বিশেষ প্রতিনিধি
হাওরে হাঁসের কদর বেড়েছে। খামারিরা এখন মাংসের হাঁসের (হাঁসা) খামারের দিকেও ঝুঁকছেন। এই বছর মাংসের হাঁসের দাম অন্য বছরের চেয়ে বেশি হওয়ায় খামারিদের এমন হাঁস পালনে আগ্রহও বেড়েছে।
সুনামগঞ্জ শহরতলির লালারচর গ্রামের সুকান্ত পাল একজন বড় হাঁসের খামারি। বছরে দুইবার হাঁসার বাচ্চা এনে বড় করে বিক্রয় করে পরিবারের আর্থিক কষ্ট দূর করেছেন তিনি। গত পাঁচ বছর হয় এই ব্যবসা তাঁর। দুই বছর হয় তারা চার ভাই এবং ষাটোর্ধ্ব বাবা সমর পালও হাঁসের খামারে কাজ করেই সময় কাটান বেশি।
সুকান্ত পাল বললেন, দিরাইয়ের দত্ত গ্রাম থেকে আশি^ন মাসের ২৫ তারিখে প্রতিটি ৩৬ টাকা করে ৬০০ হাঁসা বাচ্চা এনেছিলেন। পাঁচ মাস লালন পালন করেছেন, দুই দিন আগে (শনিবার) তাঁর হাঁস ৩০ হাজার টাকা করে প্রতিশ নিতে এসেছিল পাইকার। তিনি দেন নি, আশা করছেন প্রতিশ হাঁস এবার ৪০ হাজার টাকা করে বিক্রয় করতে পারবেন।
সুকান্ত জানালেন, হাঁসের বাচ্চা এনে প্রথম তিন দিন পানির সঙ্গে কেবল পরিমাণমত গ্লোকোজ মিশিয়ে খাইয়েছেন। সঙ্গে দিয়েছেন রেনা মাইসিন ভ্যাকসিন। এরপর ২০ গ্রাম করে বয়লার ফিড প্রত্যেক বাচ্চাকে ২০ দিন খাইয়েছেন। ২০ দিন পর মাস খানেক ধান সিদ্ধ করে খাইয়েছেন। একমাস পর বাচ্চাগুলো পাশের খালে ছেড়ে দিয়েছেন। তবে এখনও বাড়ীতে ধান খেতে দেন, তবে পরিমাণে কমিয়েছেন। আর এক মাস পরেই সকল হাঁস বিক্রি করে দেবেন। এরপর আবার ফাল্গুন মাসেই বাচ্চা এনে নতুন করে হাঁস হৃষ্টপুষ্ট করা শুরু করবেন।
আশার খবর কেবল সুকান্ত পালের হাঁসের খামারে নয়। জেলার অন্য খামারেও আছে। তাহিরপুর উপজেলার মধ্য তাহিরপুরের মো. এজাহারুন বললেন, তিনি এবার ১৭২০ টি ডিমের হাঁস পালন করেছেন। সপ্তাহে লাখ টাকারও বেশি ডিম বিক্রয় করছেন। এজাহারুন জানালেন, মাংসের হাসের দাম এবার বেশি পাচ্ছেন খামারিরা। প্রতিশ’ হাঁসা ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকায় বিক্রয় হচ্ছে। এ ধরণের হাঁস পাঁচ মাস লালন পালন করার পর বিক্রয় করতে হয়। তাতে ধৈর্য্য ধরে পরিশ্রম করা লাগে। ডিমের হাঁস কয়েকদিন লালন পালন করলেই ডিম পাড়া শুরু হয়। টাকা আসতে থাকে। এজন্য তিনি ডিমের হাঁস পালন করেন।
এজাহারুন জানালেন, গেল জুনের বন্যায় অনেক হাঁসের খামারি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছে। অনেকে নতুনভাবে বিনিয়োগ করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ বন্যার পর নতুনভাবে খামার করতে পারে নি। না হয় খামারির সংখ্যা আরও বেড়ে যেত।
জেলা প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তরের দায়িত্বশীলরা বললেন, সুনামগঞ্জে দুই ধরণের হাঁসের পালন হয়। এই দুই জাত হচ্ছে, খাকী ক্যাম্পবেল, যেটির উৎপত্তিস্থল ইংল্যান্ড। আরেকটি হচ্ছে জিনিডিং। এর উৎপত্তিস্থল চীন। এই দুই ধরণের হাঁসই প্রাপ্ত বয়স্ক হলে দুই থেকে আড়াই কেজি ওজনের হয়।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা প্রাণি সম্পদ অধিপ্তরের ভিএফএ মনোরঞ্জন দাস বললেন, সুনামগঞ্জের হাওরে পর্যটকদের আগমন অন্য যেকোন সময়ের চেয়ে এখন বেশি। হাওরে আসা পর্যটকদের খাবারের চাহিদার প্রথম পছন্দ হাঁসের মাংস। এজন্য হাঁসের কদর বেড়েছে। তার মতে হাওরের কিছু খাল ডোবা লিজ না দেওয়া না হলে হাঁসের খামার আরও বেড়ে যেত।
জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা. আসাদুজ্জামান বললেন, জেলায় ৪৭০০ হাঁসের খামারি হাঁসের খামার করেছেন। হাঁসের মাংসের কদর বাড়ায় এবছর অনেকেই কেবল মাংসের হাঁস পালন করেছেন। প্রাণি সম্পদ বিভাগ বিনামূল্যের ভ্যাকসিন দেওয়াসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিচ্ছে খামারিদের।