সারা জেলার বৃহৎ পরিমাণ ফসল হানির পর আজ যারা অনিয়ম দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন তাঁদেরকে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দিকে যেতে হবে। ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াজনিত কারণে যা মূলত আবেগপ্রসূত হয়ে থাকে, সেটিকে যুক্তিনির্ভর জায়গায় নিয়ে যেতে হবে এক্টিভিস্টদের। আবেগ ক্ষণস্থায়ী। আজ ফসলহারা কৃষকের দুঃখে প্রাণ আহাজারি করছে সত্য, কিন্তু এই আবেগ কিছু দিন পর মিলিয়ে যাবে। যে কাজগুলো দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর করার কথা ছিলো দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই দায়িত্ব আজ নিতে হয়েছে সাংবাদিক ও অরাজনৈতিক সমাজ নেতৃবৃন্দকে। দেশের কৃষক সংগঠনগুলো জেলার এই মহাসংকটে রহস্যজনক নিরবতা অবলম্বন করেছেন। গতকাল প্রকাশিত সংবাদের তথ্য মোতাবেক জামালগঞ্জ উপজেলার জনৈক ইউপি চেয়ারম্যানকে হাওর রক্ষার কাজে নিয়োজিত হওয়ার পরিবর্তে অঙ্গসংগঠনের কমিটি আনার তদবিরে লিপ্ত ছিলেন বলে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে জনৈক ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এই কারণে যে, এই দুর্যোগের সময়ে দক্ষিণ সুনামগঞ্জের কোন এক ইউপি চেয়ারম্যান নাকি নিজের প্রবাসী বোনকে বিদায় জানানোয় ব্যস্ত ছিলেন। বুঝাই যায় যারা যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনগণের ভোট নিয়েছিলেন তারা সেই কাজটি করছেন না। জেলার এতোবড় প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের মেয়াদ এক সপ্তাহ গত হতে চললেও সরকারি দল কোন মন্ত্রীকে দুর্যোগস্থল পরিদর্শন করাতে হয় ব্যর্থ হয়েছেন নতুবা এ বিষয়ে কোন তৎপরতা গ্রহণ করেন নি। জনগণের জন্য রাজনীতি করেন বলে যারা অহরহ আপ্তবাক্য ঝাড়েন তাদের অনেকেই যে নিতান্তই অন্তসারশূন্য কথামালার ওস্তাদ ব্যক্তি এই দুর্যোগকালে কৃষক জনসাধারণ সেটি ভালভাবেই টের পাচ্ছেন।
আজ কিছু ব্যক্তি সুনামগঞ্জের ফসলহারা কৃষকদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। স্থানীয় গণমাধ্যমসমূহ তাদের সীমিত সামর্থ্য দিয়ে ক্ষয়-ক্ষতি আর মানুষের কান্না-আহাজারির খবর যথাযথভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। দুর্ভাগ্য, দেশের জাতীয় মিডিয়ায় একটি জেলার স্মরণকালের ভয়াভহ এই ফসল হানির বিষয়টি মোটেই গুরুত্ব পায় নি। সবকিছু মিলিয়ে সামাজিকভাবে আজ আমরা একটি কালবেলা অতিক্রম করছি। এমন সময়ে যারাই কৃষক সমাজের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন তাঁরা নিশ্চিতভাবেই মানবিক মূল্যবোধ দ্বারা ভীষণভাবে প্রাণিত। এই প্রাণশক্তির কাছে আমাদের অনুরোধ, হাওর সমস্যার স্থায়ী সমাধান ও একই সাথে হাওর দুর্নীতির প্রকৃত স্বরূপটি আপনারা চিহ্নিত করুন। তুলে ধরুন সকলের সামনে।
সুনামগঞ্জ তথা ভাটি অঞ্চলের বোরো ফসলকে অকাল বৃষ্টিপাতজনিত ঢল ও বাঁধ দুর্নীতি থেকে রক্ষা করতে হলে সর্বাগ্রে নদী ও খাল খনন, পাউবোর বিলুপ্তি, কৃষকদের সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণ, অস্থায়ী বাঁধের পরিবর্তে স্থায়ী ব্যবস্থা যেমন- রাবারড্যাম, স্লুইসগেট, স্থায়ী বাঁধ; এমনসব বিষয় নিতে ভাবতে হবে। দরকার পড়বে হাওর বিশেষজ্ঞগণকে সম্পৃক্ত করা। হাওর রক্ষার একটি মডেল সুপারিশমালা প্রণয়ন করে সরকারকে চাপ দিতে হবে ওটি বাস্তবায়নের। এবার যারা দুর্নীতি করেছেন তাঁদের তালিকা জনসমক্ষে প্রচার করতে হবে যাতে করে মানুষ তার শত্রুদের চিনতে কখনও ভুল না করে।
সমাজে সর্বদাই অশুভ প্রবণতার বিরুদ্ধে সমান্তরালভাবে একটি শুভবোধের গতিও থাকে। কখনও দানবের মতো শক্তিশালী অশুভ’র দাপটে শুভশক্তি সাময়িক পিছনে পড়ে। কিন্তু শুভশক্তি নিজ অন্তর্গত আলোর দ্বারা সর্বদাই উদ্ভাসিত থাকে। বলাবাহুল্য সমাজে শুভবোধ দ্বারা তাড়িত ভাল মানুষের সংখ্যাই বেশি। এই ভাল মানুষগুলো যখন কোন উদ্যোগ নেন তখন পুরো সমাজটিই তাঁদের সাথে থাকে। তখন সমাজে তৈরি হয় সুদৃঢ় একতা। আজ যখন সুনামগঞ্জে এমন একটি শুভ শক্তির জাগৃতি ঘটতে চলেছে তখন তাঁদের অবশ্যই আবেগকে ধারণ করে যুক্তি ও স্থায়িত্বশীলতার দিকেই অগ্রসর হতে হবে।