগুলোর পাশে সব ধরনের সহযোগিতা নিয়ে দাঁড়ান।