- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

হাওরে শুরু হয়েছে ধান কাটা উৎসব/ চলছে পূজা-পার্বন ও শিরণি বিতরণ

বিশেষ প্রতিনিধি
হাওরে শুরু হয়েছে ধান কাটা উৎসব। পাকা ধানের শীষ বেরুতেই হাওরের পাড়ে পাড়ে চলছে কৃষক কৃষাণীদের নানা আয়োজন। শুরু হয়েছে পূজা-পার্বন, পিঠা, পায়েশ ও শিরণি বিতরণ। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দিচ্ছেন গঙ্গারভোগ, কেউবা দিচ্ছেন অতিসারের ব্রত।
অকালে বন্যা এবং করোনা দুর্যোগের কারণে গত কয়েকবছর ধান কাটা শুরুর উৎসব হয় নি। শিরণি বিতরণ এবং পূজা পার্বনও হয় নি। এবার শিরণি বিতরণও হচ্ছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বিরা অতিসারের ব্রত এবং গঙ্গার ভোগও দিচ্ছেন।
অতিসারের ব্রত হলো অধিক সার বা ফল পাওয়া। প্রতিবছর চৈত্র মাসের মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশীতে বারুণি ¯œানের পর গঙ্গা পূজো, ব্রহ্মা পূজোর পর এই পূজো বা ব্রত পালন করা হয়।
গ্রামের গৃহস্থ পরিবারের সকল মহিলারা মিলে চাঁদা তুলে সারাদিন উপবাস থেকে হাওরে গিয়ে এই ব্রত পালন করেন। বিন্না ঘাসকে দেবতারূপে ঘট বসিয়ে ফুল বেলপাতা দিয়ে এই পূজো করা হয়। পূজোর ভোগে চিড়া, মুড়ি, চালের ভোগ, চালের গুঁড়ো, দুধ, দই, মধু ও ঘি দেওয়া হয়।
ফসলের কল্যাণের জন্য অর্থাৎ ফসল যেন সকলে সুন্দরভাবে ঘরে তুলতে পারেন এমন কামনায় এই ব্রত পালন করা হয়। সকল প্রাণি বিশেষ করে গবাধি পশুর মঙ্গলার্থে এই ব্রত হয়। এই ব্রত পালনে উপবাসী মহিলারা হাওরেই ব্রত পালনের সময় উপবাস ভাঙেন। ব্রতের দিন বাড়িতে কোন আহার গ্রহণ করা হয় না। সন্ধ্যায় আবার হাওরে গিয়েই চিড়া-মুড়ি খাওয়া হয়। ব্রতের দিন কেউ ভাতও খান না।
তাহিরপুরের মাটিয়ান হাওরপাড়ের উজান জামালগড় গ্রামের প্রীতি সরকার বললেন, বিন্না গাছে ঘিট বেঁধে এই সময়ে হাওরের জমিতে পূজো করলে ফসলের কল্যাণ হয়। মানুষ ও গৃহপালিত পশুরও কল্যাণ হয় বলেই বিশ^াস করে আসছেন তারা।
একই গ্রামের কানন বালা পুরকায়স্থ বললেন, এই ব্রত পালনে কোন ধরণের মূর্তি বা পুরোহিত থাকেন না। মহিলারা উপবাস থেকে নিজেরাই পূজা আয়োজন করেন।
গ্রামের শিপ্রা তালুকদার, মিলন তালুকদার ও রেনু বালা সরকার বললেন, অকাল বন্য, করোনা মহামারির কারণে গত চার বছর এ ধরণের পূজা আয়োজন করা হয় নি। এবার প্রকৃতি অনুকূলে থাকায় পূজা-পার্বন হচ্ছে।
গ্রামের স্কুল শিক্ষিকা পলি রায় বললেন, প্রকৃতির মমতার উপর নির্ভর করেই এখানকার মানুষের সুখ দুঃখের গল্প তৈরি হয়। এবার প্রকৃতির মায়াবি রূপ দেখা যাচ্ছে। আর কয়েক দিন গেলেই বুঝা যাবে, কি আছে কৃষক-কৃষাণীর ভাগ্যে।
শাল্লার নোয়াগাঁও এর বড় কৃষক মাখন লাল দাস বললেন, চৈত্র মাসের প্রথম শুক্র ও সোমবার উপবাসের মাধ্যমে হাওরপাড়ের গ্রামবাসী সোমেশ্বরী দেবতাকে দুধ-জল দিয়ে ¯œান (গোসল) করিয়ে আসেন। পরের সপ্তাহে একই দিনে উপবাস করে সোমেশ^রীর ধুলি নিয়ে হাওরের জমিতে ছিটিয়ে দেওয়া হয়। মহিলারা গঙ্গার ভোগ দেন। সঠিকভাবে ধান ঘরে তোলার জন্যই এসব আয়োজন।
তিনি জানান, গেল শনি-মঙ্গলবার দাড়াইন নদীতে গঙ্গার ভোগ দিয়ে সঠিকভাবে ফসল তোলার জন্য প্রার্থনা করা হয়েছে। ফসল তোলার পর সোমেশ^রী দেবতার উদ্দেশ্যে পাঠাবলীও দেবেন অনেকে। মাখন লাল দাস বললেন, এবার ‘সোনার বৈশাখী’ হবে বলেই বিশ^াস করছেন ছায়ার হাওরপাড়ের কৃষকরা। তিনি জানান, রোববার দুই কেয়ার (তিন কেয়ারে এক এক একর) জমির ধান কাটিয়েছেন তিনি।
দিরাই উপজেলার রাজানগরের বড় কৃষক আব্দুস ছাত্তার বললেন, ক্ষেতে (জমিতে) ধান পাকা শুরু হয়েছে। এজন্য রোববার গ্রামের শিশু-কিশোরদের মধ্যে ইফতারির সময় শিরণি বিতরণ করা হয়েছে। গ্রামের অনেকেই ধান কাটা শুরু করার আগে শিরণি বিতরণ করে থাকেন বলে জানান তিনি।
জামালগঞ্জের হালির হাওরপাড়ের বদরপুরের কৃষক রোকন মিয়া বললেন, ৫০ কেয়ারের মত জমি করেছেন তিনি। ব্রি-২৮ জাতের ধান করছেন ১৬ কেয়ার। এই জাতের ধান কাটা শুরু হয়েছে। এই ধানের চার ভাগের এক ভাগ চিটা হয়ে গেছে। বাকী ধান ছিল জলকরাজ ও ব্রি-২৯ জাতের। এই ধানের ফলন ভাল হয়েছে, কাটা পড়বে বৈশাখের নয়-দশ তারিখে।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বললেন, সুনামগঞ্জে এবার দুই লাখ ২২ হাজার ৭৯৫ হেক্টর জমিতে নানা জাতের বোর ধানের চাষাবাদ হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে ব্রি-২৮, ব্রি-৮৪, ব্রি-৮৮, হাইব্রিড, স্থানীয় জাতের বোর, জাগলী, রাতা ও লালডিঙ্গা জাতের ধান। এবার উৎপাদনের লক্ষমাত্রা ১৩ লাখ ৫৩ হাজার টন। আবহাওয়া ১৫ দিন অনূকূলে থাকলেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হবে বলে দাবি তাঁর। তিনি জানান, রোববার পর্যন্ত সারা জেলায় ১৫শ’ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে।

  • [১]