বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
সুনামগঞ্জের হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধ নিয়ে নানা কৌশলে অনিয়মের অভিযোগ ওঠছে। কোথাও অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া আবার কোথাও একভাবে প্রাক্কলন তৈরি করে আরেকভাবে বাঁধের কাজ করার অভিযোগ ওঠছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বশীলরা অবশ্য বলেছেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে যুক্ত যারা হতে পারে নি, তারাই মূলত নানা অনিয়মের অভিযোগ করছে।
হাওরপাড়ের কৃষক সংগঠকরা বলেছেন, অধিক বরাদ্দের ভাঙনে কিংবা বাঁধে এসকেভেটর দিয়ে পুরোনো মাটি এদিক সেদিক করে নতুন মাটি ফেলার বাহানা দেখিয়ে গণমাধ্যম কর্মীদের দৃষ্টিতে আনার চেষ্টা হচ্ছে। এছাড়া বরাদ্দের অর্থ হজম করতে বাঁধের ভাঙন ভরাট না করে রোপণকৃত জমির ওপর দিয়ে বাঁধ নির্মাণের অভিযোগ ওঠেছে।
জামালগঞ্জের হালির হাওরের ৩৭ নম্বর পিআইসির অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল তিন গুণেরও বেশি। ০.৬৮০ কি.মি. এর এই বাঁধে ৬০৮২.৩৭ ঘনমিটার মাটি দেখিয়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ১৬ লাখ ২৭ হাজার টাকা। পরবর্তীতে অধিক বরাদ্দ সংক্রান্ত প্রতিবেদন সমকালসহ পত্রপত্রিকায় প্রকাশ হলে তড়িঘড়ি তা কমিয়ে ৪ লাখ ৯০ হাজার টাকায় নিয়ে আসা হয়। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (মঙ্গলবার পর্যন্ত) ওই বাঁধে কাজই শুরু হয়নি।
৩৭ নম্বর পিআইসির বরাদ্দ কত তা জানতে চাইলে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ‘দুর্গাপুর থাইক্যা মদনাকান্দি বাঁন্ধে বরাদ্দ ৪ লাখ ৯০ হাজার। এর আগে ১৬ লাখ আছিল, অখন কমাইয়া দিছে।’ কিন্তু কেন কমানো হয়েছে, এই ব্যাপারে কিছু বলতে পারেন নি তিনি।
এই উপজেলার পাগনার হাওরের ১৪ নম্বর পিআইসির পাতিলাচূড়া বিলের বাঁধে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা। কিন্তু বাঁধের ভাঙা বাদ দিয়ে দক্ষিণ পাশের হেমেন্দ্র চক্রবর্ত্তীর রোপণকৃত জমি নষ্ট করে তার ওপর দিয়ে বাঁধ বাঁধা হয়েছে। যে বাঁধ হচ্ছে সেখানে বড়জোড় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা হলেই যথেষ্ট বলে জানিয়েছেন হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা।
জামালগঞ্জ উপজেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অঞ্জন পুরকায়স্থ জানিয়েছেন, গত বছর যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল সেই একই পরিমাণ জায়গার একটি অংশে গর্ত হলেও সেই গর্ত দেখিয়ে অর্থ বৃদ্ধি করা হয়েছে ঠিক, কিন্তু টাকা বাঁচাতে গিয়ে গর্ত ভরাট না করে অন্যের রোপণকৃত জমি নষ্ট করে বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। যেখানে কোনভাবেই এত টাকার প্রয়োজন হবে না।
দিরাইয়ের রফিনগর ইউনিয়নের পাগনার হাওরপাড়ের স্বজনপুর গ্রামের হেমেন্দ্র চক্রবর্ত্তীর ছেলে বাসুদেব চক্রবর্ত্তী জানিয়েছেন, ন তাদের জমির ওপর দিয়ে যে বাঁধ যাচ্ছে তাতে কম করে হলেও ২০ শতাংশ জমি নষ্ট হবে। এর আগে এই বেড়িবাঁধ তাদের ৭৮ শতাংশ জমি নষ্ট করেছিল।
এই বাঁধের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি মো. বকুল মিয়া বললেন, ‘আমারে যে মাপজোখ দেওয়া হইছে আমি এই অনুযায়ী কাজ করতাছি। ভাঙন যেখানো আছিন (ছিল) এইখানদি যদি আমি মাটি কাটি ক্লোজারে যে খোড় হইছে এই খোড়ের মাঝে বাঁন ঠিকত নায়। তাই জমিন দিয়া বাঁধ দেওয়া হইতাছে।’
জামালগঞ্জ উপজেলা কৃষক লীগের সাবেক আহবায়ক মো. আলী আমজাদ জানিয়েছেন, কৃষকের কাঁধে ভর করে ফাঁয়দা লোটার সুযোগ খোঁজছে একটি মহল। অধিক বরাদ্দ দেওয়াসহ নানা কৌশলে এরা সরকারী অর্থের অপচয় করছে।
জামালগঞ্জ উপজেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক এম নবী হোসেন বলেন, বাঁধের কাজে অনিয়মসহ বরাদ্দ বেশি এমন অনেক অভিযোগ আমাদের কাছেও আসছে। হাওর ও কৃষকের স্বার্থে সরকার পর্যাপ্ত বরাদ্দও দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অর্থলোভী কিছু অসাধু কর্মকর্তার জন্য সরকারের দুর্নাম হচ্ছে। সময় চলে গেলেও অনেক প্রকল্পে কাজই শুরু হচ্ছে না, এমন অভিযোগও রয়েছে। এছাড়া বাঁধে নিয়ম-নীতিও মানা হচ্ছে না।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সবিবুর রহমান বলেন, কোথাও অতিরিক্ত বরাদ্দ হয় নি। কাউকে সুবিধা পাইয়ে দেবার জন্য কোন বাঁধেই প্রাক্কলন হয় নি। এমন কাজের সুযোগও নেই। পিআইসিতে যারা যুক্ত হতে পারে নি, তারাই মনগড়া অভিযোগ দায়ের করে।