- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

‘হিন্দুদের ভেতর কম্পন তুলে গেলাম’

বিশেষ প্রতিনিধি
শাল্লার নোয়াগাঁওয়ে হামলা করে ফেরার সময় কেউ কেউ নিজেরাই ফেসবুকে লাইভ করতে করতে ফিরেছে। পারভেজ আহমদ চৌধুরী নামের, একটি ফেসবুক আইডি থেকে কিছু ভিডিও আপলোড করা হয়েছে। এই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে কিছু অস্ত্রধারী হাটতে হাটতে বলছে, ‘মামনুল হক সাহেবের বিরুদ্ধে কটুক্তি করার কারণে হিন্দুস্তানের যারা যারা আছে, তাদের ধরার জন্য আমরা একত্রিত হয়েছি। আশপাশের গ্রামের মানুষ একত্রিত হইয়া আমরা হামলা করতে আইছি। ঝুমনকে এসে আমরা পাইনি। পুলিশ আগেই তারে গ্রেপ্তার করছে। মামুনুল হক যে কী জিনিষ তারা বুঝেনি। হিন্দুদের ভেতর আজ থেকে কম্পন তুলে দিয়ে গেলাম। বুঝিয়ে দিলাম মামুনুল হকের বিরুদ্ধে কিছু বললে, ডাইরেক্ট এ্যাকশন। লাইভেই একজন আরেকজনকে বলছিল, মামুনুল হক সাহেবের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললে কী করতে পারেন। উত্তরে আরেকজন বলছিল জীবন দিতে পারি।’ এই হামলাকারীদের ভিডিও ফুটেজ ফেসবুকে ভাইরাল হলেও এদের অনেকে গ্রেপ্তার হয় নি।
হামলার সময় স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীরা দলের নীতি আদর্শের কথাও ভুলে গিয়েছিল। স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগ-বিএনপি, জামায়াত, হেফাজত’এর কর্মী এক হয়ে মামুনুল হকের সমর্থক হামলাকারী বনেছিলেন।
নোয়াগাঁওয়ের পাশের গ্রাম কাশিপুর। এই গ্রামের বাসিন্দা শাল্লা উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অলিউল হক। তাঁর বাড়ির মক্তবের হুজুর রিয়াজুল ইসলামও মাইক থেকে সকলকে সমবেত হবার আহ্বান জানিয়েছেন। এই হুজুরও এখন এলাকায় নেই। তাঁর বাড়ি দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের বরোত্তর গ্রামে।
শাল্লা উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অলিউল হককে রিয়াজুল ইসলাম কোথায় জানতে চাইলে বলেন, আমি ওকে বিদায় করে দিয়েছি। পুলিশে দিলেন না কেন প্রশ্ন করলে, আমি বয়স্ক মানুষ এতোটা বুঝতে পারি নি।
হবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা বিবেকানন্দ মজুমদার বকুল বললেন, আমি আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী। হামলার ঘটনার সময় যে দুয়েকজন বাড়িতে ছিলেন এবং বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ এবং ছবিতে যাদের হামলা করতে দেখা গেছে, তাদের নামই আসামীর তালিকায় দিয়েছি।
প্রধান আসামী যুবলীগের স্বাধীনসহ গ্রেপ্তার ৩০
মাওলানা মামুনুল হকের অনুসারীদের হামলার ঘটনায় শনিবার সকাল পর্যন্ত ৩০ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলায় ৫০ জনের নামোল্লেখ করা মামলার প্রধান আসামী শহীদুল ইসলাম স্বাধীনসহ এজাহারভুক্ত ৩ আসামী রয়েছে গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে। শুক্রবার গভীর রাতে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া থেকে শহীদুল ইসলাম স্বাধীনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পিবিআইয়ের সিলেটের পুলিশ সুপার খালেদ উজ জ্জ জানিয়েছেন, স্বাধীনকে সুনামগঞ্জ পুলিশের কাছে তুলে দিয়েছেন তাঁরা।
সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান জানান, স্বাধীনকে নিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্তের কাজ করছেন।
