- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

হিন্দু বিধবার সম্পত্তি নামজারী ও জমা খরিজে হয়রানি

স্বপন কুমার দাস রায়
শাস্ত্রীয় হিন্দু আইন অনুযায়ী হিন্দু বিধবাদের স্বামীর ত্যাজ্য সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারীত্ব অর্জনের সুম্পষ্ট বিধান ছিল না। স্বামীর মৃত্যুর পর একজন হিন্দু বিধবা কার্যত নি:স্ব হয়ে যেতেন। তার সন্তান অথবা স্বামীর কোন নিকট উত্তরাধিকারীর (Next heir) করুনার পাত্রী হিসেবে বাকী জীবন যাপন করতে হতো।
বৃটিশ ভারতে The Hindu Women’s Right To Property Act, 1937  কার্যকর হওয়ায় এ অবস্থার সমাপ্তি ঘটে। ঐ আইনের ধারা-৩ অনুযায়ী একজন হিন্দু বিধবা তার স্বামীর মৃত্যুর পর স্বামীর ত্যাজ্য সম্পত্তিতে একপুত্রের সমান অংশ পাওয়ার অধিকারী হন। স্বামী অপুত্রক হলে বিধবা স্বামীর ত্যজ্য সাকুল্য সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী হন। একজন হিন্দু বিধবা কোন প্রকার বাধা বিঘœ ব্যতিরেকে স্বাধীন এবং নিরংকুশভাবে তার জীবদ্দশায় অথবা পুন:বিবাহ না হওয়া পর্যন্ত তার মৃত স্বামীর ত্যজ্য সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী হিসেবে ভোগদখলের অধিকারী। বিধবার জীবদ্দশায় মৃত স্বামীর কোন ভাবী উত্তরাধীকারী ( Reversioner) বিধবার সম্পত্তিতে কোন প্রকার স্বত্ব ও দখলের দাবী করতে পারেন না। একজন হিন্দু বিধবা তার আইনগত প্রয়োজনে (On Legal Necessity) প্রাপ্ত সম্পত্তি অন্যত্র বিক্রয় করতে পারেন এবং বন্ধকাবদ্ধ রাখতে পারেন। আইন অনুযায়ী একজন হিন্দু বিধবা তার সম্পত্তি হতে উপর্জিত অর্থ বা সঞ্চিত অর্থ তার ইচ্ছা অনুসারে পূর্ন মালিকের ন্যয় ব্যয় করতে পারেন। তিনি ধর্মীয় অথবা দাতব্য উদ্দেশ্যে সম্পত্তি দান করার অধিকারী। এজমালী সম্পত্তির ক্ষেত্রে তার মৃত স্বামীর অন্যান্য শরীকদের সাথে একজন হিন্দু বিধবা বন্টন দলিল (Partition Deed)   সম্পাদন ও রেজিষ্ট্রি করতে পারেন এবং প্রয়োজনে উপযুক্ত আদালতে বন্টনের মোকদ্দমা (Partition Suit)  দায়ের ক্রমে ডিক্রি লাভের অধিকারী হন। মৃত স্বামীর একজন উত্তরাধিকারী হিসেবে একজন বিধবা আদালতে অগ্রক্রয় মামলা ( Preemption case ) দায়েরের মাধ্যমে সম্পত্তি অর্জন করতে পারেন। মৃত স্বামীর ত্যাজ্য সম্পত্তিতে হিন্দু বিধবার উত্তরাধিকারীত্বের প্রসংগে মহামান্য সুপ্রীম কোর্ট এ মর্মে সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন যে, A Hindu window during her life time, is the owner of any Property  বাংলাদেশে প্রচলিত হিন্দু উত্তরাধিকারী আইন অনুসারে মৃত স্বামীর উত্তরাধিকারী হিসাবে একজন হিন্দু বিধবা তার স্বামীর ত্যাজ্য সম্পত্তিতে মালিক বটে। এ ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারী সুত্রে অন্যান্য উত্তরাধিকারীর ন্যায় একজন হিন্দু বিধবা সকল আইনানুগ সুবিধা লাভের অধিকার হন। হিন্দু বিধবাদের সম্পত্তি রক্ষনাবেক্ষন, সরকারী খাজনা পরিশোধ ও হস্তান্তরের প্রয়োজনে নামজারী ও জমাখারিজ করার আবশ্যকীয়তা রয়েছে। সম্প্রতি হিন্দু বিধবাগন নিজেদের নামে সম্পত্তি নামজারী ও জমাখারিজ করার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার সন্মুখীন হচ্ছেন। পেশাগত প্রয়োজনে এতদবিষয়ে ভুক্তভোগী অনেক বিধবার সাথে আলাপ করার সুযোগ হয়েছে। কিছু সংখ্যক ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশীলদার) এবং নামজারীর দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার (ভূমি) মহোদয়/মহোদয়া এ মর্মে স্পষ্টত জানিয়ে দেন যে, হিন্দু বিধবা তার স্বামীর ত্যাজ্য সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী নহেন। তারা বিধবার নামে সম্পত্তি নামজারী ও জমা খারিজে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। তদুপরি বিধবাদের জীবন স্বত্ব (Life interest) সংক্রান্ত বষয়টির ভুল ব্যাখ্যা ক্রমে তাদের কে নামজারীর অধিকারী হতে বঞ্চিত করার প্রয়াস নেন। অনুসন্ধানে জানা যায় কোন কোন তহশীলদার ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিন্দু উত্তরাধিকারী আইন সম্পর্কে অজ্ঞতার কারনে এরূপ উক্তি করেন। আবার কোন কোন তহশীলদার ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) সবকিছু জেনেও উৎকোচ গ্রহনের অসৎ উদ্দেশ্যে উক্তানুরূপ বেআইনী মন্তব্য ও কর্মকান্ডের মাধ্যমে বৈধ অধিকার থেকে হিন্দু বিধবাদেরকে বঞ্চিত করেন।
২০০৫ খৃষ্টাব্দের ৬ই এপ্রিল তারিখের এস আরও নং ৮২ এ্যাক্ট দ্বারা রেজিষ্ট্রেশন রুলস এর রুল ২০(এইচ) সংশোধনের মাধ্যমে কতিপয় উপ-বিধি সংযোজন করা হয়েছে। সংযোজিত উপবিধি অনুযায়ী কোন দলিল নিবন্ধনের সময় দলিল দাতা স্বয়ং অথবা উত্তরাধিকারী সূত্রে মালিক না হলে সম্পাদিত দলিলের সাথে তার নামে প্রস্তুতকৃত সর্বশেষ খতিয়ান দাখিলের বিধান করা হয়েছে। দলিল দাতা হিন্দু বিধবা হলে তিন উত্তরাধিকারী সূত্রে মালিক বিধায় তার নামে সর্বশেষ খতিয়ান না থাকলেও রেজিষ্ট্রেশন অফিসার ইচ্ছা করলে দলিল রেজিষ্ট্রী করতে পারেন। কিন্তু খরিদ্দার/দলিলগ্রহীতার অভিপ্রায় অনুযায়ী দাতার নামে নামজারী খতিয়ান প্রস্তুত করতে হয়। তদুপরি খাজনা পরিশোধের প্রয়োজনে সর্বদাই ভূমির মালিকের নামে পুথক খতিয়ান প্রস্তুতের আবশ্যকীয়তা রয়েছে। THE STATE ACQUISITION AND TENANCY ACT-1950 এর ধারা ১১৭(১)(সি) অনুযায়ী খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে সংশ্লিষ্ট রাজস্ব অফিসার [বর্তমানে সহকারী কমিশনার(ভূমি)] নামজারী ও জমা খারিজের আদেশ প্রদান করেন। ঐ ধারা অনুযায়ী উত্তরাধিকারী সূত্রে অথবা হন্তান্তর সূত্রে সহ-শরীক (Co-sharer Tenants by inheritance or by Transfer) যৌথ খতিয়ান ভুক্ত সম্পত্তি অথবা তার পূর্বাধিকারীর নামীয় খতিয়ান ভুক্ত সম্পত্তি নিজ নামে পৃথক খতিয়ানে জমা খারিজ করার অধিকারী হন। তা বিধিবদ্ধ আইন দ্বারা স্বীকৃত অধিকার। হিন্দু বিধবা তার স্বামীর ত্যাজ্য সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী সুত্রে মালিক। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহন ও প্রজস্বত্ব আইন ১৯৫০ এর ১১৭(১)(সি) ধারা অনুসারে সংশ্লিষ্ট বিধবা তার স্বামীর ত্যাজ্য সম্পত্তি নিজ স্বত্বাংশ অনুসারে নিজ নামে পৃথক খতিয়ানে জমা খারিজ করার অধিকারী। হিন্দু বিধবার এ অধিকার মহামন্য সুপ্রীম কোর্টের বিভিন্ন মামলার সিদ্ধান্ত অনুসারে স্বীকৃত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আইন সম্পর্কে অজ্ঞতার কারনে অথবা উৎকোচ গ্রহনের অসৎ উদ্দেশ্যে রাজম্ব বিভাগীয় কর্মকর্তা/কর্মচারী নামজারী ও জমাখারিজ মঞ্জুরের ক্ষেত্রে অসহায় বিধবাগনকে হয়রানী করেন। এটা নির্মম ও দুঃখজনক। সদাশয় জেলা প্রশাসক ও কালেক্টার মহোদয় এ বিষয়টি আমলে নিয়ে আইনানুগ নির্দেশনা দিলে সমাজের অসহায় বিধবাদের হয়রানি অনেকাংশে লাঘব হবে।
লেখক : এডভোকেট, জজ কোর্ট, সুনামগঞ্জ।

  • [১]