- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

হাওর অঞ্চলের শিক্ষার বাতিঘর কাশীপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়

আকবর হোসেন, জামালগঞ্জ  
হাওর অঞ্চলের শিক্ষার বাতিঘর কাশীপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। শিক্ষার বাতিঘর হিসেবে পরিচিত বিদ্যালয়টি পাকনার হাওরের পাড়ে জামালগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের শেষ প্রান্তে অবস্থিত। জামালগঞ্জ সদর ৩টি ও ফেনারবাঁক ইউনিয়নের দুটি গ্রাম ছাড়াও ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড় রাজাপুর উত্তরের আছমতপুর আর রহমতপুরের ছাত্রদের পড়ালেখার আদর্শ বিদ্যাপীঠ এই বিদ্যালয়টি। একাধারে কয়েক বছর ধরে ভালো রেজাল্ট করে আসছে। গেল বছর উপজেলার মধ্যে পিএসসিতে সর্ব্বোচ রেজাল্ট করে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এবছরও তারা ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছে। বিদ্যালয়টি শুধু পড়াশোনায় নয় খেলাধুলা, জ্ঞানচর্চা সহ সকল ক্ষেত্রে উপজেলার মধ্যে অনন্য উদাহরণ রেখে আসছে।  
ভালো রেজাল্ট আর ফলাফলের জন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর শতভাগ আন্তরিকতা, অভিভাবকদের চেষ্টা ও এলাকাবাসীর সহযোগিতা কাজ করেছে। এই বিদ্যালয়টি শুধু উপজেলা পেরিয়ে জেলায় প্রথম হয়েছে, উপজেলাবাসীর বিশ্বাস ভবিষ্যতে জাতীয়ভাবে শ্রেষ্ঠ হবে বিদ্যালয়টি।
কাশীপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দিনে নিয়মিত ক্লাস করে আবার সকাল-বিকেল-সন্ধ্যার পর সকলে একসাথে আবার ক্লাস রুমে পড়া আরম্ভ করে রাত দশটা পর্যন্ত পড়ালেখা করে। বিদ্যালয়ে ৮জন শিক্ষকের পাশাপাশি অভিভাবক সহ এলাকার মানুষের আন্তরিক চেষ্টার ফলে সন্ধ্যার পরে সকলে মিলে সন্ধ্যাকালীন ক্লাসের জন্য আলাদা ১৬ জন প্রাইভেট টিউটর রেখেছেন। বিদ্যালয়টি পর পর দু’বার উপজেলার মধ্যে শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হয়েছে। শুধু তাই নয় বর্তমানে সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যে শ্রেষ্ঠ প্রাথমিক বিদ্যালয় হওয়ার কৃতিত্বও এই বিদ্যালয়টি অর্জন করেছে। গেল বছর এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জেলার মধ্যে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন। এবছরের শেষ দিকে সরকারী ভাবে ৭দিনের সফরে ইন্দোনেশিয়া যাবার কথা রয়েছে তাঁর।
গত বৃহ:বার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ক্লাসে ছাত্রছাত্রীরা বেশ মনোযোগী, কোন ছাত্রছাত্রীর শব্দ নেই। তার চাইতে আরো বেশী মনোযোগী শিক্ষকরা। ক্লাস চলছে তো চলছেই। ছাত্রছাত্রীরা স্যারের মুখ পানে চেয়ে রয়েছেন, স্যার পড়া বলছে আর তারা মন ভরে শ্রবণ করছেন। এভাবে প্রত্যেকটি শ্রেণি কক্ষে শিক্ষকরা ক্লাস নিচ্ছেন। বিদ্যালয়ের ক্লাস রুম গুলিতে ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মত। jg-pic-kasipur-2
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালে ৫ম শ্রেণিতে সমাপনী পরীক্ষায় ৬২ জন অংশ নিয়ে ৬২ জনই কৃতকার্য হয়। ২০১২ সালে ৭৫ অংশগ্রহণ করে সকলেই পাশ করে। এ প্লাস পেয়েছে ৯ জন, টেলেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে ৩ জন। ২০১৩ সালে ৯১ জন ভর্তি হয়ে ৮৫ জন সমাপনীতে অংশ নিয়ে ৮৪ জন কৃতকার্য হয়। এর মধ্যে ১৫ টি এ প্লাস ও ৬টি টেলেন্টপুল বৃত্তি। ২০১৪ সালে ৭৩ জন ৫ম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ৬৫ জন সমাপনীতে অংশ নিয়ে শতভাগ পাশ করে যার মধ্যে এ প্লাস পেয়েছে ১৩ জন, আর এক জন টেলেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে। ২০১৫ সালে ৫ম শ্রেণিত ৬৬ জন ভর্তি হয়ে সমাপনীতে ৬৪ জন অংশ করে ৬৪ জনই পাশ করে যার মধ্যে ১৫ টি এ প্লাস, ১০ টি টেলেন্টপুল বৃত্তি। বর্তমানে কাশীপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬৪৩ জন শিক্ষার্থী আছে। শিশু শ্রেণিতে ৪৪ জন, প্রথম শ্রেণিতে ১৭৫ জন,২য় শ্রেণিতে ১৪২ জন, ৩য় শেণিতে ১২৬ জন, ৪র্থ শ্রেণিতে ৮৭ জন, ৫ম শেণিতে ৬৯ জন শিক্ষার্থী । ভবনে ছাত্রছাত্রীদের স্থান সংকুলান হয় না। বিদ্যালয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, খুব কম ছাত্রছাত্রীই আছে যে বিদ্যালয় ফাঁকি দেয়। অভিভাবকদের চেয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা আরো বেশী সচেতন বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।  
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আলাউদ্দিন বলেন,‘আমার বাবাও সারা জীবন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে সুনাম অর্জন করে গেছেন। আমিও আমার বাবার আদর্শকে কাজে লাগিয়ে এলাকার ছাত্রছাত্রীদের জন্য কিছু করতে চাচ্ছি।’
কাশীপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জহিরুল হক জানান,‘আমি যতীন্দ্রপুরে ছিলাম সেখানেও ক্লাসের পরে সন্ধ্যাকালীন প্যারা শিক্ষক দিয়ে ফলাফল ভালো করেছি। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আমি ও আমার সকল শিক্ষক সহ এলাকাবাসী মিলে কাশীপুরের ভালো রেজাল্ট করতে পারছি। ছাত্রছাত্রীর অনুপাতে ক্লাস রুমে জায়গা কম থাকায় আমাদের আরেকটি ভবন নির্মাণ জরুরী।’
জামালগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নূরুল আলম ভূঁইয়া জানান,‘পর পর দুবার জামালগঞ্জে কাশীপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রথম হয়েছে। এবার জেলার মধ্যেও শ্রেষ্ঠ প্রাথমিক বিদ্যালয় মনোনীত হয়েছে।’
জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা টিটন খীসা বলেন,‘জামালগঞ্জের কাশীপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়টি আসলেই হাওর অঞ্চলের শিক্ষার বাতিঘর। এই প্রতিষ্ঠানটিই শুধু জামালগঞ্জের নয় সকলেরই অনুকরণীয়। শিক্ষা ক্ষেত্রে আরো উজ্জ্বল ভুমিকা রাখবে এই মফস্বলের বিদ্যালয়টি।’

  • [১]