মোহাম্মদ এমরান হোসেন
ভূতাত্ত্বিকগণ মনে করেন হাওরাঞ্চল পূর্বে সাগরের বিশাল জলরাশি ছিল। সাগর আস্তে আস্তে দক্ষিণে সরে গিয়েছে এবং কালের বির্বতনে তা হাওরের রূপ লাভ করেছে। ভাষাবিদগণ “হাওর” শব্দকে সংস্কৃত সাগর শব্দের অপভ্রংশ বলে অভিমত প্রদান করেছেন। ‘সাগর’ শব্দ লোকমুখে বির্বতিত হয়ে ‘হাওর’ (সাগর>সাওর>হাওর) হয়েছে। গাঙ্গেয় অববাহিকায় অবস্থিত পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ আমাদের এ প্রিয় বাংলাদেশ। উর্বর পলল-সমৃদ্ধ ছোট্ট এই দেশটি ভূ-বৈচিত্র্য ও রূপবৈচিত্র্যের বিচারে পৃথিবীতে এক অনন্য দেশ। বাংলাদেশ যেমন পৃথিবী সর্বোচ্চ নদী বিধৌত সমতল ভূমির দেশ তেমনি এদেশে রয়েছে প্লাইস্টোসিনকালের বিভিন্ন গড় অঞ্চল, পাহাড় ও সুবিশাল সমুদ্র উপকূল। বাংলাদেশের ভূ-বৈচিত্র্যের এক অনন্য স্বতন্ত্র দিক হচ্ছে হাওর। বাংলাদেশের বিশাল অংশ হাওর এলাকা হিসেবে পরিচিত। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল তথা কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও ব্রাক্ষণবাড়িয়া অর্থাৎ এ সাতটি জেলার প্রায় ৮.৫৮ লক্ষ হেক্টর জমি নিয়ে হাওর অঞ্চল গঠিত। যা দেশের মোট আয়তনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। পানি সম্পদ মন্ত্রাণলয় সূত্রে জানা যায়, দেশে ছোট বড় ৪১৪টি হাওর, জলাশয় ও জলাভূমি রয়েছে। জলমহাল রয়েছে ২৮ হাজার। বিল রয়েছে ছয় হাজার ৩০০। ভাটির দেশ হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জে রয়েছে ১৩৩টি, সিলেটে ৪৩টি, হবিগঞ্জে ৩৮টি, মৌলভীবাজারে ৪টি, নেত্রকোনায় ৮০টি, কিশোরগঞ্জে ১২২টি, ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় ৩টি হাওর রয়েছে। সর্বোপরি সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাক্ষণবাড়িয়ার কিয়দাংশ এ সকল জেলার প্রায় পাঁচ হাজার হাওর-বাওর, বিল-ঝিল নিয়ে গঠিত হাওরাঞ্চল বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে হাওরের রয়েছে বিশাল প্রভাব। হাওরর পাড়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবন হাওর প্রভাবিত। এ অঞ্চলের মানুষের চিন্তা-চেতনা, মেধা-মনন, সাংস্কৃতিক কর্মকার্ন্ড, অর্থনৈতিক প্রাণ চাঞ্চল্য সবকিছু হাওর কেন্দ্রিক। তাই এই সমস্ত ক্ষেত্রে হাওর এলাকার সাথে দেশের অন্যান্য এলাকার রয়েছে বৈসাদৃশ্য। হাওরে বসবাসরত মানুষজন প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করেই বেঁেচ আছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে ঝড়, শিলাবৃষ্টি, বজ্রপাত, আগাম বন্যা (ঋষধংয ভষড়ড়ফ) হাওরের বেশিরভাগ ঘর-বাড়ি ভেঙ্গে লন্ডভন্ড করে দেয়। এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। এক গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০৫০ সাল নাগাদ হাওর অঞ্চলে পানির উচ্চতা প্রাক-বর্ষা মৌসুমে দশমিক ৩ থেকে দশমিক ৬ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। সুতরাং সময় থাকতেই হাওরে আনতে হবে পরিকল্পিত কর্মসূচি, যে কর্মসূচি হবে উন্নত পৃথিবীর পানিবেষ্টিত জনপদের মতো জীবনবান্ধব। এ এলাকার জীবন ব্যবস্থায় যার অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের ভিত্তি কেবলই পানি আর পানি, তখন পানি সহায়ক কর্মকান্ড যেমন ধান চাষ, মৎস্য চাষ, হাঁস চাষ, পানি ফলের চাষ, নৌকা যোগাযোগ ইত্যাদি এই অঞ্চলের মূল অর্থনৈতিক কর্মকান্ড। সময় পরিক্রমায় জীবিকার ধরণেও পরিবর্তন হয়। হাওর এলাকার এ সমস্ত দিক চিন্তা করে হাওর কেন্দ্রিক উন্নয়ন ভাবনা প্রথম শুরু হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাধ্যমে। হাওর ও জলাভূমি এলাকার জনগণের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে হাওর উন্নয়ন বোর্ড গঠনের নির্দেশ প্রদান করেন। পরবর্তীকালে ১৯৭৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে হাওর উন্নয়ন বোর্ড গঠন করা হয় কিন্তু হাওর এলাকার সাধারণ মানুষের জীবন মান উন্নয়নের যে স্বপ্ন নিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হাওর উন্নয়ন বোর্ড গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন তা অকার্যকর হয়ে পড়ে। কিন্তু ১৯৮২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর বোর্ডটি বিলুপ্ত করা হয়। হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন স্থবির হয়ে পড়ে। হাওর এলাকার মানুষ শিক্ষা-দীক্ষা থেকে শুরু করে জীবযাত্রার মানোন্নয়নে পিছিয়ে পড়ে। জাতির পিতার পর হাওর এলাকার উন্নয়নের সুবাতাস আবার আসতে থাকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে। ১৯৯৮ সালের ৩ অক্টোবর কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইনে এক জনসভায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাওর ও জলাভূমি এলাকার উন্নয়নে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তারই ধারাবাহিকতায় ২০০১ সালের ১০ জানুয়ারি দুইটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড’ এবং বোর্ডের ‘কার্যনির্বাহী কমিটি’ গঠন করা হয়। পরে হাওর ও জলাভূমি এলাকার উন্নয়নে ব্যাপক গতিশীলতা আনয়নের লক্ষ্যে ২০১৪ সালের ১৭ নভেম্বর হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডকে অধিদপ্তর ঘোষণার নির্দেশ প্রদান করেন। হাওর এলাকার মানুষের সার্বিক উন্নয়নের কথা বিবেচনায় নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় হাওর এলাকার জনজীবন, জীবিকা, পরিবেশ-প্রতিবেশসহ সার্বিক উন্নয়নের জন্য ২০১২ থেকে ২০৩২ সাল পর্যন্ত মোট ২০ বছর মেয়াদি একটি হাওর মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।
