এনামুল হক এনি
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা এ দেশের মানুষের আর্থ সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে জীবন-জীবিকা বদলে দিচ্ছে। নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে ষড়ঋতুর বৈচিত্র্য। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন আমাদেরকে কতটুকু ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে তা গেল বোরো মৌসুমে হাওরাঞ্চলে ফসলহানির ঘটনার দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে যায়। বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম ও অকাল বন্যায় হাওরাঞ্চলের প্রায় শতভাগ ফসলডুবে হাওরপাড়ের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তায় বিরূপ প্রভাব ফেলার পাশাপাশি স্থলজ ও জলজ প্রাণির পুরো খাদ্য চক্রে আঘাত হানে। হাওরের পানিতে এ্যামেনিয়া গ্যাসের প্রভাবে পানির স্বাভাবিক গুণাগুন নষ্ট হয়ে ধ্বংস হয়েছে মৎস্য সম্পদ। নষ্ট পানিতে খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে দেখা দেয় হাঁসের মড়ক। ঋণের চাপে কৃষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ কাজের সন্ধ্যানে শহরমূখী হয়েছে। পরিবারের খুদে সদস্য বা বিদ্যালয়ে পড়–য়া শিক্ষার্থীরা বেঁচে থাকার তাগিদে অভিভাবকদের সাথে চলে যায় শহরে। ফলে হাওরাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর চূড়ান্ত পরীক্ষায় বিগত বছরগুলোর তুলনায় উদ্বেগজনক হারে পরীক্ষায় অনুপস্থিতির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতি বছরই দেরিতে বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু হয়। যে কারণে নির্ধারিত সময়ে বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত কাজ শেষ না হওয়ায় হাওরপাড়ের কৃষকের সোনার ফসল তলিয়ে যায়। চলতি বোরো মৌসুমে হাওরাঞ্চলের কৃষকের ভাগ্যে কি আছে তা এখনও বলা যাচ্ছে না। বিগত বছরগুলোতে কার্তিক মাসের মাঝামাঝি বা শেষ দিকে হাওরের পানি নেমে গিয়ে বীজতলা ভেসে ওঠতো। কিন্তু এবার হাওরে তার ব্যতিক্রম বা নতুন সংকট দেখা দিয়েছে। কার্তিক মাস পেরিয়ে অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম সপ্তাহ অতিবাহিত হলেও অধিকাংশ হাওরের পানি নামেনি। বীজতলা ভেসে ওঠেনি। ফলে বীজ বপন থেকে শুরু করে চারা রোপন, ধান পাকা, ধান কাটা সবকিছুতেই বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যা এবারের বোরো ফসলকেও আবার হুকমির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে হাওরাঞ্চল সুনামগঞ্জের নদী ও হাওরের পানি ধীরে ধীরে কমছে। গত ১৬ নভেম্বর সুরমা নদীর সুনামগঞ্জ পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ৫.১১ মিটার, ১৭ নভেম্বর ৫.১২ মিটার এবং ১৮ নভেম্বর ৫.৫ মিটার। সুনামগঞ্জ পাউবোর তথ্য মতে এর আগের বছরগুলোতে এ সময়ে পানির উচ্চতা এতো ছিলনা।
ফসলডুবির ফলে খাদ্য সংকট মোকাবেলায় সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি হাওরাঞ্চলের মানুষকে নতুনভাবে বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। চলতি বোরো মৌসুমে কৃষি পূনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় বোরো বীজ ও রাসায়নিক সার বিতরণ কর্মসূচিও প্রশংসার দাবিদার। ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের জন্য কাবিটা নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিগত বছরের মতো এবার যাতে বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত কাজে কোনো অনিয়ম দুর্নীতি না হয় সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। এতো বিপর্যয় ও পরিবর্তনের ভেতরে এখনও হাওরবাসী ঘুরে দাঁড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। হাওরাঞ্চলে সৃষ্ট নতুন সংকট মোকাবেলায় যেখানে যেখানে পানি নামতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে সেই জায়াগাগুলো চিহ্নিত করে পানি নিষ্কাশনের জন্য জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি হাওরাঞ্চলের প্রতিটি নদী-নালা-খাল-বীল খননের ব্যবস্থা করতে হবে। যত দ্রুত বীজ বপন করতে পারবে তত আগেই সোনার ফসল ঘরে তুলতে পারবে হাওরাঞ্চলের কৃষক।
লেখক- সাংবাদিক, [email protected]