- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

হাবীব কে যেভাবে দেখেছি

ইশতিয়াক রূপু
পীর হাবিব।দেশের একজন প্রথিতযশা সাংবাদিক। কর্মজীবনের শেষ দিনগুলি কাটিয়েছেন দেশের সর্বাধিক পাঠক প্রিয় খবরের কাগজ বাংলাদেশ প্রতিদিনের নির্বাহী সম্পাদক হিসাবে। ৪ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার সবাইকে অবাক করে কাউকে কাউকে নির্বাক করে চলে গেলো না ফেরার দেশে। দেশ স্বাধীনের পর পরই শহর ছেড়ে চলে গেলাম চট্টগ্রামে পড়াশুনা করতে। সুনামগঞ্জ আবার ফিরে আসি ৮০ দশকের প্রথম দিকে। পিতার ব্যবসার দায়িত্ব নিয়ে শুরু হলো জল জোৎস্নার শহরে সামাজিক বসবাস। হাবীবদের স্কুলের পড়াশুনা শেষ করে সবেমাত্র কলেজ কাল শুরু। পাড়ার টিম ছিলো ণঈঈ. ইয়ূথ ক্রিকেট ক্লাব। যার পরিচালক ও অধিনায়কের দায়িত্ব পালন সহ খেলার দিন লাঞ্চ করানোর আয়োজন যিনি করতেন তিনি আমাদের সবার প্রিয় প্রয়াত রানা ভাই। সেই ক্রিকেট দলে খেলতো পীর হাবীব। তখন থেকে যতক্ষণ মাঠে থাকতো সবাইকে নিয়ে খেলা আর মজা নিয়ে মেতে থাকতো হাবীব। পরে দল বদল করে নিয়মিত খেলা শুরু করলো ফ্যান্টম টিমে। যার পরিচালক ছিলো বন্ধু জাহানুর। বাকী সব বন্ধুরা খেলা পরিচালনার সহযোগী। তারপর বেশ কয়েক বছর দেখা নেই। শুনতাম ঢাকায় বাংলাবাজার পত্রিকায় হাবীব সাংবাদিক হিসাবে কর্মরত। ৯৩ সালে শহরের একটি মার্কেটে বাংলা বাজার পত্রিকার ব্যুরো অফিসে নিজে বসতো স্থানীয় বন্ধুদের নিয়ে। পরের বছর ৯৪ সালে আমি পড়ে গেলাম বিরাট অঙ্কের ঋণ জটিলতায়। যার কিছু অংশের মালিকানা ছিলো শহরের এক বড় ভাইর। সরাসরি বললে তিনি আমার এক পাওনাদার। স্বাভাবিক ভাবে যখন শুনলেন আমি বিরাট অঙ্কের ঋণের জালে আটকা পড়েছি। তিনি মনে মনে প্রমাদ গুনলেন। আমি যতটুকু পারি নিশ্চয়তা দিলাম টাকা ফেরত দেবার। দুঃখের বিষয় আমার দেয়া নিশ্চয়তায় তিনি নিশ্চিত হতে পারলেন না। সহায়তা চাইলেন শহরের একজন বড় ব্যাবসায়ীর। তিনি আবার আমার বন্ধু বটে। সেই কষ্ট আর অস্থির সময়ের এক দিনে আমি হাবীবের অফিসে বসা। বড় ভাইর পাওনা টাকা কিভাবে পরিশোধ হবে সে আলাপের এক পর্য়ায়ে পরিবেশ হঠাৎ করে বিনা নোটিশে বদলে গেলো। আমি নির্বাক হয়ে বন্ধুর কান্ড দেখছি। ঠিক সেই সময় হাবীব দাঁড়িয়ে গেলো বুক চিতিয়ে। ধমকের সুরে বললো। কথাবার্তার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আলাপ করতে বসেছি। বিষয় অন্য দিকে মোড় নিলে আমরা বসে থাকবো না। সবার জানা উচিত হাতে চুড়ি দিয়ে বসিনি। ব্যাস নিমিষে পরিবেশ এক মুহূর্তে বদলে গেলো। মুহূর্তে আলোচনার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে এলো।