‘মাছে ভাতে বাঙ্গালি’ আজন্ম কালের প্রবাদ। দেশের মৎস্য সম্পদের একটি বড় অংশ হাওরেই উৎপাদিত হয়। দেশের মোট মাছের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ যোগান দেয় হাওর। দেড় কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা মৎস্য সম্পদের উপর নির্ভরশীল। ১৩ লাখ মানুষ সরাসরি মাছ ধরার উপর নির্ভরশীল। সুনামগঞ্জ জেলায় ৯২০০০ নিবন্ধিত এবং প্রায় ৩০০০০ অনিবন্ধিত মৎসজীবি রয়েছে। রপ্তানি খাতের মধ্যে মৎস্য অন্যতম। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে মৎস্য খাত দ্বিতীয়। হাওরাঞ্চলের জলরাশিতে পাওয়া যায় বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী নানা জাতের মাছ যেমন-কৈ, সরপুটি, তিতপুটি, কাতলা, মাগুর, খৈলসা, বাঁশপাতা, আইড়, টেংরা, বাইম, চিতল, ভেদা, পাবদা, শোল, মহাশোল, চাপিলা, কাকিলা, বোয়াল, মৃগেল, রুই, কালবাউস প্রভৃতি। মৎস্য বিজ্ঞানীদের ভাষায় হাওর হলো মাদার ফিসারী। দেশের ২৬০ প্রজাতির মাছ এর মধ্যে এই মাদার ফিসারিতে মিঠা পানির মাছ আছে প্রায় ১৫০ প্রজাতির। যার মধ্যে প্রাকৃতিক এবং মানুষের হস্তক্ষেপের কারণে বিলুপ্তির পথে প্রায় ৬০টি প্রজাতি যেমন তিলা শোল, পাঙাশ, রিটা, মহাশোলসহ অন্যান্য মাছ। সিলেট বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের মতে, এই বিভাগের বিভিন্ন উৎস যেমন হাওর, জলাশয়, পুকুর ইত্যাদি থেকে প্রতিবছর ১,২৩,৮২৫.৩৬ টন মাছ আহরণ করা হয়। মৎস্য অধিদপ্তরের মতে সুনামগঞ্জ জেলায় প্রতিবছর ৮৯ হাজার টন মাছ উৎপাদিত হয়। জেলার স্থানীয় চাহিদা ৫৪ হাজার টন। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত থাকে ৩৫ হাজার টন। হাওর অঞ্চলে গুনগত মানসম্পন্ন মাছের পোনার অভাবে অনেক সময়েই মাছের উৎপাদন ব্যাহত হয়। এক্ষেত্রে মানসম্পন্ন মাছের পোনা সরবরাহের মাধ্যমে ঈধঢ়ঃঁৎবফ ঈঁষঃঁৎব এবং ঙঢ়বহ ঈঁষঃঁৎব এর ব্যবস্থা জোরদার করা যেতে পারে। প্রজনন মওসুমে মৎস্য প্রজাতি রক্ষা, মাছের বিস্তার ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণে ২/৩ মাস (এপ্রিল-জুন) মাছ ধরা সম্পূর্ণ বন্ধ করাসহ নিবদ্ধিত মৎস্যজীবীদের ভিজিএফ/ভিজিডি প্রদান করা-যাতে তারা মা মাছ ধরা বন্ধ রাখে। মাছের প্রাকৃতিক বিচরণের পথগুলো চালু রাখতে হবে এবং কোন অবস্থাতেই তা বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। এতে করে হাওরে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। যেহেতু মাছ হাওর অঞ্চলের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম উৎস, সেহেতু মৎস্য চাষকে আমাদের বহুমুখীকরণ করতে হবে। মৎস্যজীবীরা যেন মাছের ন্যায্য মূল্য পায় সে জন্য কাওরানবাজার সহ দেশের বড় বড় চেইন শপগুলোতে সরাসরি হাওরের মাছ সরবরাহের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। মাছের সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের জন্য হাওর এলাকাতে কোল্ড স্টরেজ, ফুড প্রসেসিং কারখানা, একাধিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে। শুধু তাই নয়, ভূমিহীন জনবসতীর এক অপূর্ব কর্মসংস্থানের পথ হলো হাওরের মাছ আহরণ এবং তা থেকে তৈরি শুটকি মাছ থেকে নিজের শ্রম বিক্রি। এসব শুকনো মাছের শুটকি অনেকের কাছে প্রিয় খাদ্য তালিকার অংশবিশেষ, যা দেশি বাজারে ছেড়ে আর্ন্তজাতিক বাজারে বিস্তৃত।
মৎস্যজীবীদের আর্থিক সক্ষমতার তুলনায় জলমহালের ইজারা মূল্য অধিক সেহেতু বিদ্যমান ইজারা পদ্ধতির পরিবর্তে কার্ডধারী নিবন্ধিত মৎস্যজীবী সমিতির অনুকূলে টোকেন মূল্যে জলমহাল ইজারা প্রদান করা যেতে পারে। খাজনা আদায় বিষয়টি গৌণ করে জৈবিক ব্যবস্থার মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এক্ষেত্রে মৎস্য বিভাগের জৈবিক ব্যবস্থা বিষয়ক প্রত্যয়ন ছাড়া জলমহাল লীজ নবায়ন না করা। মহামান্য হাইকোর্টের একাধিক বেঞ্চে জলমহাল সংক্রান্ত মামলার রিট দায়ের এর সুযোগ থাকায় জলমহাল নিয়ে জটিলতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেহেতু জলমহালের ক্ষেত্রে রিট দায়েরর ক্ষেত্রে বিভাগ ভিত্তিক বেঞ্চ নির্ধারণ করা যেতে পারে। সরকারের নীতিমালা, ২০০৯ প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের ফলে মৎস্যজীবীগণ অংশগহণ করতে পারেন না। কিন্তু বড় বড় জলমহালের ইজারা মূল্য অধিকাংশ মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সামর্থের বাহিরে হওয়ায় মৎস্যজীবীগণ জলমহালের ইজারা মূল্য পরিশোধে স্থানীয় দাদন ব্যবসায়ী/ব্যাংক ঋণ গ্রহণ করতে হয়। ফলে মৎস্যজীবীগণ আহরিত মৎস্যের প্রকৃত অংশীজন হতে পারছেন না। ফলে মৎসজীবীগণের আর্থ-সামাজিক অবস্থার কাঙ্খিত উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। প্রকৃত মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির অনুকূলে জলমহাল ব্যবস্থাপনায় রাখার জন্য নিবন্ধিত মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির বিপরীতে কম সুদে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা যেতে পারে। প্রয়োজনে মৎস্য আহরণ মৌসুমে ঋণ আদায়ের জন্য তৃতীয় পক্ষ/এনজিওকে সম্পৃক্ত করে পাইলটিং আকারে কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে।
বাংলাদেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ১৬% আসে হাওর থেকে যার মূল্য জাতীয় আয়ের প্রায় ৬-৮ ভাগ এবং মোট উৎপাদিত ফসলের ৭৯.৫% হচ্ছে বোরো ধান। সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, জেলায় গত ২০১৭ সালে বোরো মৌসুমে প্রায় দুই লক্ষ ২৩ হাজার ৮৭ হেক্টর জমিতে বোর ধানের আবাদ হয়েছিল। ফলনও হয়েছিল ভালো। প্রায় আট লাখ ৪৩ হাজার টন চাল পাওয়া যেতো এ পরিমাণ ধান থেকে। যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৩৪ হাজার ১৬ কোটি টাকা। কিন্তু গত ২৯ মার্চ ২০১৭ এর পাহাড়ি ঢল ও বর্ষণে বাঁধ ভেঙ্গে জেলার সবগুলো হাওর তলিয়ে গেছে। সরকারি হিসাবেই ফসলের ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৯০ ভাগ। যার আর্থিক ক্ষতি প্রায় ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। শুধু ধানই নয়, এ অকাল বর্ষণ ও ঢলে সুনামগঞ্জ জেলার প্রায় ১১৯ হেক্টর জমির সবজিও নষ্ট হয় যার আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৪০ লাখ টাকা। জেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায় সুনামগঞ্জে আমন বোরো মিলিয়ে প্রতিবছর প্রায় ৯ লাখ ৭৬ হাজার ১৯৭ টন খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে জেলার চাহিদা চার লাখ ১৪ হাজার ৬১৫ টন। প্রতিবছর উদ্বৃত্ত থাকে প্রায় পাঁচ লাখ ৪০ হাজার ৩৪৯ টন। গত ২৯ মার্চ ২০১৭ সালের আগাম বন্যায় জনজীবনে মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়। সরকার তাৎক্ষণিকভাবে মানবিক বিপর্যয় রোধে ভিজিডি কর্মসূচির মাধ্যমে পরবর্তী ফসল সংগ্রহ পর্যন্ত ১,৬৮,০০০ পরিবারকে মাসিক ৩০ কেজি করে খাদ্য শস্যসহ ৫০০/- টাকা সহায়তা করার পাশাপাশি ১,৫০,০০০ পরিবারকে ৮ কেজি করে খাদ্য শস্য প্রদান করা হয়। এ কর্মসূচিতে সরকারের প্রায় ৬১,৬৮০ মেট্রিক টন খাদ্য শস্য এবং ১০০ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়। যার ফলে মানবিক বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়। মার্চ ২০১৭ সালের আগাম বন্যা এবং পাহাড়ী ঢলের প্রভাবে হাওর অঞ্চলে ব্যাপক ফসল ও সম্পদের ক্ষতির ফলে সংশোধিত কাবিটা নীতিমালা ২০১৭ প্রণয়ন করে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত এ স্থানীয় সকল শ্রেণী পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করে। ফলে ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থ বৎসরে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত সফলভাবে সম্পাদন সম্ভব হয়েছে। ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থ বৎসরে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত যথাক্রমে প্রায় ১৫৩ কোটি ও ৯৪ কোটি টাকা ব্যয় হয়। ফলশ্রুতিতে হাওরে ফসলের বাম্পার ফলন হয়। ফলে সরকারকে ২০১৭ সালের ন্যায় খাদ্য আমদানী করতে হয়নি। ২০১৯-২০ অর্থ বৎসরে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত কাজ চলমান রয়েছে। তবে স্থানীয়দের মতে বছর বছর হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত কাজের কারণে হাওরের জীববৈচিত্র বিশেষ করে মৎস্য প্রজাতির সংখ্যা ও প্রজাতি সংকটাপন্ন হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্টদের হাওরের ফসল রক্ষার পাশাপাশি জীববৈচিত্র রক্ষায় টেকসই প্রকল্প গ্রহণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
হাওরে সারা বছর কেবল একটি ফসল হয়, যা বোরো মৌসুমে আবাদের সময়। বর্তমানে হাওরের জনসংখ্যা প্রায় দুই কোটি। যার সিংহ ভাগ (৯০ শতাংশ) কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে যেসব কৃষক হাওর অঞ্চলে চাষবাষ করেন তাদের অনেকেই প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, বড় কৃষিজমির মালিকানা অনুপস্থিত ভূ-স্বামীদের কাছে। তাদের কাছে এক ফসলি কিংবা দুই ফসলি কিছুই আসে যায় না। এসব অঞ্চলের কৃষিকাজ এখন অনেক কৃষককে আর আকৃষ্ট করে না উপর্যুপরি অনিশ্চয়তার কারণে। প্রায়ই আগাম বন্যায় শুস্ক মৌসুমের বোর ধান পানিতে তলিয়ে যায় পাহাড় ঢলের পানিতে। তখন সেসব অঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তায় সংকটে দেখা দেয় এবং অভাবের তাড়নায় কৃষি সম্পৃক্ত জনবসতি আরো ক্ষতিগ্রস্ত হয় বারবার। ফলে মানুষ এখন এলাকা ছেড়ে আধুনিক জীবনের আশ্রয়ে পাড়ি জমায় শহরের দিকে। কথা বলে-এক ফসলি ধান, হাওরবাসির প্রাণ হলেও বছরে বর্তমান উৎপাদনের পরিমাণকে অনায়েসেই দ্বিগুন করা সম্ভব। যদি জমির জলাবদ্ধতা দূর করে তা দুই বা তিন ফসলি জমিতে রুপান্তর করা যায়। অপরদিকে জলাবদ্ধ-সহিষ্ণু জাতের বা গভীর পানির আমন ধানের জাতের চাষ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সার্বিক বিষয়গুলোর সম্বোধন করলেও এই অঞ্চলে বানিজ্যিকভাবে চাষাবাদ করার প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনী কাঙ্খিত কিছু হয়েছে বলে মনে হয় না। যা কৃষি গবেষণার একটি বিরাট ক্ষেত্র হতে পারে। ভাসমান সবজি চাষ হাওরাঞ্চালেও ব্যাপক ভিত্তিতে চালু করা যেতে পারে।
