হাসান শাহরিয়ার
ঈদের আগের দিন সংবাদপত্র অফিস বন্ধ থাকে। ফলে কারো কাজে যাওয়ার তাড়া থাকে না। এই সুযোগে আমরা জাতীয় প্রেসক্লাবে দীর্ঘক্ষণ আড্ডা দেই, রাজাÑউজির মারি। গত শুক্রবারও এর ব্যতিক্রম ছিল না। সেদিনের আড্ডার মধ্যমনি ছিলেন ‘সমকাল’ সম্পাদক গোলাম সারওয়ার। উপস্থিত ছিলেন আমিনুর রহমান, সফিকুল করিম সাবু, এনায়েত এইচ খান, আবু হাসান খান এবং আরও কয়েকজন। আমিও ছিলাম। ঠিক সন্ধ্যা সোয়া সাতটায় ‘ভোরের কাগজ’ সম্পাদক ও কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (সিজেএ) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সেক্রেটারি জেনারেল শ্যামল দত্ত টেলিফোনে একটি ক্ষুদে বার্তা পাঠালেন : ‘আমাদের সভাপতি সালেহ ভাই আর নেই।’ কিছুক্ষণের জন্য সবাই চুপ। নীরবতা ভাঙলেন গোলাম সারওয়ার। ‘আমরা সবাই ছিলাম সালেহ ভাইয়ের ¯েœহের পাত্র,’ এই উক্তি করে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি বললেন, ’শেষ পর্যন্ত সালেহ ভাইও আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন!’ কয়েকদিন আগে অসুস্থ সালেহ চৌধুরীকে দেখতে গিয়েছিলেন সফিকুল করিম সাবু। তিনি বললেন, ‘আমি তখনই বুঝেছিলাম তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এসেছে।’ গত ১১ নভেম্বর প্রেসক্লাবের কার্ডরুমের সদস্যরা ধুমধাম করে তার ৮১তম জন্মদিন পালন করে। তার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা দেখে তার দুই নাতি বিষ্ময়াবিভূত হয়ে পড়েছিল। সিজেএ বাংলাদেশ চ্যাপ্টারও সংগঠনের সভাপতির জন্মদিনে একই ধরনের আয়োজন করেছিল।
আসলে আমাদের দিনকাল ভালো যাচ্ছে না। প্রতিদিনই কানে আসে নতুন কোনো মৃত্যু সংবাদ। একের পর এক মৃত্যুতে বিষ্ময় প্রকাশ করে জাতীয় প্রেসক্লাবের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সিজেএÑর যুগ্ম সম্পাদক মাঈনুল আলম ফেসবুকে যথার্থই বলেছেন, ‘আর কত দুঃসংবাদ দিব ?’আসলে আমাদের আমলের সজ্জন ব্যক্তি, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিসেবীরা একে একে চিরবিদায় নিচ্ছেন।
আমরা এখনও বেঁচে আছি বলেই এসব মৃত্যু সংবাদে ব্যথিত হই, মর্মাহত হই। চিরনিদ্রায় নিদ্রিত ব্যক্তিদের স্মৃতিচারণ করে আমরা নিজেদের কথা ভাবি, যেন শুনতে পাই কে জানি বলছে, ‘তৈরি থাক, তোমার ডাকও অচিরেই আসছে’। তারপরও আমরা ইহকালের মায়া ত্যাগ করতে পারি না। কবির ভাষায় বলি, ‘মরিতে চাহি না আমি এ সুন্দর ভুবনে /মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই’। অদৃষ্টের লিখন কারো পক্ষেই খ-ন করা সম্ভব নয়, এই অমোঘ সত্যটি যেন আমরা মানতেই চাই না। তাই মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে যিনি অস্ত্রহাতে লড়ে সুনামগঞ্জের দিরাইÑশাল্লাÑতাহিরপুর তথা ভাটি অঞ্চলকে স্বাধীন করতে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন, মৃত্যুর কাছে সেই সালেহ চৌধুরীর পরাজয় আমরা সহজে মেনে নিতে পারি না।