ঠিক তিন বছর পর ৯৭ সালে লন্ডনে আবার দেখা হাবীবের সঙ্গে। শিল্পী সেলিম চৌধুরী ও অভিনয় শিল্পী তুহিন সহ বড় এক দল। ছুটির দিন দূরের বিলাতী গ্রাম ঘেষা শহর থেকে অভিবাসীর শহর পূর্ব লন্ডনের ব্রীক লেইনে আসি। দেখা হলে চলতো ঘন্টার পর ঘন্টা ম্যারাথন আড্ডা। একদিন শিল্পী সেলিম চৌধুরী সহ দল বেঁধে গেলাম ভাগিনা মুন্নার হোয়াইট হার্ট লেইনের বাসায়। ঢাকার নাট্য জগতের দুজন শিল্পীও ছিলো। হাসতে হাসতে সবার পেটে খিল ধরার অবস্থা। হাস্য রসে পরিপূর্ণ মজার মজার গল্প বলতে ওস্তাদ ছিলো প্রিয় হাবীব। মধ্য রাতে বাহানা ধরলো বারমিংহাম যাবে। নিজ বোনকে দেখবে বলে। লন্ডন থেকে দু’ঘন্টার ড্রাইভিং পরিমাণ দুরে সাসেক্স শহরে থাকেন শহরের আরেক প্রানবন্ত প্রবাসী মহী জামান। স্ত্রী সন্তান সম্ভবা। যে কোন সময় হাসপাতালের দারস্থ হতে হবে। সেই জরুরী সময়ে মহি তৈরী হয়ে যায় মধ্য রাতে হাবীব কে বার্মিংহাম বোনের বাড়ি পৌছে দিবে। সব শুনে হাবীব মহী কে ফিরিয়ে দেয়। ভালবাসার রূপ দেখে আবেগ আপ্লুত হয়ে হাবীব বলে, রুপু ভাই এমন ভালবাসা শুধু সুনামগঞ্জীদের মধ্যে পাবেন। রাতের মধ্য প্রহর শেষে রাতের শেষ প্রহর শুরু। আমরা দাঁড়িয়ে আছি লন্ডনের ভারতীয় রেঁস্তোরা পাড়া ব্রীকলেইনে। প্রতিবছর হাসন উৎসবের সফল আয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতো হাবীব। প্রয়াত মউজদীন ভাইর নির্বাচনে পাবলিক কে আবেগের সাগরে ভাসিয়ে বক্তব্য রাখতো কবিতার ভাষায় কখনো হাস্য রসে কখনো বা ইস্পাত দৃঢ় চিত্তের ভাষায়। ধীরে ধীরে দেশের সাংবাদিক জগতে ততদিন অনেক উঁচুতে নিজের স্থান করে নিয়েছে। ঈদের ছুটিতে সুনামগঞ্জ এলে খুঁজে বের করতো আড্ডা জমাতে। সেই হাসি আর আর জমিয়ে জমিয়ে গল্পে করে করে সময় কেটে যেতো।
কার বিয়েতে শহরের এক প্রিয় মুখ ৩৪ পিস রোষ্ট সাবাড় করে তিন বাটি মাংস গলাধকরণ করে নাকি বড় সাইজের রসগোল্লার দুই বাক্স খালি করছেন সময় নিয়ে। তেমন কত কত মজার মজার বিরামহীন গল্প। শুনতাম আর হাসতাম অবিরাম। আড্ডাতে মউজদীন ভাই ও ছিলেন নিয়মিত। হাবীবের সঙ্গে নিউইয়র্কে আবার দেখা ২০১৪ সালে। সুনামগঞ্জ সমিতির মেলায় প্রধান অতিথি। আয়োজন ব্যবস্থপনায় সবার সঙ্গে আমিও ছিলাম। আসা যাওয়ার পুরো সময় গল্প আর মজার চুটকি দিয়ে মাতিয়ে রাখলো বাসযাত্রী সবাইকে। রাতে আবার রওয়ানা আটলান্টিক শহরে কিবরিয়ার বাসায়।