আগাম বন্যার কারণে হাওরে প্রায়শঃই ধান উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কৃষকরা দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে পড়ে। আকস্মিক বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে ধান চাষের এ ক্ষতি হ্রাস করতে হলে হাওর অঞ্চলের কৃষকের পছন্দমতো উচ্চফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করার কার্যক্রম গতিশীল করতে হবে এবং সেই সঙ্গে কৃষক পর্যায়ে স্বল্পমেয়াদি উন্নত জাতের ধানের বীজ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। অনেক বৈচিত্র্য ও সীমাবদ্ধতার কারণে সেখানে ফসল উৎপাদন যেমন কষ্টকর, তেমরি পর্যাপ্ত মূলধন, হাওর অঞ্চলের চাষ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাব এবং ফসল বিপণনের ধারণার অভাবে কৃষক প্রায়শঃই ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়।
হাওর হচ্ছে সারা বাংলাদেশের জন্য একটি ইকোসিস্টেম সার্ভিসের আধার। যারা এই সার্ভিসটা প্রদান করছে, তারাই বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্র, সুতরাং তাদেরকে কীভাবে কমপেনসেট করা যায় সেই বিবেচনা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশে শস্যবীমা ব্যবস্থা নেই, কিন্তু হাওরের আগামা বন্যার জন্য শস্যবীমা নীতি গ্রহণ করা উচিত। একইসঙ্গে যদি অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র জীবনকালের শস্য চাষের ব্যবস্থা করা যায় তা আরো কার্যকর হবে। এসব বিবেচনায় হাওরের কৃষিকে টেকসই করার জন্য জরুরীভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
বর্তমান সরকার দেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের সফল উদ্যোগে হাওর হতে পারে পর্যটন পিয়াসীদের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। অর্জন হতে পারে এ শিল্প থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। হরেক প্রজাতির পরিযায়ী ও আবাসিক পাখির বিচরণ হাওরে। পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত হয় চারপাশ, রঙবেরঙা অসংখ্য চেনা-অচেনা পাখির মনোমুগ্ধকর মেলা আকৃষ্ট করে হাওরপ্রিয় মানুষকে। সবকিছু মিলিয়ে হাওর হতে পারে পর্যটন বিকাশের বড় মাধ্যম। বর্ষায় যৌবনবতী হাওর সাগরের মতো অনন্ত অসীম জলধারা। দুরের আকাশ আর পাহাড়ের মনোরম দৃশ্য হৃদয়কাড়ে। হাওরে নৌকা ভ্রমণে চাঁদসুন্দর রাতের স্মৃতি জীবনে একবার গেঁথে নিলে আমৃত্যু সে তৃষ্ণা থেকে যাবে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে সরকার।
দেশের বৃহত্তম দুই হাওর হাকালুকি ও টাংগুয়া প্রাকৃতিক সম্পদের ভান্ডার হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের বৃহত্তম মিঠা পানির জলাভূমি হিসেবে পরিচিত সিলেট ও মৌলিভীবাজারের ৫টি উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত হাকালুকি হাওর প্রায় ২৩৮টি বিল ও ১০টি নদীর সমন্বয়ে গঠিত। হাকালুকি হাওরে শীতকালে অতিথি পাখির আগমন ও স্থানীয় প্রায় ১০০ প্রজাতির পাখির কলতান পরিবেশ ভ্রমণ পিপাসুদের আহবানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সুনামগঞ্জ জেলার সীমান্তে সবুজের ঘেরা সুবিস্তৃত পাহাড়, টাংগুয়ার হাওরে বছরে প্রায় সবসময় বিশেষ করে শীতকালে প্রচুর দেশী-বিদেশী বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, নীলাভ জলরাশির সিরাজ লেক, মনোমুগ্ধকর বারেকের টিলা, সবুজ পাহাড় ঘেষে টেকেরঘাট চুনাপাথর খনি প্রকল্প, মনোলোভা শিমুল বাগান, হলহলিয়া জমিদার বাড়ী, প্রায় ২০০০ বছরের প্রাচীন পুরান লাউড় রাজ্যের রাজধানী লাউরের গড়, শাহ আরেফিনের মাজার, শ্রী অদ্বৈত্য মহাপ্রভুর আখড়া/মন্দির প্রভৃতি দর্শনীয় ও ধর্মীয় স্থান রয়েছে। বিশেষ করে বিশাল জলরাশি সমৃদ্ধ পাহাড় ঘেষে টাংগুয়ার হাওর (১০৩১তম রামসার সাইট) যা ধর্মপাশা ও তাহিরপুর উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত। সুনামগঞ্জের বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ ছোট বড় ৫১টি বিলের সমন্বয়ে গঠিত টাংগুয়ার হাওরকে সম্পদ ও সৌন্দর্যের রাণী হিসেবে অভিহিত করা হয়।
বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ সুনামগঞ্জের টাংগুয়ার হাওর পরিযায়ী পাখির অভয়াশ্রম। ২০০০ সালের ৬ জানুয়ারি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টাংগুয়ার হাওরকে ‘রামসার সাইট’ হিসেবে ঘোষণা করেন। প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এ হাওরটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠা পানির জলাভূমি। স্থানীয় লোকজনের কাছে হাওরটি নয়কুড়ি কান্দা ছয়কুড়ি বিল নামেও পরিচিত। এটি সুন্দরবনের পরই বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার স্থান। পরিবেশবাদীদের গবেষণা রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বে বিপন্ন প্রায় বিরল প্রজাতির ২ শতাধিক পাখি এবং বিপন্ন ১৫০ প্রজাতি মাছের সমাগম এ হাওরে। টাংগুয়ায় রয়েছে স্তণ্যপায়ী দুর্লভ জলজ প্রাণী গাঙ্গেয় ডলফিন (শুশুক), খেঁকশিয়াল, উঁদ, বনরুই, গন্ধগোকুল, জংলি বিড়াল। উদ্ভিদের মধ্যে নলখাগড়া, হিজল, করচ, বরুন, রেইনট্রি, পদ্ম, বুরো গোলাপসহ ২০০ প্রজাতির অধিক দেখা মেলে।
