বিশেষ প্রতিনিধি
১৯ পুকুরের মৎস্য খামার, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হেঁটে যাবার সময় একজন লোকও পাওয়া গেল না, খামারের ভেতরের মাছের খাবারের গোদাম, খামার কর্মীদের ঘরও শূন্য, যন্ত্রপাতি, বিদ্যুতের তার সব এদিক, ওদিক পড়ে আছে, দীর্ঘক্ষণ হাঁটার পরও খামার মালিক বা খামার কর্মী বা কর্মচারী কাউকেই পাওয়া গেল না। আধাঘণ্টা পর পাশের গ্রামের এক নারীকে পেয়ে এখানকার মানুষজন কোথায় জানতে চাইলে, বললেন ১৬ জুন রাত তিনটার ঢলের তা-বের পর কাঁদতে কাঁদতে এলাকা ছেড়েছে খামার মালিক (মাহবুব আশরাফ তফু)। এরপর আর খামারে আসেন নি তিনি।
এবারের ভয়াবহ বন্যার পর জেলার ২৫ হাজার মাছের খামারে গেলেই এমন ধ্বংসযজ্ঞের চাপ এবং মর্মস্পর্শি বিবরণ মিলবে।
সুনামগঞ্জ শহরতলির বুড়ি’র স্থলে মাহবুব আশরাফ তফু’র মাছের খামার। প্রায় ২০ একর জমিতে ১৯ টি পুকুর ইজারা নিয়ে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে মাছ চাষ করেন তফু। বছর মেয়াদী চুক্তিতে খামারকর্মী ১১ জন। যারা একযুগেরও বেশি সময় ধরে এখানে চাকুরি করেই নিজের ও সংসারের জীবিকা নির্বাহ করছেন।
১৬ জুনের বন্যার ভয়াবহ তা-বের বর্ণনা করে এসব খামার কর্মীরা বললেন, খামারে ৫-৬ কেজি ওজনের রুই কাতলা, ঘাষকাপসহ নানা জাতের মাছ ছিল। তিন-চার ফুট পানি হওয়া পর্যন্ত রক্ষা করার চেষ্টা করেছি, প্রবল বেগে ঢল এসে যখন পানি ৫-৬ ফুট উচ্চতায় যাচ্ছিল, তখন সবকিছু ছেড়ে জীবন বাঁচিয়েছি। মালিকও কাঁদতে কাঁদতে প্রাণ বাঁচিয়েছে।
খামার কর্মী ফারুক মিয়া ও ফরিদ মিয়া বললেন, ১২ বছর ধরে এই খামারে চাকুরি করেই সংসার চালিয়ে আসছি। এখন মালিক বেতন দেবে কোথা থেকে, খামারই বা আবার কিভাবে শুরু করবে, পুকুরের পাড়, থাকার ঘর, যন্ত্রপাতি, মাছ সবই তো ভেসে গেছে। মালিকের খাবারেরই তো ব্যবস্থা নেই। আমাদের বাঁচাবে কিভাবে।
খামার এলাকার পাশের বুড়ির স্থলের ফরিদা বেগম বললেন, এখানে আমার কোন কাজ নেই, আমার ছেলে কাজ কাে ১২ বছর ধরে, বেশিরভাগ সময়েই মাছ ধরার সময় খামারের বড় মাছটা বিনা পয়সায় মালিক আমাদের বাড়িতে পাঠান। মালিকের মাছের খামার হাওরে মিশেছে, সাথে আমরাও কষ্টে পড়েছি। আমাদের জীবন কিভাবে বাঁচবে বলুন ভাই।
মুঠোফোনে কথা বলার সময় মাহবুব আশরাফ তপু বললেন, প্রায় ১৪ বছর হয় ১৯ পুকুর লীজ নিয়ে মাছের খামার করছি, এমন মহাসংকটে কখনো পড়ি নি। এক মাস হয় খামারেই যাচ্ছি না। স্টাফদের বলেছি বেতন কিভাবে দেব- তোমরাই বিবেচনা করো। ব্যাংক ঋণ আছে ২৩ লাখ টাকা। ঋণ কিভাবে দেই। আমি চোখে পথ দেখছি না, অসুস্থ্য হয়ে গেছি।
এই অবস্থা কেবল মাছের খামারি মাহবুব আশরাফ তফুর নয়। জেলার ১৭ হাজার মাছের খামারিকে বন্যায় এমন করুণ অবস্থার মুখোমুখি করেছে।
সুনামগঞ্জ শহরতলির মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের মনোহরপুরের বাবুল মিয়া বললেন, পুকুরের পাড়ের উপর ছয় ফুট জাল টাঙিয়েও মাছের খামারগুলো রক্ষা হয় নি। এক পর্যায়ে আফাল আর ঢলে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। জীবন রক্ষা হয়েছে অলৌকিকভাবে।
হাজার কোটি টাকারও বেশি মাছ ভেসে গেছে
টেংরাটিলার মাছের খামারি রতন মিয়া বললেন, খামারের সাতটি পুকুরের সবচাইতে উঁচু স্থানে পাঁচ ফুটেরও উপরে পানি ছিল। পানির বেগ এতো বেশি ছিল, দাঁড়ানোর সাহস করেন নি কেউ। তিন একর জমি বন্ধক দিয়ে মাছের খামার করেছিলাম। কমপক্ষে ১০ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে।
ছাতকের জাউয়া বাজারের কফলা গ্রামের মোস্তাফিজুর রহমান বললেন, ১২০ শতক জমির উপর তিনটি মাছের খামার আমার। খামারের পাড়ের উপরে ৪-৫ ফুট পানি ছিল। চোখের সামনে সব মাছ ভেসে গেছে, কিছুই করার ছিল না, হাওরের সঙ্গে মিশে গেছে খামার।
তফু, বাবুল, রতন ও মোস্তাফিজ কেবল নয়, জেলাজুড়ে খামারিদের আহাকার। বৃহস্পতিবার দুপুরে সুনামগঞ্জ শহরের আলফাত স্কয়ারে মানববন্ধন করে খামারি সাহাজ উদ্দিন, সাইফুল সিদ্দিকী, নুরুল আলম ও সালেহীন চৌধুরী দাবি করলেন, সরকার পাশে না দাঁড়ালে ঘুরে দাঁড়ানোর কোন উপায় নেই মাছের খামারিদের।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুনীল ম-লের দাবি সুনামগঞ্জের মৎস্য খামারীদের ২৫ হাজারের মতো পুকুর হাওরে মিশে গিয়েছিল। কোথাও কোথাও পুকুর ভাসলেও অবকাঠামোর বেহাল অবস্থা। পুকুরের পাড় ভেঙে হাওরের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। সরকারি খামারের এক লাখের মতো পোনা মাছ ভেসে গেছে। সব মিলিয়ে হাজার কোটি টাকারও বেশি মাছ হাওরে ভেসে গেছে। মাছের খামারিদের এই পেশায় রাখতে হলে প্রণোদনা দিলে হবে না, ১৭ হাজার মাছের খামারিকে পূনর্বাসন করতে হবে।