সিলেট অফিস
‘গাব্বার ইজ ব্যাক’ হিন্দি সিনেমায় নায়ক অক্ষয় একজন মৃত মানুষকে ভর্তি করে হাসপাতালে চিকিৎসার নামে অমানবিক বাণিজ্য উন্মোচন করেছিলেন। এ সিনেমার মতো না হলেও অনেকটা মিলে যায় সিলেটে ছয় ঘন্টা বয়সী এক নবজাতকের ৩৭ ঘন্টা চিকিৎসা ও পরবর্তীতে লাশ আটকে রেখে চিকিৎসা ব্যয় পরিশোধ করার ঘটনা। সুনামগঞ্জ শহরের আলীপাড়ার বাসিন্দা সাব্বির হোসেন চৌধুরী ও শেফালী বেগম দম্পতির প্রথম সন্তান ছিল ওই নবজাতক (কন্যা)।
সুনামগঞ্জ শহরের একটি কিøনিকে সোমবার রাত ১২টায় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া নবজাতকের মাথার একদিক বাঁকানো ও বড় ছিল। জন্মগত এ ত্রুটির চিকিৎসার জন্য ক্লিনিক থেকে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির জন্য পাঠানো হয়।
নবজাতকের পরিবারের সদস্যরা জানান, মঙ্গলবার ভোর ছয়টার সময় তাঁরা অ্যাম্বুলেন্সযোগে সিলেট পৌঁছেন। এ সময় সরকারি হাসপাতালে কাউকে পাওয়া যাবে কি না-এ নিয়ে সংশয় ছিল তাঁদের। ওসমানী হাসপাতালে যাওয়ার পথে পড়েছে আল-রাইয়ান হাসপাতাল। সেখানে নবজাতকের চিকিৎসার বিষয়ে পরামর্শ নিতে গেলে দ্রুত তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করার কথা বলেন। তাৎক্ষণিক চিকিৎসায় নবজাতককে বাঁচানো সম্ভব বলে আস্বস্ত করায় তাঁরা সেখানেই ভর্তি করেন।
সাব্বির হোসেন চৌধুরী জানান, ভর্তির পর ‘পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে’ জানিয়ে তাঁদেরকে অপেক্ষায় থাকতে বলা হয়। সারা দিন অপেক্ষায় থেকে তাঁরা মঙ্গলবার রাতে আবার জানতে চাইলে তখন বলা হয়, ‘আইসিইউতে রাখা হয়েছে, উন্নতি না হলে পরবর্তী চিকিৎসাও করা যাবে না।’ পরে তাঁরা হাসপাতালের পাশের একটি আবাসিক হোটেলকক্ষ ভাড়া নিয়ে অপেক্ষায় থাকেন। এভাবে ৩৭ ঘন্টা পার হলে পরে তাঁদেরকে ডেকে এনে হাতে ৪০ হাজার ২০৬ টাকার চিকিৎসা বিল ধরিয়ে দিয়ে বলা হয়,‘টাকাটা দিয়ে বাচ্চার লাশ নিয়ে যান’!
সাব্বির বলেন, হাসপাতালের বিলে তিনজন শিশুবিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বাচ্চার চিকিৎসা দিয়েছেন উল্লেখ দেখে তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে চাই। কী কী ওষুধ লেগেছে সেগুলো সম্পর্কেও জানতে চাই। এক পর্যায়ে হাসপাতালের ম্যানেজার নবজাতকের লাশ আটকে রাখেন। প্রায় দুই ঘন্টা পর বুধবার রাত নয়টার দিকে বিলের পুরো টাকা পরিশোধ করে শেষে লাশ নিয়ে ফিরি।
অস্বাভাবিক চিকিৎসা ব্যয় দেখে বুধবার রাতে ওই হাসপাতালে গিয়েছিলেন সাব্বিরের এক বন্ধু সিলেট নগরের লেকসিটি আবাসিক এলাকার বাসিন্দা নিয়ামুল ইসলাম খান। জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মানো এক নবজাতককে এক নাগাড়ে ৩৭ ঘন্টা চিকিৎসা, পরে মোটা অংকের বিল পরিশোধ করে লাশ হস্তান্তরের বিষয়টি অমানবিক উল্লেখ করে তিনি বলেন,‘ঘটনাটি আসলে মৃত্যু পথযাত্রী নবজাতকের চিকিৎসার নামে টাইম পাস করে টাকা কামানো বলে মনে হয়েছে। অনেকটা ভারতীয় সিনেমা গাব্বার ইজ ব্যাক-এ কাহিনির মতো।’
আল-রাইয়ান হাসপাতাল সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সড়কের এক পাশে অবস্থিত। নবজাতকের পরিবারকে দেওয়া হাসপাতালের বিল-ভাউচারে উল্লেখ রয়েছে ‘ভর্তির রেজিস্ট্রেশন ফি’ ৫০০ টাকা। ‘কেবিন’ ভাড়া ৬ হাজার ৪০০ টাকা। ‘মেডিসিন’ ৪ হাজার ৩৯৮ টাকা। ‘অক্সিজেন’ ৫ হাজার ৫৫০ টাকা। ‘মনিটর’ ৩ হাজার ৭০০ টাকা। ‘ডক্টর ভিজিট’ ৩ হাজার ১০০ টাকা। ‘সার্ভিস চার্জ’ ৯ হাজার ২৭৮ টাকা। এ ছাড়া আরও পাঁচটি খাতের ব্যয় মিলিয়ে মোট ৪০ হাজার ২০৬ টাকা।
বৃহস্পতিবার দুপুরে হাসপাতালে গেলে চিকিৎসা ব্যয় বিবরণী দেখে নবজাতকের চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন হাসপাতালের ব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান। তবে ভর্তির আগে নবজাতককে সুস্থ্য করে তোলার নিশ্চয়তা ও লাশ আটকে রেখে টাকা আদায়ের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন। অস্বাভাবিক চিকিৎসা ব্যয় প্রসঙ্গে তিনি হাসপাতালের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
যোগাযোগ করলে হাসপাতালের চেয়ারম্যান নজরুল হোসাইন বলেন,‘এখানে সব কিছুই তুলনামূলক কম ধরা হয়েছে।’ এরমধ্যে তাঁর কাছে সুনির্দ্দিষ্ট করে ‘সার্ভিস চার্জ’ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একটা বাচ্চার পেছনে আয়া, নার্স, চিকিৎসক থেকে শুরু করে হাসপাতালের সব দপ্তরের লোকবল খাটতে হয়। এটা টোটাল হিসেবে রাখা হয়েছে।’ তাহলে খাতওয়ারি আরও আনুষাঙ্গিক ব্যয় কেনÑ এমন প্রশ্নে তিনি ‘আমরা সব কিছু কম রাখছি, যাছাই করে দেখুন’ বলে এড়িয়ে যান।