বাংলাদেশের বিশেষ করে সুনামগঞ্জ জেলার হাওরগুলোর আছে মনোমুগ্ধকর নাম যেমন-টাংগুয়ার হাওর, শনির হাওর, মাটিয়ান হাওর, দেখার হাওর, হালির হাওর, কড়চা হাওর, পাকনা হাওর, ধলা পাকনা হাওর, আঙ্গরখালি হাওর, খচ্চর হাওর, নখলা হাওর, সানুয়াডাকুয়া হাওর, শৈল চকরা হাওর, হৈশাম হাওর, বড় হাওর, হালিয়ার হাওর, চন্দ্রসোনার থাল হাওর, ডিঙ্গাপুতা হাওর প্রভৃতি।
টাংগুয়ার হাওরসহ আশপাশের পর্যটন এলাকায় পর্যটকদের মানসম্মত খাওয়া দাওয়া ও বাসস্থানের সুযোগ না থাকায় বিশাল সম্ভবনা থাকা সত্বেও পর্যটক আকর্ষণ করা যাচ্ছে না। সমস্যা সমাধানে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে হোটেল-মোটেল স্থাপন করা যেতে পারে। এছাড়াও ট্যুরিস্ট গাইড তৈরী করা যেতে পারে। ইকো ট্যুরিজমও হতে পারে হাওরাঞ্চালের বিকল্প কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আয়ের অন্যতম খাত। সুনামগঞ্জ জেলা শহর হতে উল্লেখিত স্থান সমূহে যাতায়াতের জন্য উপযুক্ত কোন রাস্তা না থাকায় অনেক লোক সুনামগঞ্জের দর্শনীয় স্থানসমূহ দর্শন না করেই জেলা শহর হতে ফিরে যায়। সুনামগঞ্জ জেলা শহর হতে উল্লেখিত স্থানসমূহে যাতায়াতের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সাধন তথা মান সম্মত রাস্তা নির্মাণ/সংস্কার করা হলে একদিকে যেমন পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটবে অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে। তাছাড়া হাওর এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পর্যটন শিল্পকে ঘিরে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাসহ আর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটবে। বাস্তব অবস্থার বিবেচনায় সুনামগঞ্জ হতে তাহিরপুর পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারসহ (০১) সুনামগঞ্জ শহর হতে পলাশ জিসি আরএইচডি (০২) বিশ্বম্ভরপুর-পলাশ-চিনাকান্দি সড়ক (পলাশ আরএইচডি হইতে ধনপুর পর্যন্ত) (০৩) ধনপুর-বিন্নাকুলি-আনন্দবাজার-লাউড়েরগড় (বিশ্বম্ভরপুর অংশ) (০৪) আনন্দবাজার-লাউড়েরগড় (দক্ষিন বাদাঘাট ইউপি) তাহিরপুর অংশ বিন্নাকুলি হইতে আনন্দবাজার (০৫) মহেষখলা-পলাশ জিসি ভায়া বিন্নাকুলি সড়ক (তাহিরপুর অংশ বাঙ্গাল ভিটা হতে বিন্নাকুলি পর্যন্ত) (০৬) মধ্যনগর-মহেষখলা হতে টেকেরঘাট ভায়া ভালিয়াঘাটা সড়ক নির্মাণ করা প্রয়োজন।
হাওর এলাকায় স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার ব্যবহার দেশের অন্যান্য এলাকার চেয়ে নাজুক। অশিক্ষা, অজ্ঞতা হাওর জনপদকে অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে আছে। ফলে তাদের ভিতর স্বাস্থ্য সচেতনতা কাঙ্খিত পর্যায়ে নেই। নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলার হাওর অঞ্চলে প্রায় ৩৫ শতাংশ পরিবার স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার করে। এখানে ৬৫ শতাংশ পরিবার ঝুলন্ত বা কাঁচা পায়খানা ব্যবহার করে। অনেকেই ঝোপঝাড়ের আড়ালে প্রাকৃতিক কর্ম সম্পন্ন করে। স্যানিটেশন বিজ্ঞানসম্মত না হওয়ায় দুষিত হচ্ছে পানি। হাওর জনপদে লেগেই আছে পানিবাহিত রোগ। কলেরা, টাইফয়েড, আমাশয়, কৃমি ও জন্ডিসের মতো রোগবালাই সারা বছরই দেখা যায় হাওরের কোন না কোন ঘরে। হাওর জেলা সুনামগঞ্জে ল্যাট্রিন ব্যবহারকারীর শতকরা হার ৮৩.২৬% এবং স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন ব্যবহারকারীর প্রায় ৫৩.৪৬%। নিরাপদ পানি ব্যবহারকারীর হার শতকরা ৮০%। হাওর এলাকায় পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থার এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ হচ্ছে সচেতনতা ও শিক্ষার অভাব এবং উঁচু স্থানের স্বল্পতা। বর্তমান সরকার এসডিজি (ঝউএ) বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে হাওর এলাকায় নিরাপদ স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তার ধারাবাহিকতায় সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে ২০২১ সালের মধ্যে শতকরা স্যানিটেশন ও নিরাপদ খাবার পানির কাভারেজের প্রজেক্ট চলমান রয়েছে। আশা করা যায় বাকি ৯টি উপজেলাসহ সমগ্র দেশে পানি সরবরাহ, হাওর অঞ্চলে পানি নিরাপদ ও স্যানিটেশন প্রকল্পের আওতায় ২০২৫ সাল নাগাদ শতভাগ স্যানিটেশন ও বিশুদ্ধ খাবার পানি কাভারেজ চলে আসবে। বিশুদ্ধ খাবার পানি এবং সঠিক চিকিৎসার অভাবে হাওর অঞ্চলে শিশু মৃত্যুর হার দেশের অন্যান্য এলাকা থেকে অনেক বেশি। হাওর এলাকায় ডাক্তার সহজলভ্য নয়। উপজেলা হাসপাতালগুলোয় ডাক্তারের পদ শূণ্য পড়ে থাকে বছরের পর বছর। সেসব এলাকায় যেতে চায়না কেউ। বিদ্যমান অবস্থা মোকাবেলায় দ্রুত ডাক্তারের শূণ্যপদ পূরণসহ ওয়াটার এম্ব্যুলেন্স চালু করা যেতে পারে।
স্বাধীনতার মৌলিক স্বাদ থেকে বঞ্চিত এখনো হাওরের মানুষ। কৃষিভিত্তিক হাওরের জনজীবনে সংকট এখনো নিত্যদিনের সঙ্গী। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, আশ্রয়, খাদ্য, যোগাযোগ কোনটিই এখনো আলোকিত নয়। এমন কি দেশের অপেক্ষাকৃত অনুন্নত এলাকার সঙ্গেও তুলনীয়। শিক্ষার দিক থেকে হাওর অঞ্চল এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। বেশির ভাগ ছেলেমেয়ে প্রাইমারি অতিক্রম করতে পারে না। প্রান্তিক পরিবারের ছেলেমেয়েরা প্রাইমারিতেও যেতে চায়না। যাবে কি করে? কখনো কাদাজলে হেঁটে, কখনো খেয়া নৌকা ভেসে বাচ্চাদের স্কুলে যাওয়া সত্যিই কঠিন। তবে দেশের অন্যান্য এলাকা থেকে হাওর এলাকায় শতভাগ শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ শুধু কষ্টসাধ্যই নয় বরং একটা চ্যালেঞ্জ। এই এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্রথাগত ধ্যান-ধারণা ইত্যাদি অনেক অনুঘটক গণমুখী শিক্ষার প্রচার ও প্রসারে বাধা হিসেবে কাজ করে।
