- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

হাতে তৈরি বেহালা বিক্রিই দুলাল মিয়ার ৪৫ বছরের পেশা

আসাদ মনি
কাঁধে দুই প্লাস্টিকের বড় ব্যাগ। পরনে পুরানো লুঙ্গি আর গেরুয়া রঙের পাঞ্জাবি। হাতে নিজের বানানো বাঁশের বেহালা। পাড়ায় পাড়ায় হাঁটছেন আর বেহালা বাজাচ্ছেন। পেছনে উৎসুক শিশুদের দল। যেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা।
এভাবেই দুলাল মিয়া নিজের তৈরি বাঁশের বেহালা নিয়ে ঘুরেন সুনামগঞ্জের গ্রাম-শহর প্রত্যন্ত জনপদেও। বিক্রি করে যা হয়, তাই দিয়েই কোনোরকমে চলে সংসার। ৪৫ বছর ধরে এভাবেই চলছেন তিনি।
দুলাল মিয়ার বাড়ি বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নের পাহাড়ের পাদদেশের বেতাগড়া গ্রামে। পরিবারে আছেন ৬ জন সদস্য। ২ ছেলে ২ মেয়ে। বড় সন্তানের নাম হামিদা খাতুন। ইতপেূর্বে বিয়ে দিয়েছেন তাকে। দ্বিতীয় সন্তানের নাম জহুর ইসলাম। সে শহরের একটি দোকানে কাপড় সেলাইয়ের কাজ করে। তৃতীয় সন্তান তহুরা বেগম। তাকেও বিয়ে দেওয়া হয়েছে। চতুর্থ সন্তান দীন ইসলাম। মাদ্রাসায় হাফিজিয়া বিভাগে পড়াশুনা করাচ্ছেন।
ছেলে- মেয়েদের স্কুলে পাঠান নি কেনো এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গরীব মানুষ আমরা। কোনো রকম চলি। ছেলে- মেয়েদের পড়াশুনা করাব কি করে? বাঁশ কিনি, কাটি। সেগুলোকে সবাই মিলে খেল না বানানোর জন্য উপযুক্ত করি, সকালে বের হই, রাতে ফিরি। মাঝে মাঝে ফিরতে পারি না। মানুষের বাড়িতে বলে কয়ে থাকি। মানুষের উপর মানুষের দয়া হয়। থাকতে দেয়। আবার সকালে চলে আসি।
তিনি বলেন, নিজে আয় করে সৎভাবে বাঁচবো। এই চেষ্টা করছি ৪০- ৪৫ বছর ধরে। এভাবে বেহালা বাজিয়ে ঘুরতে ভালোই লাগে। বাঁশ কিনে নিজের হাতে তৈরি করি বেহালা, চর কি ও অন্যান্য খেলনা। সেগুলো বিভিন্ন উপজেলার গ্রামে- গঞ্জে ঘুরে বিক্রি করি। বাঁশের তৈরি বেহালা ২০ টাকা ও চরকি ১০ টাকা দাম। বাচ্চারা সেগুলো আগ্রহের সঙ্গে কিনে। দিনে সর্বোচ্চ ৫ শ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। আবার কোনো কোনো শূন্য হাতে ফিরি।
জানালেন, তার বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন ৫ বছর আগে। সে সুখেই স্বামীর সংসার করছে। তৃতীয় সন্তান তহুরা বেগমের বিয়ে হয়েছে ১ বছর আগে। ১৬ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছে তার। দুলাল মিয়া জানালেন, শিশু বয়সে বিয়ে হলেও দক্ষ হাতে সংসার সামলাচ্ছেন তহুরা।
তিনি বলেন, দিন আনি দিন খাই। যত তারাতারি বিয়ে দেয়া যায় ভালো। কিছু হলে গরীবের মেয়ের কোনো দোষ না থাকলেও, সব দুর্নাম এসে পড়ে মেয়ের ঘাড়ে। মান সম্মান যাবে। তাই কম বয়সে বিয়ে দিয়েছি।
এই হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার বয়স এখন ৫৫ বছর। এই বয়সে বিশ্রাম নেয়ার কথা। কিন্তু প্রতিনিয়ত বেহালা বাজিয়ে ঘুরছেন। তবে ধীরে ধীরে শরীর রোগে কাবু করছে জানিয়ে দুলাল মিয়া বললেন, শরীর খারাপ হলে চিন্তায় পড়ে যাই, কীভাবে চিকিৎসা করবো, কীভাবে খেয়ে বেঁচে থাকবো।
দ্বিতীয় সন্তানের জহুর ইসলাম সামান্য বেতনে চাকুরি করে তার নিজের খরচই চালাতে পারে না জানিয়ে দুলাল মিয়া বললেন, ওরে একটা ভাল কিছু করাতে পারলে চিন্তুমুক্ত হতে পারতাম।
বাড়িতে থাকা ছোট ছেলের ১২ বছর বয়স হলেও তাকে বেহালাসহ বাঁশের খেলনা বানাতে সহায়তা করে।
বাঁশের খেলনার আগের মতো চাহিদা নেই জানালেন দুলাল মিয়া।
বললেন, এই পেশা ছাড়তেও পারিনা। খুব মায়া হয়। যতদিন নিঃশ্বাস আছে, এ পেশাতেই থাকব। খেলনা পেয়ে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মুখে যে হাসি দেখি, তাতেই সব কষ্ট দুর হয়ে যায় আমার।

  • [১]