বিশ্বজিত রায়
হাওরের কণ্ঠে আবারো উঠেছে রব। শোনা যাচ্ছে আকুলতা। গত মৌসুমে অসময়ের পানিতে পীড়িত হাওর নিজ প্রয়োজনীয়তায় প্রণতির সুরে জানিয়েছে কিছু লিখতে। আমি হাওর প্রতিবেশী হওয়ায় হাওরের উৎকণ্ঠিত ডাক আমায় বেশি আকৃষ্ট করে। শহুরে ইমারত ছেড়ে জন্মভিটা হাওর পাড়ের পল্লী এলাকা জামালগঞ্জ উপজেলার বেহেলী ইউনিয়নের রহিমাপুরে আসায় একেবারে কাছ থেকে শুনতে পাচ্ছি মুমূর্ষু হাওরের বিষাদময় গর্জন। পড়ন্ত বিকেলে বাড়ির পার্শ্ববর্তী হাওরতটে বসলে অনেকটা অনুমান করা যায় হাওরের বেদনাশ্রিত বাস্তবতা। হাওরের আটপৌড়ে বস্ত্রে মুড়ানো চাষী গোত্রের একজন অসহায় সদস্য হিসেবে আবারো হাওর নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। কলম কব্জির সাহসী মিতালীতে হাওরের দুঃখকথা বারবার তুলে ধরার চেষ্টা করেছি এবং আজও সেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
হাওর এখন আশ্বিনের প্রবীণ পানিতে ঢাকা। সেই আচ্ছাদিত পানির পললে একদিন কৃষকের স্বপ্ন বুনন হবে। কার্তিকের শেষ ভাগে শুরু হবে কৃষকের সংগ্রাম। চলছে প্রস্তুতি। চলছে কৃষিকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশে শান দেওয়ার কাজ। বীজতলা পরিচর্যায় নেমে পড়ার প্রতীক্ষায় হাওরের হাজারো কৃষক। পানি শুকানোর সাথে সাথে হাওরে কর্মব্যস্ততার ধুম পড়ে যাবে। অঙ্কুরিত ধান নাড়াচাড়া ও ধানের কচি গাছ উপড়ানো এবং লাগানোর প্রতিযোগিতায় নামবেন কৃষক। তার উর্বর হাতের নিপুণ শুশ্রƒষায় হাওরে ফিরবে প্রাণ। সবুজের গায়ে খেলা করবে আশা-ভরসার বিশালময়তা। কৃষাণী ঘরে বাজবে সমৃদ্ধির মাদল। সোনালী ফলন গোলায় তোলার মহোৎসবে ভাসবে কৃষক। কিন্তু নতুন ধানের বৈশাখী আয়োজন যদি দুর্নীতির দাবানলে ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে কি হবে?
হাওর নিয়ে কথা উঠলেই সামনে চলে আসে দুর্নীতির দূষিত জলে হাওর তলিয়ে যাওয়ার বিদঘুটে গল্প কিচ্ছা। তাই ভাবনার শঙ্কিত অঙ্গনে প্রশ্নের খোঁড়াখুড়ি। কৃষকের হাড়খাটুনি কষ্টে লালিত ধানের সোনালী প্রাপ্তি কি আবারো দুর্নীতির গ্রাসে বিলীন হয়ে যাবে। দুর্নীতিবাজ রাঘববোয়াল চুনোপুটিরা কি এবারো প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। সরকার কি পেরেছে ওই হাওর দুর্নীতির দুর্বৃত্তদের হাতে হাতকড়া লাগাতে। সংবাদ ভাষ্য তেমনটা বলছে না। সংবাদে প্রকাশ, ‘সুনামগঞ্জের হাওরে হাজার কোটি টাকার ফসলহানির ঘটনার পর দুটি মামলা হয়েছিল। ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগে প্রথম মামলাটি করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পরে জেলা আইনজীবী সমিতির দায়ের করা মামলা আদালতের নির্দেশে দুদকের মামলার সঙ্গে একীভূত করা হয়। মামলায় আসামি ১৩৯ জন। গত তিন মাসে গ্রেপ্তার হয়েছেন মাত্র ৩ জন। অভিযোগ উঠেছে, ১৩৯ আসামির মধ্যে ৩ জনকে ধরেই দুদক যেন দায়সারা। অন্য কোনো আসামি ধরার চেষ্টা নেই, মামলার তদন্তও চলছে ধীরগতিতে’ [সূত্র : প্রথম আলো, ০৪.১০.১৭]। হাওরবাসী এই খামখেয়ালিপনা দেখতে চায় না।