গ্রেপ্তারকৃত স্বাধীন দিরাই উপজেলার সরমঙ্গল ইউনিয়ন যুবলীগের নেতা। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগে যোগদান করে স্বাধীন। এর আগে বিএনপি করতো সে। যোগদান করে ২ বছর পর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়েছিল সে। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের নতুন আহ্বায়ক কমিটিতে রাখা হয় নি তাকে। পরে যুবলীগের ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি হয় সে। যুবলীগের ইউনিয়ন কমিটির সভাপতি দুলাল আহমদ দাবি করেছেন, স্বাধীনের কমটি কিছুদিন আগে ভেঙে আহ্বায়ক কমিটি করা হয়েছে। বর্তমান কমিটিতে সে নেই।
শনিবার দুপুরে সুনামগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স মিলনায়তনে জেলা যুবলীগের সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়েছে, স্বাধীন যুবলীগের কেউ নয়। সংবাদ সম্মেলনে জেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক খন্দোকার মঞ্জুর আহমদ, সদস্য নুরুল ইসলাম বজলু, সবুজ কান্তি দাস ও সীতেশ তালুকদার মঞ্জু।
অন্যদিকে, শনিবার সকালে দিরাই থানা পুলিশ ২ এবং শাল্লা থানা পুলিশ ঘটনায় জড়িত ৫ জনকে আটক করেছে। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে আটক ২২ জনকে শুক্রবার সন্ধ্যায় জেল হাজতে পাঠিয়েছেন আদালত।
এদিকে, হামলার সাথে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে শনিবারও জেলা শহরে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছে বিভিন্ন সংগঠন। শনিবার দুপুরে ছাত্রলীগের উদ্যোগে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি দীপংকর কান্তি দে’র নেতৃত্বে শহরে বিক্ষোভ মিছিল এবং আলফাত স্কয়ারে সমাবেশ হয়েছে। ঘটনার প্রতিবাদে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)’এর উদ্যোগে মানববন্ধন করা হয়েছে। একই সময়ে জেলা প্রশাসনের আহ্বানে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আলেম ওলামাদের নিয়ে সভা করেন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার।
জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন। বক্তব্য দেন পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান, সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামীমা আক্তার খানম, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমন, মাওলানা আব্দুল বাছির, অধ্যক্ষ মাওলানা আলী নূর, মাওলানা বদরুল আলম প্রমূখ।
সভায় আলেম ওলামারা দাবি করেন শাল্লার ঘটনায় আলেম ওলামাগণ দায়ী নয়। দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। এ ধরণের কাজ ইসলাম সমর্থন করে না।
প্রশাসন ও রাজনীতিবিদদের পক্ষ থেকে এই পরিস্থিতিতে আজ রবিবার জামালগঞ্জে মাওলানা মামুনুল হকের সমাবেশ স্থগিত রাখার আহ্বান জানানো হয়।
প্রসঙ্গত. জাতিরজনক শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য বিরোধী আন্দোলনের নেতা মাওলানা মামুনুল হকের সমর্থকরা বুধবার হামলা, লুটপাট ও ভাংচুর করেছে নোয়াগাঁও গ্রামের ৮৮ বাড়িতে। এসময় গ্রামের ৫ টি মন্দির ভাংচুর করা হয়। নোয়াগাঁও গ্রামের ঝুমন দাস আপন নামের এক তরুণের ফেসবুক আইডি থেকে মাওলানা মামনুল হককে কটাক্ষ করে কথিত স্ট্যাটাসের প্রতিক্রিয়ায় বুধবার সকাল ৮ টা থেকে ১০ টার মধ্যে এই তা-ব চালানো হয়।
গত সোমবার সুনামগঞ্জের দিরাই স্টেডিয়ামে হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক বক্তব্য দেন। এসময় ধর্মীয় উস্কানীমূলক বক্তব্য দিয়েছিলেন মামুনুল হকসহ হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতারা।

  • [১]