সুনামগঞ্জ জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৪৬৯টি। কিন্তু উচ্চ বিদ্যালয়, মাদ্রাসা এবং কলেজ এর সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়। সুনামগঞ্জ জেলায় শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিট ভর্তির হার ছিল ৯৮.৫৩%। গড় উপস্থিতির হার ৮৯ শতাংশ। প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে ঝড়ে পড়ার হার ১০.৩৮ শতাংশ। ইউনিসেফ ২০১৯ এর তথ্য অনুযায়ী সুনামগঞ্জ জেলায় শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়ার হার ৩৭%। হাওর জনপদের অসুবিধাগ্রস্ত পরিবারের অভিভাবকগণ পূর্বে প্রাথমিক শিক্ষা সর্ম্পকে কিছুটা অসেচতন থাকলেও বর্তমানে সমাজের উচ্চবিত্ত পরিবারের মত প্রান্তিক সমাজের অভিভাবকদের কাছেও প্রাথমিক শিক্ষার চাহিদা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অভিভাবকগণ তাদের সন্তানদের মৌলিক শিক্ষা হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষাকে বেছে নিচ্ছেন। ফলে প্রাথমিক শিক্ষায় শিশুদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০১৮ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনি পরিক্ষায় পাশের হার ৯১.৯৫%। হাওরে শিশুদের জন্য শিক্ষা মাধ্যম শুধু জ্ঞানার্জনের জন্য হলেই চলবে না, শিক্ষা হতে হবে জীবনমুখী ও বাস্তবভিত্তিক। শিক্ষার মাধ্যমে যেন শিক্ষার্থী তার আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গীর ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে পারে। আশাব্যঞ্জক হলো বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধনের সাথে সাথে বর্তমান যুগে ছেলেমেয়েদের উচ্চ শিক্ষায় অংশ গ্রহণের হার বেড়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা পরিমাণ ও গুনগত মানও বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অভিভাবকদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। সরকারের নানামুখী উদ্যোগ সত্বেও হাওর এলাকার শিক্ষার সংখ্যাগত ও গুনগত মানের কাঙ্খিত ফলাফল অর্জিত হয়নি। পরিস্থিতির উন্নয়নে অপেক্ষাকৃত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ১ম পর্যায়ে শিক্ষকদের আবাসিক সুবিধা নিশ্চিত করা যেতে পারে। ২য় পর্যায়ে চাহিদা সম্পন্ন ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিদ্যালয়ে আবাসিক সুবিধার উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। সকল প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংযোগ সড়কগুলো জরুরী ভিত্তিতে নির্মাণ, সংস্কার ও মেরামতের কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে বর্ষা মৌসুমে ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিদ্যালয়ে যাতায়াতের জন্য নৌকার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বসতবাড়ীর সাথে বিদ্যালয়ের বিচ্ছিন্নতার কারণে হাওর এলাকার সকল প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মিড ডে মিল চালু করা যেতে পারে। সর্বোপরি সন্তানদের বিদ্যালয়মুখী করার জন্য সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগ প্রান্তিক পর্যায় থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ে অভিভাবক সমাবেশসহ মোটিভেশন কর্মসূচী ভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাবে গ্রীষ্মমন্ডলীয় দেশসমূহ (ঞৎড়ঢ়রপধষ ঈড়ঁহঃৎরবং) ব্রজপাতের তীব্রতা এবং সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই শতাব্দীর শেষে পৃথিবীর তাপমাত্রা দশমিক চার (০.৪) ডিগ্রী সেলসিয়াস বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তখন ব্রজপাতের হার প্রায় ০৮% বাড়বে। জ্বালানী ব্যবহার বৃদ্ধি, অত্যাধিক শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের ব্যবহার, গ্রিন হাউজ গ্যাসের নির্গমন বৃদ্ধির কারণে গোটা বিশ্বেই বজ্রপাত বাড়ছে।
বাংলাদেশে মার্চ-এপ্রিল হচ্ছে ব্রজপাতের মৌসুম। হাওর এলাকায় ধান কাটা ও মাছ ধরার সময় ব্রজপাতে প্রাণহানী বেশী হয়ে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে কেবল ২০১৮ সালে সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় ৮৮টি ইউনিয়নে ৬৮ জন বজ্রপাতের কারণে মৃত্যুবরণ করেছেন এবং আহত হয়েছেন দ্বিগুনেরও বেশি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের গবেষণায় সুনামগঞ্জ তথা হাওর এলাকায় ব্রজপাতের কারণ হিসেবে গাছপালাহীন বিশাল এলাকাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ সমস্যা নিরসনে খোলা মাঠ এবং হাওর-বাওর এলাকায় একটি নির্দিষ্ট দূরুত্ব পর পর ব্রজপাত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা প্রয়োজন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো বজ্রপাত তথ্যকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারসহ বছরের বিভিন্ন সময় ধান মাড়াই ও মজুদ এবং শুটকি তৈরি ও মজুদের কাজে ব্যবহার করা যাবে। তাছাড়া হাওর এলাকাতে বজ্রপাতের কারণে প্রাণহানী দূর করতে পানি সহনীয় হিজল করচ, তাল, কদম গাছ রোপন করা যেতে পারে এবং বিদ্যমান ভবনসমূহ বজ্রনিরোধক দন্ড স্থাপন করা যেতে পারে।