যাই হোক হাওর রক্ষা ও দুর্নীতি রোধে সরকারের প্রচেষ্টা কিছুটা ইতিবাচক বলে ধরে নেওয়া যায়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকারের প্রতিরোধমূলক অবস্থানে শহরের চাকচিক্য অট্টালিকায় বাস করা হাওর দুর্নীতিতে সম্পৃক্ত মহাজনরা কিছুটা অস্বস্তিতে থাকলেও হাওরের কূলঘেষা গ্রাম্য বাড়িতে বসবাস করা দুর্নীতির ছোটখাটো বাহাদুরেরা তাদের সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে বেশ আরাম-আয়েশেই সময় পার করছে। আরেকটি সুযোগের অপেক্ষায় পল্লীপথে হাঁটছে আর অনৈতিক বাহাদুরী প্রদর্শন করে চলেছে। এদের ব্যাপারে সরকার কঠোর হতে পারেনি। তাই আমার মতো অধম নিবন্ধকারকে বারবার এক দুর্নীতিবাজ ইউপি মেম্বারের রোষানলে পড়তে হচ্ছে। এখানে সেখানে বসে আমার নাম ধরে কটুক্তিপূর্ণ নানা ধরনের কথাবার্তা বলে যাচ্ছে। আমার অপরাধ তার দুর্নীতিবাজ চেহারা দেশ ও মানুষের সামনে পরিস্কার করে তুলে ধরা।
গত বছর চৈতের অসময়ের পানিতে যখন হাওর তলিয়ে যায় তখন আমি গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করছিলাম। বিশ-পঁচিশ দিন বাড়িতে থাকার সুবাদে অনেক বাস্তব পরিস্থিতির
সাক্ষী হতে পেরেছি। তখনকার সময়ে দেখা, শোনা, জানা ও বোঝা এবং সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসা হাওর দুর্নীতির তথ্য উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে লেখা আমার বেশ কয়েকটি নিবন্ধ জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। তার মধ্যে আমাদের সময়ে ‘হাওরকূলে হাহাকার : নিঃস্ব কৃষকের আকুতি’, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হাওরকূল থেকে বলছি’ ও ‘হাওর দুর্নীতির সাতকাহন’; ভোরের কাগজে ‘হাওর দুর্নীতিবাজদের বিচার জরুরী’; আলোকিত বাংলাদেশে ‘বিপর্যস্ত হাওরপারের জনজীবন’ ও অসন্তুষ্টির হাওরে তুষ্টির ছায়া’; জনকণ্ঠে ‘বিপর্যস্ত হাওড়ে স্বস্তির নিশ্বাস’; প্রতিদিনের সংবাদে ‘স্থানীয় দুর্নীতি ডুবিয়েছে কৃষকের স্বপ্ন’ ও হাওর দুর্নীতি এবং দুর্নীতি এবং স্থানীয় দৈনিক সিলেটের ডাকে ‘রাষ্ট্রপতির হাওর এলাকা পরিদর্শন ও কৃষকের স্বপ্ন’ শিরোনামে নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। সবগুলোতেই হাওর দুর্নীতির নানা বিষয় উঠে এসেছে।
২৫ এপ্রিল প্রতিদিনের সংবাদে প্রকাশিত ‘স্থানীয় দুর্নীতি ডুবিয়েছে কৃষকের স্বপ্ন’ শিরোনামের লেখাটিতে উদাহরণস্বরূপ বেহেলী ইউপি চেয়ারম্যান ও এক ইউপি মেম্বারের কথা উঠে এসেছে। আমি সম্পূর্ণ হাওর পারের বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। হাওর তলিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে ওই চেয়ারম্যান ও মেম্বার কৃষকের পাশে না দাঁড়িয়ে জনরোষের ভয়ে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র গা ঢাকা দিয়েছিল। তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় এক সাংবাদিক দুদকের কাছে অভিযোগও দায়ের করেন। সেই সত্যতার ভিত্তিতে লেখতে গিয়ে আজ আমি ওই দুর্নীতিবাজ ইউপি মেম্বারের নানা ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত, হুমকি, ধমকির শিকার হচ্ছি। তার সাজানো নাটকের ওপর ভিত্তি করে আমাদেরকে সামাজিকভাবেও হেয় করা হয়েছে। আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগছি সারাক্ষণ। কখন যে কি হয় তা বলা যাচ্ছে না। আমরা চাই অজোপাড়াগায়ের ফাঁকফোকরে লুকিয়ে থাকা ওই দুর্নীতিবাজদেরও বিচার হোক।
