- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

হাওরে হাঁস পালন/ এমন কর্মকাণ্ডই দারিদ্রতা হটানোর আসল কৌশল

মানুষ এক অবাক বিস্ময়ের নাম। তার ভিতর রয়েছে অসীম সম্ভাবনা। সবকিছু জয়ের অদম্য ইচ্ছাশক্তি। সেই শক্তির জোরেই ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকেও জেগে উঠে মানুষ। দারিদ্রপীড়িত এই দেশের মানুষ একসময় একবেলা খাবার পেয়েছে তো আরেক বেলা পায়নি। অনাহারে কাটিয়ে দিত আস্ত একটা দিন। দারিদ্রতা দূর করা ছিলো সত্যিকার চ্যালেঞ্জ সে সময়ে। সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে দারিদ্রতা হটানোর জন্য। এর সবচাইতে বড় উদ্যোগটি ছিলো ক্ষুদ্র ঋণের ব্যাপক প্রসার। জামানত বিহীন ঋণ। বহু বছরের পুরোনো জামানতের বিনিময়ে ঋণ দান প্রথার বিপরীতে এক সাহসী পদক্ষেপ। কোনো ধরনের জামানত ছাড়াই সরকারি বেসরকারি সংস্থা গ্রামীণ মানুষদের ক্ষুদ্র ঋণ দেয়া শুরু করে। এ থেকে যে পরিমাণ ফলাফল আশা করা গিয়েছিলো দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেখা গেল ক্ষুদ্র ঋণ মানুষের দারিদ্রতা হটাতে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারছে না। বরং গ্রামীণ দরিদ্র মানুষ এক সুগভীর ঋণ জালে জড়িয়ে যাচ্ছে। একই পরিবারে একাধিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ ঢুকছে কিন্তু লক্ষ্যের কর্মসংস্থান ঘটছে না। ঘটবে কীভাবে? কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে না দিয়ে কিংবা বহুমুখী কর্মের জন্য অনভিজ্ঞ এক দল পুরুষ ও মহিলাকে ঋণ দিয়ে রাতারাতি কর্মসংস্থান আশা করা অবৈজ্ঞানিকই বটে। কর্মউপযোগী মানুষ সবসময় কাজ করতে চায়। এটি মানুষের সাধারণ প্রবণতা। মানুষ কখনও পরনির্ভরশীল থাকতে চায় না। কাজের অভাবই দারিদ্রতার মূল কারণ। দেখা গেল, যখনই মানুষ কাজ করার সুযোগ পেয়েছে তখনই সেই জায়গায় ছুটে গিয়েছে। গার্মেন্টস কারখানাগুলো এর অন্যতম উদাহরণ। পরে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টির অভিজ্ঞতাও অনেক বেশি ফলপ্রসূ বলে প্রমাণিত হলো। বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ ও উপকরণ সহায়তার মাধ্যমে বাংলাদেশে আজ একটি বিশাল উদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে উঠেছে। কষ্ট করার মনোভাব, সাহস আর প্রেরণা নিয়ে বিভিন্ন উৎপাদনমুখী কর্মকা-ে নিয়োজিত হয়ে আজ বাংলাদেশের দারিদ্রতা অনেকটাই সহনীয় পর্যায়ে চলে এসেছে।
গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা গেলো, এই জেলায় ৪৭০০ হাঁসের খামার গড়ে উঠেছে। এবং অধিকাংশ খামারীই হাঁস পালনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে পেরেছেন। ভৌগোলিক সুবিধাগত কারণে হাওর হাঁস পালনের জন্য উপযোগী উৎকৃষ্ট এক এলাকা। হাওর থেকে প্রাকৃতিক উপায়ে হাঁস নিজের খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে। কৃত্রিম খাদ্যের প্রয়োজন হয় বটে তবে তা অনেক কম। প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তর হাঁস পালন বিষয়ে খামারীদের ধারণা দিয়েছে, রোগবালাইয়ের হাত থেকে রক্ষার কৌশল শিখিয়ে দিয়েছে। কেউ কেউ হয়তো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ সহায়তাও গ্রহণ করেছেন। ব্যাস, দাঁড়িয়ে গেলো বিশাল এক সম্ভাবনার ক্ষেত্র। খামারীরা এখন ডিমের জন্য যেমন হাঁস পালন করেন তেমনি মাংসের জন্যও হাঁস পালন করছেন। হাওরাঞ্চলে ব্যাপকভাবে হাঁস পালনের উদ্যোগ খুব পুরোনো নয়। বলা চলে এক দুই দশকের ব্যাপার। এরই মধ্যে এটি জাতীয়ভাবে বেশ সমাদৃত হয়েছে। এই ধরনের উদ্যোগই দারিদ্রতা বিমোচনের প্রধান হাতিয়ার।
খামারীরা বলছেন, ডোবা বা ছোট জলাশয় ইজারা দেয়া বন্ধ করে দিলে তারা আরও অধিক সংখ্যক হাঁস পালনের সুযোগ তৈরি করে নিতে পারবেন। দরকার কি এইসব ডোবা বা ছোট জলাশয় ইজারা দেয়ার? কয় টাকা রাজস্ব আসে এ থেকে? অবাধ ও মুক্ত করে দেয়া হোক এসব ছোট জলাশয় ও ডোবাগুলো। এগুলোতে মানুষ হাঁস চড়াক, মাছ ফলাক। ইজারাবৃত্তির চাইতে বহুগুণ বেশি আর্থিক প্রত্যাগমন আসবে এ থেকে। শুধু হাঁস কেন কর্মসংস্থানের আরও যত সুযোগ আছে সেগুলোকে ব্যাপকভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হোক। দারিদ্রতা বিমোচনের জন্য আলাদা কোনো উঞ্ছবৃত্তির প্রয়োজন হবে না মানুষের, নিজের ভিতরের সুপ্ত কর্মশক্তি দিয়েই সে জয় করবে এই অভিশাপ।

  • [১]