প্রতি বছর পাহাড়ি ঢলে প্রচুর পরিমাণে সিলিকা বালি, পলিমাটি হাওর, খাল ও নদীতে এসে জমা হচ্ছে এর সাথে ধান ও হাওরের গাছপালার-আগাছা পঁচাও যুক্ত হচ্ছে। এসকল কারণে হাওর, খাল ও নদীর নাব্যতা নষ্ট হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে একদিকে যেমন হাওরের পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে অন্যদিকে পানি ধারণ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। হাওর এলাকার স্বাভাবিক নৌ যোগাযোগ বর্ষা মৌসুমে ঠিক থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে ব্যাহত হচ্ছে। হাওর, খাল ও নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় ফ্ল্যাশ ফ্লাড বা পাহাড়ি ঢল ও সামান্য আগাম বৃষ্টির পানিতে হাওরের ধান পানিতে ডুুবে যাচ্ছে, কৃষকের ধান নষ্ট হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানকল্পে হাওর, খাল ও নদীকে জাতীয় খনন বা ন্যাশনাল ড্রেজিং বা ক্যাপাটাল ড্রেজিং এর আওতায় আনতে হবে। হাওর, খাল ও নদীর গভীরতা নিশ্চিত করা গেলে হাওর এলাকার মানুষের যোগাযোগের সহজলভ্যতা নিশ্চিত হবে সাথে সাথে যোগযোগ ব্যয়ও অনেকাংশে কেেম যাবে। হাওর, খাল, ও নদী প্রাথমিক ভাবে পাহাড়ি ঢল, আগাম বন্যা ও অতি বৃষ্টি পানি ধারন করে দুর্যোগের প্রাথমিক ধাক্কা থেকে হাওরের ফসল রক্ষা করা যাবে। স্বাভাবিক নৌ যোগাযোগ রক্ষার্থে নদীতে ব্রিজ নির্মাণের সময় পানি চলাচলের/সরে যাওয়ার বিষয়টির প্রতিও লক্ষ্য রাখতে হবে। হাওর এলাকায় যে কয়টি নদী ও খাল রয়েছে তা যেন হাওরের অতিরিক্ত পানি এবং বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত চলে যেতে পারে সেজন্য কিশোরগঞ্জ-ভৈরব পর্যন্ত নদীতে ড্রেজিং এর মাধ্যমে নাব্যতানিশ্চিত করতে হবে যাতে পানি নামার স্বাভাবিক পথ সারা বছর ঠিক থাকে। মেইনটিন্যান্স ড্রেজিং অব্যাহত রাখতে হবে এবং যা মার্চ ২০১৭ সালের মত অতি বৃষ্টি ও আগাম পাহাড়ি ঢলের হাত থেকে হাওরের ফসল রক্ষা করা যাবে। নদী, খাল ও হাওরের নাব্যতা নিশ্চিত করা গেলে পরিবেশের কোন ক্ষতি না করে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দেশীয় মাছের বিলুপ্তি দূর করা যাবে। যা ইতোমধ্যে হাওরে বিলুপ্ত মিঠা পানির প্রায় ১০০টি প্রজাতির মাছের জাত পুনঃউৎপাদন করা যাবে।
হাওর এলাকার অন্যতম সমস্যা হচ্ছে জ্বালানী সমস্যা। পানির আধিক্য ও পর্যাপ্ত উঁচু জমির স্বল্পতার কারণে এ এলাকায় গাছ পালার সংখ্যা খুব কম। ফলশ্রুতিতে হাওরে বিদ্যমান গাছপালাও মানুষের জ্বালানি কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে হাওরের পরিবেশের ভারসাম্য ও প্রতিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। হাওরের এ সমস্যা স্বল্প সময়ে সমাধানের জন্য পতিত জমি, বোর ফসল সংগ্রহের পর পতিত জমি ও ফসল রক্ষার জন্য হাওরের যে বাঁধ রয়েছে তার উপর ধইঞ্চ্যা চাষ করা যেতে পারে। ধইঞ্চ্যা দ্রুত বর্ধনশীল হওয়ায় স্বল্প সময়ে হাওরে পানি আসার আগে তা জ্বালানী হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী হবে। হাওরে গো-খাদ্যের সংকট ও প্রকট। ধইঞ্চ্যা গাছের বীজ গো খাদ্য হিসেবে উৎকৃষ্ট যার ফলে গো খাদ্যের সংকট কিছুটা নিরসন হবে। অন্যদিকে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের উপর ধইঞ্চ্যা গাছ রোপন করার কারণে হাওর রক্ষা বাঁধ টেকসই ও মুজবুত হবে সাথে সাথে হাওরের পরিবেশ সুরক্ষা হবে। তাছাড়া ধইঞ্চ্যা গাছের পাতা উৎকৃষ্ট (কম্পোস্ট) জৈব সার হওয়ায় ধান চাষে কম সারের প্রয়োজন হবে। ধইঞ্চ্যা চাষ শস্যার্বতন হিসেবেও কাজ করবে। হাওরের পরিবেশ রক্ষা ও জ্বালানী সমস্যা সমাধানকল্পে দীর্ঘ মেয়াদে হাওরে পানি সহনীয় হিজল করচ, তাল ও কদম গাছ লাগানো যেতে পারে। এক্ষেত্রে হাওর রক্ষা বাঁধ ও সরকারি পতিত জমিতে বৃক্ষরোপনের জন্য সমবায়ের মাধ্যমে স্থানীয় অংশীজনের সক্রিয় অংশ গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এতে হাওর ও হাওরের পরিবেশ রক্ষায় স্থানীয় জনগন উৎসাহ পাবে এবং সংকটাপন্ন জীববৈচ্যিতের উন্নয়ন গতিশীল হবে। যা হাওরে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি, শীতকালীন হাওরে আগত পরিযায়ী পাখিদের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিতকরণ এবং হাওরের বজ্রপাতে প্রাণহানী কিছুটা দূর করতে সহায়ক হবে।
অসীম সম্ভাবনা বুকে ধারণ করে জেগে আছে হাওর। সম্ভাব্য সবকিছু থাকা সত্ত্বেও যুগ যুগ ধরে হাওরাঞ্চল গুরুত্বহীন অব্যবস্থাপনার অনগ্রসরমান অবস্থায় পতিত। দেশকে দুই হাত ভরে দিয়ে দরিদ্রতাই তাদের সর্বশেষ পুঁজি। দুর্গম এলাকার এ সংগ্রামী মানুষ দুর্যোগ-দুর্বিপাকে দুর্বিসহ জীবন পার করে থাকে। বর্তমান সরকার হাওরের উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচী হাতে নিয়েছে। রাষ্ট্র যদি হাওরের এ অপর সম্ভাবনা ও সুযোগকে কাজে লাগায়, তাহলে একদিকে যেমন হাওরবাসী উপকৃত হবে, তেমনি দেশ অর্থনীতিতে আরও সমৃদ্ধিশালী অগ্রসরমান হবে। হাওরই হতে পারে আরেক অর্থনৈতিক অঞ্চলের উপযুক্ত পরিবেশ। শুকনা ও বর্ষায় হাওরাঞ্চলের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বহুমুখী ও পরিকল্পিত উপায়ে উদ্যোগ বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নিলে খুলে যাবে অপার সম্ভাবনাময় দুয়ার। এটা শুধু কথার কথাই নয়, হাওর তার রূপ-গুন ও কর্ম বিস্তীর্ণতায় তা দেখিয়ে যাচ্ছে। এই হাওরাঞ্চলের উন্নয়নকে জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত করা হলে স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে ১০ বছরের বেশি সময় লাগবেনা। হাওরের ঢেউরের মতো ফুলে ফেঁপে উঠবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ¯্রােত। হাওরাঞ্চল উন্নয়নে সরকারের জন্য বিবেচ্য বিষয় হতে পারে:
১। হাওরবাসীদের ফসল রক্ষার জন্য নদী-নালা, খাল-বিল, হাজা-মজা পুকুর-ডোবা কাজের বিনিময়ে খাদ্যে কর্মসূচির আওতায় খনন করতে হবে ২। নদীর দু’পাড়ে, হাওরের পতিত উচু জমিতে, গ্রামের চারপাশের ব্যাপক হারে পানি সহিষ্ণু বৃক্ষ রোপনের জঙ্গল তৈরি করে জ্বালানি কাঠের চাহিদা মেটানো যেতে পারে। জঙ্গলে বর্ষায় মাছের উত্তম জায়গা হবে। প্রচুর খাবার মিলবে। পাখিদের অভয়াশ্রম তৈরি হবে ৩। ঢেউ-এর আঘাতে অরক্ষিত ভিটেবাড়ী রক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে ৪। শুধু ধান চাষে নির্ভশীল না করে হাওরবাসী কৃষকদের বহুমুখী চাষাবাদে আগ্রহী করতে হবে। কৃষকদেরকে চাহিদা ভিত্তিক প্রশিক্ষণ এর ব্যবস্থা করতে হবে, শস্যবীমা নীতি গ্রহণ করতে হবে ৫। পাহাড়ী বোর্ডের ন্যায় হাওর উন্নয়ন বোর্ডকে প্রশাসনিক, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে শক্তিশালী করতে হবে ৬। হাওর মৎস্য ও কৃষি ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা যেতে পারে ৭। হাওরাঞ্চলের অবস্থা, প্রকৃতির ধরণ, অবকাঠামোর বৈশিষ্ঠ্য নিরূপণ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার স্থায়ী অবকাঠামোগত ব্যবস্থা এবং ভাসমান/ভ্রাম্যমান চিকিৎসা কেন্দ্রের মাধ্যমে স্বাস্থসেবা নিশ্চিত করতে হবে ৮। হাওরাঞ্চলে কারিগরি শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে হবে, সুনামগঞ্জের জন্য অনুমোদিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এ হাওরের জীব বৈচিত্র বিষয়ক ফ্যাকাল্টি রাখা যেতে পাওে ৯। ঋণ প্রশিক্ষণ সুবিধা দিয়ে আত্ম-কর্মসংস্থানমূলক প্রকল্প চালু করতে হবে ১০। হাওরাঞ্চলের প্রকৃতি পরিবেশকে উপজীব্য করে সেখানে পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে ১১। উন্নত পাথর, বালি ও সিমেন্ট এর সহজলভ্যতা থাকায় বৈদ্যুতিক পোল এবং সিরামিক্স কারখানা গড়ে তোলা যেতে পারে ১২। দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে হাওরাঞ্চলের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা ও পাঠ পরিক্রমা চালু করতে হবে ১৩। হাওর এলাকার হাজার বছরে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, জীবন-সংগ্রাম প্রভৃতির সংরক্ষণে সেখানে একটি ‘হাওর মিউজিয়াম’ গড়ে তোলা যেতে পারে ১৪। হাওরে সৌর বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে ১৫। নারীদের কর্মমুখী করে গড়ে তুলতে হবে; হাঁস-মুরগী, কবুতরসহ গৃহপালিত পশু পালন, সবজি উৎপাদন, মুড়ি চিড়া, খৈ তৈরি ও প্যাকেটজাতকরণ, শুটকি তৈরি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্ত ও কুটিরশিল্প খাতে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যেতে পারে ১৬। মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র, একাধিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র এবং বর্ষায় হাওরের পানিতে নিদির্ষ্ট স্থানে ঘের করে দেশীয় প্রজাতির মাছের পোনা ব্যাপকভাবে অবমুক্ত করতে হবে। এই পোনা বড় হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষার পর মুক্ত জলাশয়ে অবমুক্ত করা যেতে পারে। মুক্ত জলাশয়ে ঘের পদ্ধতিতে মাছ চাষ এবং ভাসমান সব্জি চাষের কথা ভাবা যেতে পারে। হাওরের মিঠা পানি প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে বাজারজাত করে মোটা অংকের অর্থ প্রাপ্তির অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে ১৭। শুকনা মৌসুমে দেখা যায় মাঠের পর মাঠ। ঘাস আর ঘাস। এই ঘাস আর মাঠকে কেন্দ্র করে দুগ্ধ খামার, গরু মোটাতাজাকরণ ও ছাগল পালন প্রকল্প করা যেতে পরে। তবে দুগ্ধ খামারের ক্ষেত্রে বর্ষায় গরুর বিকল্প খাবারের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে ১৮। শুকনা সময়ে পতিত চট্টন এলাকাকে কী করে উৎপাদনশীল হিসেবে তৈরি করা যায় সে ব্যবস্থা নিতে হবে। সেখানে পুরো ৬ মাসে উপযোগী সবজি ও শস্য উৎপাদনের কথা ভাবা যেতে পারে ১৯। হাওরাঞ্চলের প্রকৃত পরিবেশকে উপজীব্য করে সেখানে পর্যটন ব্যবস্থা করতে হবে ২০। ছাতক-সুনামগঞ্জ-মোহনগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ করতে হবে।
তবে আশার কথা বর্তমান সরকার হাওরাঞ্চল বিশেষ করে সুনামগঞ্জ জেলায় মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, টিটিসি, বিটাক, নার্সিং ইন্সিটিটিউট, সদর হাসপাতাল’কে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ, ৭৫০ মিটার দীর্ঘ যাদু কাটা ব্রীজ নির্মাণ, সর্বশেষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং দিরাই-শাল্লা-আজমিরীগঞ্জ আঞ্চলিক সড়ক একনেক এ অনুমোদন এর মাধ্যমে হাওরবাসী নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।
লেখক. অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক, সুনামগঞ্জ।