পত্রিকান্তরে হাওর নিয়ে বেশ কথাবার্তা হয়েছে। গণমাধ্যমে উঠে এসেছে হাওর দুর্নীতির আদ্যপান্ত। সম্প্রতি বাঁধ নির্মাণে ঠিকাদারি প্রথা বাতিল সংশ্লিষ্ট সংবাদও প্রকাশ হতে দেখলাম। সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘হাওরে এবার ঠিকাদারদের মাধ্যমে কোন হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ করানো হবে না। এমনকি গতবছর ঠিকাদাররা যেসব বাঁধের কাজ করেনি, সেগুলোও ঠিদাদারদের দিয়ে করা হবে না। সবই করা হবে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে। গত বুধবার (৪ অক্টোবর) পানি উন্নয়ন বোর্ডের সদর দপ্তরে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। জানা যায়, হাওর এলাকায় ফসল রক্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত, নদী / খাল পুনঃখননের জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড নতুন কাবিটা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি) নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। নীতিমালায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন এবং প্রকল্প কার্যক্রম তদারকিতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে।’ এতে বলা হয়, প্রকল্পে বরাদ্দের আদেশ ও অর্থ প্রাপ্তির পর জেলা কমিটির অনুমোদনের পর উপজেলা কমিটির পক্ষে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও শাখা কর্মকর্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির চেয়ারম্যান ও সদস্য সচিবের নামে যৌথ একাউন্টের অনুকূলে টাকা ছাড় করবেন। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পিআইসি গঠন ও ১৬ ডিসেম্বররে মধ্যে কাজ শুরু এবং ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ সমাপ্ত করতে হবে। হাওর এলাকায় ৩১ অক্টোবরের মধ্যে জেলা ও উপজেলা কমিটি গঠন করতে হবে।
যে উপায়েই হোক আমরা হাওর দুর্নীতির অবসান চাই। কৃষকের মুখে হাসি দেখতে চাই। দেশ গড়ার এই সস্তা কারিগরদের যেন আর ঠকানো না হয়। ঠিকাদারি প্রথা বাতিল সরকারি ঘোষণাটি দুঃখজনক হলেও হাওর রক্ষার স্বার্থে সরকারের সময়োপযোগী যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণযোগ্য। তবে ঠিকাদারি প্রথা বাতিল করে ‘শিয়ালের কাছে মুরগী বন্ধক’ অর্থাৎ কোনো অবস্থাতেই যেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মেম্বারদের হাতে হাওর রক্ষার ক্ষমতা তুলে দিয়ে এই গ্রাম্য প্রবাদের বাস্তবতা ফিরিয়ে আনা না হয়। কারণ পিআইসির অনুকূলে কি হয়েছে দেশবাসী তা দেখেছে। হাওরবাসী আর কোনো ধরনের অব্যবস্থাপনা দেখতে চায় না।
লেখক: কলামিস্ট