আমিনুল ইসলাম, তাহিরপুর
হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির ধান। এখন আর হাওরে দেশী জাতের বোর ধান চাষাবাদ হয় না। চাষাবাদ হয় উচ্চ ফলনশীল ধান। গত দুই যুগ আগেও আগাম বন্যার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সুনামগঞ্জ জেলার বৃহৎ বোর ফসলি ধানের হাওর তাহিরপুর উপজেলার শনি, মাটিয়ান, মহালিয়াসহ ছোট বড় ২৩টি হাওরেই চাষাবাদ হতো দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন জাতের বোর ধান। দেশীয় বোর ধান রোপণের পর তেমন কোন যত্ন করতে হতো না। এমনকি সার ও কীটনাশকও দেয়া হতো না। জলবায়ু সহিষ্ণ ছিলো দেশী জাতের সব কয়টি ধান। ফলন একটু কম হলেও অতিবৃষ্টি কিংবা খরাতে তেমন কোন ক্ষতি হতো না। জমিতে সেচ দিতে হত না।
বর্তমানে হাইব্রিড আর বহুজাতিক কোম্পানির বাণিজ্যের দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে দেশী জাতের বোর ধান। বেশি ফলনের আশায় কৃষকরা ঝুঁকছেন হাইব্রিড ধান চাষাবাদে। খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ধরে রাখতে সরকারও জোর দিচ্ছেন হাইব্রিড ধান চাষাবাদে। তবে তাহিরপুর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, তারা কৃষকদের উচ্চ ফলনশীল বীজ ধানের পাশাপাশি দেশী প্রজাতির ধানের বীজ রাখার জন্যও কৃষকদের পরামর্শ দেন।
হাওড় অঞ্চলে দেশীয় প্রজাতির ধান যা ইতিমধ্যে হারিয়ে গেছে তার মধ্যে রয়েছে— রাতা, গচি শাইল, নাজিশাইল, লাকাই, পানি শাইল, বোর, টেপি, রঙ্গিলা টেপি, রাজাশাইল, বেগুন বিচি, ধলাকাচাই, মৌমাইল, কালো জিরা, বাশফুল ও গড়িয়া ইত্যাদি। একটা সময় অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য বিভিন্ন রকমের সুস্বাদু জাতের ধানের চাল দিয়ে রান্না করা হতো। খেতেও সুস্বাদু ছিলো সে ধান।
স্থানীয় কৃষি বিভাগ বলেছেন, দেশী জাতের ধানে ফলন কম হওযায় কৃষক এখন আর আগেরে মতো দেশী ধান চাষাবাদে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। অধিকাংশ হাওরেই এখন চাষাবাদ হচ্ছে ব্রি ধান —২৮, ব্রি ধান ২৯।
সরজমিনে তাহিরপুর উপজেলার শনির হাওরে গিয়ে দেখা যায় সে চিত্র। বিস্তৃর্ণ হাওর জুড়ে সবুজের হাতছানি। হাইব্রিড ধানই চাষাবাদ হচ্ছে হাওরের এপাশ থেকে ও পাশ।
হয়তো কৃষক নিজে খাবারের জন্য বোর, লাকাই ধান চাষাবাদ করেছেন। এভাবেই হয়তো হাওরের চতুরপাশে বিভিন্ন গ্রামের আরো কিছু কৃষক সৌখিনতা বশতঃ কিছু জমি দেশী ধান চাষাবাদ করেছেন। এক সময় হয়তো সৌখিনতা বশতঃ আর এ ধান চাষাবাদ করবেন না কোনা কৃষক।
শনির হাওর পাড়ের ভাটি তাহিরপুর গ্রামের কৃষক রুহুল আমিন। তিনি জানান, দেশি জাতের ধান চাষের উৎপাদন খরচ কম ছিল। তখন ধান কাটার মৌসুমে গ্রামে পিঠা পায়েস, চিড়া, খই, মুড়ি তৈরির ধুমও ছিল। এখন তা আর হয় না। দেশি জাতের ধান আবাদে অতিরিক্ত সার—কীটনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন হতো না বলেও তিনি জানান।
মাটিয়ান হাওর পাড়ের কৃষক মধ্য তাহিরপুর গ্রামের কৃষক সত্য রায় জানান, দেশী ধান চাষাবাদ করতে কোনো বীজ বাজার থেকে কিনতে হতো না। বীজের জন্য কিছু ধান আলাদা করে ঘরে তুলে রাখলেই চলত। বর্তমানে আমরা যে ধান চাষাবাদ করছি তা বীজ রাখতে পারছি না। বছরে বছরে বাজার থেকে চড়া দামে বীজ কিনতে হচ্ছে। সেই সাথে ধান রোপনের পর জমিতে কীটনাশক, সার, সেচ প্রচুর পরিমান দিতে হচ্ছে। না হলে ফলন ভালো হচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে কথা হয় উবিনীগের নির্বাহী পরিচালক ও নয়া কৃষি অন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ফরিদা আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, কৃষির মূল ভিত্তি হলো বীজ। আর বীজের ওপর সার্বভৌম অধিকার থাকতে হবে কৃষকের। কিন্তু বাস্তবতা হলো বীজের বিষয়টি চলে গেছে কোম্পানীর হাতে। বিভিন্ন কীটনাশক কোম্পানী এখন বীজ বিক্রি করছে। তাদের মূল উদ্যেশ্য আসলে বীজ রক্ষা বা উন্নতমানের বীজ সরবরাহ নয়, তাদের মূল লক্ষ্য কীটনাশক বিক্রি। আর অতিরিক্ত কীটনাশক দেওয়া শস্যের কারণে স্বাস্থ্যঝঁুকির কথা এখন সবার জানা। তাই সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। দেশীয় ধান সংরক্ষণ,এর প্রচার ও প্রসারে। তিনি আরো বলেন,১৯১৫ সালেও দেশে ১৫ হাজার জাতের ধান ছিল। এখন ধান গবেষনা ইনস্টিটিউটের কাছে মাত্র সাত হাজার ৫০০ স্থানীয় জাতের ধান রয়েছে। স্থানীয় জাতের ধানের উৎপাদন খরচ যেমন কম, তেমনি তা সুস্বাধু, স্বাস্থ্যকর। তাই স্থানীয় জাতের ধান চাষে কৃষকদের সহায়তা, প্রণোদনা দিতে হবে।
তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাসান—উদ—দৌলা বলেন, কৃষকরা লাভমান বেশী হওয়া জমিতে সবাই উচ্চ ফলনশীল ধান রোপন করে। তিনি আরো বলেন, উপজেলা কৃষি অফিসের আয়োজনে বিভিন্ন প্রশিক্ষণে তারা কৃষকদের বলে দেন উচ্চ ফলনশীল বীজ ধানের পাশাপাশি দেশীয় প্রজাতির বীজ ধানও তারা যেন সংরক্ষণ করেন এ বিষয়ে তারা বলে দেন। কৃষকদের উৎসাহ দিতে গিয়ে তারা আরো বলেন, দেশীয় বীজ ধানের ফলন কম হলেও বাজারে দেশীয় ধানের দাম অনেক বেশী।