২০১৭ সনের পর দুর্বল বাঁধ ভেঙে এবারই আকষ্মিক ঢলে হাওরে পানি প্রবেশ করে সবচাইতে বেশি ফসলের ক্ষতি করেছে। নদীতে পানি কমতে থাকলেও এখনও বড় বড় হাওর তলিয়ে যাচ্ছে। সোমবার শাল্লার ছায়ার হাওর ডুবার পর মঙ্গলবার জামালগঞ্জের হালি হাওর ডুবেছে। এই দুই হাওর আকৃতির দিক থেকে বৃহৎ আকারের। এর আগে বড় হাওর হিসাবে পরিচিত চাপতি, চন্দ্রসোনার থাল, শালদিঘা, পুটিয়ার প্রভৃতি হাওর তলিয়েছে। এর বাইরে আরও বহু ছোট—মাঝারী হাওর ডুবেছে। হাওরের বাঁধ নিয়ে আন্দোলন—সংগ্রামকারী সংগঠন হাওর বাঁচাও আন্দোলন মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানিয়েছে, ৩১ টি হাওরের প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমির ধান বিনষ্ট হয়েছে চলমান আকষ্মিক ঢলের পানিতে। সরকারিভাবে এই ক্ষয়—ক্ষতির পরিমাণ অনেক কম দেখানো হচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যানে দুইভাবে ক্ষতির পরিমাণ কমানোর চেষ্টা করা হয়ে থাকে। এক হলো হাওর ডুবলে ক্ষতিগ্রস্ত জমিার পরিমাণ কমিয়ে দেখানোর প্রবণতা, আরেকটি হলোÑ ধান কাটার হিসাব অনেক বেশি করে দেখানো। হাওরের ফসল ডুবি নিয়ে সরকারি পরিসংখ্যানের সর্বশেষ তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে গত পরশু বা তার আগের দিন পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ হাজার হেক্টর জমির ধান নষ্ট হওয়ার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। আমরা জানি, এখন সরকারিভাবে যে তথ্য দেয়া হচ্ছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ কিংবা ধান কাটার হিসাব যেটিই হোক, আমরা বিশ^াস করি সেটি চূড়ান্ত নয়। সম্পূর্ণ ফসল কাটার পর নিশ্চয়ই সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিসংখ্যান তৈরি করবেন। হিসাব কমিয়ে দেখানোর মধ্যে তেমন কোনো কৃতিত্ব নেই। বরং এর মধ্য দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা নিজেদের বঞ্চিত ও সরকারি দপ্তর কর্তৃক তাদের অবজ্ঞা করা হচ্ছে বলে মনে করবেন। একটি রাজনৈতিক সরকারের অধীনে থাকা গণপ্রশাসন সর্বাবস্থায় জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণের জায়গায় একনিষ্ঠ থাকবেন বলেই অনুমান করা হয়। কিন্তু ক্ষতির পরিমাণ কেন কম দেখানো হয়ে থাকে? প্রশাসনের ভিতর এমন মনোভাব কাজ করে যে, ক্ষতি বেশি হলে তাদের জবাবদিহিতা বাড়বে। এটি এক ধরনের গণবিচ্ছিন্ন ভাবনা। প্রকৃত অর্থে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে ফসলের, তা সকলেই মোটামুটি জানেন। এটি স্বীকার করে নিলেই বরং তাদের জবাবদিহিতার জায়গাটি ভারসাম্যপূর্ণ হবে বলে আমরা মনে করি। নতুবা কম ক্ষতি দেখানোর দায়টিও এই ভুল পরিসংখ্যানদানকারীদের ঘাড়েই চাপবে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকার সামনে হয়তো বিভিন্নভাবে সহায়তা প্রদান করবেন। সরকারের দায়িত্বশীল মহল থেকে এরকম আশ^াস শোনা গেছে। এই সহায়তা পাওয়ার জন্য একটি সঠিক পরিসংখ্যান ও ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা সামনে থাকা দরকার। বেসরকারিভাবে যেখানে এ পর্যন্ত ২০ হাজার হেক্টর জমির ক্ষতির তথ্য সামনে আনা হচ্ছে সেখানে সরকার যদি সাড়ে পাঁচ হাজার হেক্টর অথবা এর ধারে কাছের কোন সংখ্যায় স্থির থাকেন তাহলে নিশ্চিতভাবেই বহু ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক তালিকার বাইরে থেকে যাবেন। এই ফসলহারানো কৃষকরা শুধু একটি দায়িত্বহীন পরিসংখ্যানের খড়গের নীচে পড়ে কাটা পড়বেন। এই ধরনের অবস্থা কাম্য নয়। সঠিক হিসাব বের করা কঠিন কোনো বিষয় নয়। এখন প্রতিটি ইউনিয়নে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা পদায়িত আছেন। তাদের মাধ্যমে একদম ব্যক্তিওয়ারী ক্ষয়—ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব। আমাদের আহ্বান থাকবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা ও ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ সম্বলিত একটি তালিকা প্রণয়নের কাজ এখন থেকেই শুরু করা হোক। তাহলে ফসল হারানোর অশেষ কষ্টের শিকার কৃষকরা অন্তত সরকারিভাবে যেটুকু সহায়তা দেয়া হবে তার ভাগীদার হতে পারবেন।
আর বাঁধ দুর্নীতির দায়ভার কেন অন্যরা নিজেদের ঘাড়ে নিতে যাবেন? ক্ষতি কমিয়ে দেখানোর অর্থ কৃষকরা মনে করেন ওই দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করার একটি কৌশল মাত্র।