সোহানুর রহমান সোহান
হাওরের জেলা সুনামগঞ্জকে বলা হয় বোরো ফসলের ভান্ডার। জেলায় ছোট-বড় ১৪২ টি হাওর রয়েছে। এসব হাওরের প্রধান ফসল বোরো ধান। হাওরগুলি বোরো ফসলি হিসেবে পরিচিত হলেও সময়ের পরিক্রমায় হাওর থেকে হারিয়ে গেছে বোরো সহ দেশীয় জাতের অর্ধশতাধিক ধান। হাওর এখন হাইব্রিড ও উফসি জাতীয় ধানের দখলে। কৃষি বিভাগ বলছে- দেশী ধানের ফলন কম হওয়ায় হাইব্রিড চাষে ঝুঁকেছেন কৃষকরা। তবে হারিয়ে যাওয়া দেশি ধান কম ফলন থেকে উচ্চ ফলনশীল হিসেবে ফিরিয়ে আনতে গবেষণা চলছে বলে জানিয়েছে সুনামগঞ্জ পরমাণু কৃষি গবেষণা কেন্দ্র।
বোরো, রাতা, টেপি, বিরুই, লালডিংগি, নাজিরশাইল সহ একসময় অর্ধশতাধিক দেশি প্রজাতির ধান চাষ হতো হাওরের জেলা সুনামগঞ্জে। কালের বিবর্তন ও আধুনিক কৃষির পরিবর্তনে হাওর থেকে হারিয়ে গেছে এসব দেশি প্রজাতির ধান। এসব ধানের চাল খেতে অত্যন্ত সুগন্ধি, সুস্বাদু ও পুষ্টিসমৃদ্ধ ছিল। গাছ অধিক উচ্চতার হওয়ায় বন্যার পানিতে তলিয়ে যেতো না। খুব একটা সারের প্রয়োজনও হতো না। ধান নষ্ট হওয়ার শঙ্কাও থাকতো কম। তবে দেশি ধানে ফলন কম হওয়ায় নানান গুণাগুণ সমৃদ্ধ এসব ধান আর চাষ করছেন না কৃষকরা। অধিক ফলন হওয়ায় হাওর এখন ছেয়ে গেছে হাইব্রিড জাতীয় ধানে। চাইলেও বীজের অভাবে এখন দেশি ধান চাষাবাদ করা সম্ভব নয় বলে জানান কৃষকরা।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মাইজবাড়ি গ্রামের কৃষক ইব্রাহিম আলী বলেন, রাতা, টেপি, লাইডিঙ্গি সহ নানা প্রজাতির দেশি ধান ছিল আমাদের হাওরে। এসব ধান এখন আর কেউ খুঁজেও পাবেন না। চাষ না করতে করতে ধানের নামই ভুলে গেছি।
একই গ্রামের কৃষক আলতাব মিয়া বলেন, দেশি ধানের স্বাদ ও ঘ্রাণ ছিল অন্যরকম। পছন্দের তালিকায় থাকায় খুঁজে খুজে এসে এসব ধান নিত মানুষ। কিন্তু ফলন কম হওয়ায় আর কেউ চাষ কওে না। এখন চাইলেও সম্ভব না, বীজই খুজে পাওয়া যাবে না।
দেখার হাওর পাড়ের মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের কৃষক শ সের আলী বলেন, আগের ধান ফলানো সহজ ছিল। কোনো সার, ঔষধ লাগতো না। যার কারণে স্বাদে ভালো ছিলো। এখন হাওর হাইব্রিডে ভরে গেছে। সার, ঔষধ ছাড়া এসব ধান ফলানো সম্ভব হয় না।
লালপুর গ্রামের আব্দুল আলীম বলেন, বিদেশি ধান আসায় আমাদের দেশি ধান নাই হয়ে গেছে। আমরা যে ধান দেখেছি, খেয়েছি তা আমাদের ছেলেমেয়েরা দেখতে পারছে না। যদি ফলন বাড়িয়ে নতুন জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে আগের ধান ফিরিয়ে আনা যেত, সবাই আবারও চাষ করতাম।
বাংলাদেশ কৃষি পরমানু গবেষণা কেন্দ্র সুনামগঞ্জের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান মানিক বলেন, একসময় দেশে খাদ্য ঘাটতি থাকায় সবাইকে হাইব্রিড জাতের উচ্চ ফলনশীল ধান চাষে উৎসাহ দেয়া হতো। হাইব্রিড চাষ করে বেশি উৎপাদন পাওয়ায় এখন খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশ বাংলাদেশ। আবার সেই কম ফলনশীল ধান চাষ করলে দেশ খাদ্য ঝুঁকিতে পড়ে যাবে। তবে পুনরায় কোয়ালিটি সমৃদ্ধ দেশি ধান উচ্চ ফলনশীল জাতে ফিরিয়ে আনার জন্য গবেষণা চলছে। একই সাথে পুরনো সব জাতের ধান সংরক্ষিত অবস্থায় আছে।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বলেন,‘ চলতি বোরো মৌসুমে আবহওয়া অনুকূলে থাকায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি বোরো চাষাবাদ হয়েছে। দিন দিন উফসী ও হাইব্রিড চাষাবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যারা সুগন্ধি চাল খেতে আগ্রহী তারা কিছু কিছু স্থানীয় জাতের ধান চাষ করছেন। ফলন কম হওয়ায় এসব জাতের ধানের চাষ কমে যাচ্ছে। ফলন বেশি পাওয়ায় আশায় চাষীরা নতুন নতুন জাতের চাষাবাদ করছেন। তবে যদি কোন কৃষক স্থানীয় জাতের ধান চাষ করতে আগ্রহী হন, আমরা বীজ সংগ্রহে সার্বিক সহযাগিতা করব।’
সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলায় এ বছর বোরো মৌসুমে দুই লাখ ২২ হাজার ৭৯৫ হেক্টর জমি চাষাবাদ হয়েছে। যা লক্ষমাত্রার চেয়ে ৪৯৫ হেক্টর বেশি। ধানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩ লাখ ৫৩ হাজার মে. টন। যার বাজার মূল্য ৩৮০০ কোটি টাকা।