- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

হাওরে বানের নতুন জলে মিলছে দেশি মাছ

সোহানুর রহমান সোহান
দীর্ঘদিনের খরা ও অনাবৃষ্টি কাটিয়ে ভারী বর্ষণ শুরু হয়েছে সুনামগঞ্জে। বৃষ্টির পানি আর ভারতের পাহাড়ি ঢলের জলে পরিপূর্ণতা পাচ্ছে হাওর। থৈ থৈ পানি আর ছলাত ছলাত ঢেউয়ের শব্দে হাওর ফিরেছে তার পুরনো রূপে। হাওর এলাকার খালবিল ও কৃষিজমিগুলোতে ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে নতুন পানি। নতুন পানি পেয়ে ডুবা, বিল ও জলাধারে থাকা দেশি মাছ বের হয়ে আসছে। আর ওই পানিতে আয়োজন করে মাছ ধরছেন পেশাজীবি ও মৌসুমি জেলেরা। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মাছ ধরছেন তারা। শিশু-কিশোর থেকে বৃদ্ধ সবাই মাছ ধরতে ব্যস্ত।
কেউ মাছ ধরছেন জীবিকার তাগিদে, কেউ বা শখের বশে। ঠেলা জাল, উড়াল জাল, ছিপ জাল দিয়ে ধরা হচ্ছে মাছ। কেউ আইলে পুঁতে রেখেছেন মাছ ধরার চাঁই। ছোট ছোট দেশি মাছ এসে ধরা পড়ছে তাতে।
শুক্রবার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার করচার হাওর ঘুরে দেখা যায়, সড়কের পাশে একটু পর পর ছিপ জাল পুঁতে রেখেছেন অনেকে। কেউ সেটা দিয়ে মাছ ধরতে ব্যস্ত। হাঁটু সমান পানিতে নেমে ঠেলা জাল ঠেলিয়ে যাচ্ছেন অনেকে। আর কেউ পানি ঢোকার জায়গায় ¯্রােতের পাশ থেকে দূরে উড়িয়ে দিচ্ছেন জাল। এসব জালে দেশি মাছগুলোই ধরা পড়ছে বেশি। ট্যাংরা, চান্দা, তারা চিকরা, পুঁটি, চিংড়ি, বাতাসী মাছই পাওয়া যাচ্ছে এসব জালে। দু চারদিন আগেও যে হাওরে গরু ঘাস খেয়েছে সে হাওরে ঘুরে বেড়াচ্ছে জেলেদের ছোট ছোট নৌকা। মাছ ধরা শেষ করে ঘাটে এসে নৌকা ভিড়িয়ে বিক্রি করছেন বাজারে। তবে প্রথম পানি হওয়ায় আশা অনুযায়ী মাছ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান জেলেরা। বেশি করে মাছ ধরা পড়তে আরও কয়েকদিন লাগবে।
দিনের পাশাপাশি অনেকে রাতের আঁধারে কুঁচা দিয়ে শিকার করছেন মাছ। বিভিন্ন সাইজ আর সংখ্যার শলার কুঁচা আর লাইট নিয়ে বের হচ্ছেন মাছ শিকারে। কোঁচা দিয়ে সাধারণত শিং, টেংরা, কই, মাগুর, চেঙ, শোল সহ বড় আকারের মাছ ধরা পড়ে।
পৌর শহরের বড়পাড়ার ইসমাইল আলী বলেন, রাত্রে মেঘের পরে ঠাডা পড়লে (বজ্রপাতে) মাছ সড়কের ধারে আসে। তখন হাত দিয়াই মাছ ধরা যায়। আমি সড়কে এক কুড়ির মতো কই মাছ ধরেছি। পুরো এলাকার মানুষই শুকনায় মাছ ধরে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার চালবন গ্রামের নবী হোসেন বলেন তিনি মৌসুমি জেলে। নিজে খাওয়ার জন্য মাছ ধরেন। আজকে প্রথম এসেছেন মাছ ধরতে। এর আগে হাওরে পানি ছিল না। তাই মাছ ধরতে পারেন নি। নতুন পানি এসেছে বলে তুলনামূলক মাছ কম পাওয়া যাচ্ছে। তার সাথে এসেছে ছেলে আরাফাত। সে চালবন আনন্দ প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্রের দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী।
আরাফাত জানায়, শুক্রবারে তার স্কুল বন্ধ থাকে। তাই বাবার সাথে এসেছে মাছ ধরায় সহযোগিতা করার জন্য। বাবা জাল উপরে তুলেন আর সে জাল থেকে মাছ নামিয়ে খলইয়ে রাখে।
একই রকম লালারগাঁও সুনীল নাথ ঘরের খাবার উপযোগী মাছ ধরতে হাওরে ঠেলা জাল নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, হাওরে নতুন পানি তাই মাছ কম। মাত্র একদিন হয় পানি এসেছে। আইলের কাটা অংশ দিয়ে পানি ঢুকছে সেখানে জাল পেতে রেখেছেন। কাইক্কা, কই, পুটি সহ বিভিন্ন জাতের দেশি মাছ উঠছে জালে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মুক্তিখলা গ্রামের পেশাজীবি মাছ বিক্রেতা আব্দুল মজিদ বলেন, নতুন পানি আসায় নতুন মাছ পাওয়া যাচ্ছে। দেশি-চাষ সব জাতের মাছ আসছে। পানি হওয়ায় দেশি মাছ আগের থেকে কিছুটা বেশি পাওয়ায় দাম কিছু কমেছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শামশুল করিম বলেন, মাছ ধরার সময় জেলেদের খেয়াল রাখতে হবে যেন ডিমওয়ালা মা মাছ এবং ছোট ছোট পোনা না ধরেন। অবৈধ যেসব জাল রয়েছে সেগুলো যাতে ব্যবহার না করা হয়। ক্রেতারাও যেন মা মাছ এবং পোনা মাছ ক্রয় না করেন। মাছের বংশ বৃদ্ধিতে সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে। এরপরও কেউ ব্যত্যয় ঘটালে আমরা অভিযান চালিয়ে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

  • [১]