ওর স্ত্রী আমাদের প্রিয় ডা. মুনীম পীর ভাইছাবের মেয়ে। ওর আত্মীয় হাবীব চাচার জন্য রাজকীয় আয়োজন। নিউইয়র্কে আড্ডার আয়োজন করলেন নবযুগ পত্রিকার সম্পাদক শেহাব উদ্দিন সাগর ভাই। নিউইয়র্কের বিশিষ্ট জনের উপস্থিতি ছিলো চোখে পড়ার মত। ২০১৬ তে আবার যোগ দিলো আমার গীতিকার জীবনের প্রথম প্রকাশ দেশের নামি দামী শিল্পীদের কন্ঠে ধারণ করা ৮ টি গান নিয়ে গানের ঈউ মায়ার স্বপন এর মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে। প্রধান অতিথির ভাষণে হাবীবের কৌতুকপূর্ণ ও রসাত্মক বক্তব্যে দর্শক শ্রোতা সবাই বিমোহিত। অনুষ্ঠানের মেজাজ ও দর্শক শ্রোতার মেজাজ আর আগ্রহ কোন ম্যাজিক গুণে জেনে যেতো। সেই সূত্র ধরে গল্প আর ভালবাসা মিশিয়ে বলতে পারতো সবার মনোযোগ কে তার দিকে স্থির রেখে। ২০১৮ তে দেশে ফিরে আসার ফ্লাইট ছিলো ভোর বেলা। সন্ধা কাটালাম সাংসদ মিসবার ন্যাম ভবনের এপ্যার্টমেন্টে। আমি যত তাড়া দেই। সে আরো গল্পের ডালি মেলে ধরে।রাতের খাবার পুরো সুনামগঞ্জি স্টাইলে ৩/৪ জাতের মাছের তরকারী শেষ করে। ঘন করা দুধ, চাঁপা কলা সঙ্গে মরচা গুড় দিয়ে খাওয়া শেষ করতে হলো। উঠবো উঠবো করছি। হাবীব বললো। আমিও যাবো আপনার সঙ্গে। পৌছে দেবো আপনাকে মহাখালি ডি ও এইচ এসে। গাড়িতে উঠে বলেÑচলেন আজ তো চলে যাবেন। স্যারের (প্রয়াত এক রাস্ট্রপতি) সঙ্গে দেখা করে যান।
জাহাঙ্গীর গেটে দুজনের পরিচয় পর্ব শেষে সি এম এইচের ৪র্থ তলার শেষ মাথায় স্পেশাল কেবিনে। পুরো বিল্ডিং জুড়ে বিশেষ নিরাপত্তা। চারদিকে চাপা উত্তেজনা। দেশে নির্বাচন সহ ক্ষমতার নিত্য নতুন খবরের ছড়াছড়ি। হাবীব কল করে ইশারায় কথা বলে। কল আসলে মন দিয়ে শুনে কোন উত্তর না দিয়ে। জিজ্ঞেস করলে মৃদু হেসে বলেÑ রুপু ভাই ক্ষমতা কেউই ছাড়তে চায় না। নাটক চলছে নাটক। ততক্ষণে আমরা দুজন কেবিনের ভিতর। পরিচয়ের সূচনাপর্বে হাবীব চিনিয়ে দিলো। জানতে চাইলেন সাংসদ হতে চাই কিনা। শর্ত দিলেন,আমেরিকা থেকে চলে আসতে হবে। শেষ কথাটি ছিলো এম পি হতে চাইলে বলো। আমি চলে গেলে অমুক আর কারো কথা শুনবে না। নিচু স্বরে হাবীব কথা বললো। মিনিট বিশেক। এর পরে আর বসলো না। কথা না বলে নেমে এলো নিচে। সি এম এইচ থেকে বের হয়ে বামে মোড় নিয়ে মহাখালী ডি ও এইচ এসে আমাকে নামিয়ে দিয়ে হাবীব ফিরে গেলো সহাস্যে নয় চিন্তিত চেহারা নিয়ে।
লেখক: প্রবাসী।

  • [১]