গত শুক্রবার ১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ছয়টায় ঢাকার একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সবাই পরদিনের ঈদের আনন্দে মশগুল, আর সর্বজনশ্রদ্ধেয় সালেহ চৌধুরী হাসপাতালের হিমাগারে। শনিবার প্রেসক্লাবে তার জানাজায় মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি শামসুদ্দিন আহমদ সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিলেন কোনো এক উর্দু কবির বিখ্যাত দু’টি পঙক্তি : ‘ইস দুনিয়া মে হর খুশি কে সাথ এক গম্ভ ভি হোতা হ্যায় / যাহা সোহনাইয়া বাজে ওহা মাতম ভি হোতা হ্যায়।’ অর্থাৎ এই পৃথিবীর সকল আনন্দের সঙ্গে দুঃখও থাকে / যেখানে সানাই বাজে সেখানে মাতমও হয়। অনেক সময়ই উর্দু ভাষায় পারদর্শী সালেহ চৌধুরীর কণ্ঠে এই কবিতা শুনেছি। কিন্তু তিনি কি জানতেন তার বেলায়ও এই ঘটনা ঘটবে ? জুলাই মাসে আমেরিকা সফরে গেলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ’বন্ধুরা, এটা ক্যান্সারই,’ যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব দেখিয়ে নির্বিকার চিত্তে ২ আগস্ট ফেসবুকে লিখলেন, ‘গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য আবার বায়োপসি করতে হতে পারে। আমি কিন্তু আমার মতোই আছি।’ আসলে তিনি ছিলেন একজন বোহেমিয়ান, স্বাস্থ্যের দিকে খুব একটা নজর দিতেন না। জানিনা, তিনি বছরে এক বা দু’বার ডাক্তারি পরীক্ষা করাতেন কি না। তাহলে তো অনেক আগেই ক্যান্সার ধরা পড়তো। সেক্ষেত্রে উন্নত চিকিৎসার যথেষ্ট সুযোগ ছিল। তাকে এয়ার এম্বুলেন্সে করে ব্যাংকক নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, কিন্তু সেখানকার ডাক্তারগণ চিকিৎসার দায়ভার গ্রহণ করেননি। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমাকে ঢাকায় নিয়ে যাও, আমি বাংলাদেশেই মরতে চাই।’ তার মেঝো ছেলে ইয়াসির আজমান এ কথাটি জানিয়েছেন। আমেরিকা সফরেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, তার দিন ফুরিয়ে এসেছে এবং এই মরণব্যধি তাকে তিলে তিলে নিঃশেষ করে দেবে। তাই বোধকরি ৩০ জুলাই তিনি ফেসবুকে লিখলেন, ’আমায় তুমি যে অশেষ করেছ দান…এর বেশি বলার কিছু নাই।’ অসাধারণ আত্মতৃপ্তি !মৃত্যুকে কেউ সহাস্যে আলিঙ্গন করে না, কিন্তু সালেহ চৌধুরী ছিলেন তার ব্যতিক্রম, তিনি নমস্য।
সালেহ চৌধুরী ছিলেন একাধারে বরেণ্য সাংবাদিক, বিশিষ্ট কলাম লেখক, চিত্রশিল্পী, সংগঠক, সমাজসেবক এবং পরোপকারী। মরণঘাতি ক্যান্সারের সঙ্গে হাসিমুখে লড়াই করেছেন। অসম সাহসী এই যোদ্ধা ১৩ আগস্ট ফেসবুকে লিখেন, ‘যুদ্ধ করেই তো অতদূর আসা। আমি যুদ্ধ চালিয়ে যাব, ভয় নাই। এখন মুশকিল হয়েছে, মাঠ দখল করে নিয়েছে জন্ডিস। ওটা কাটলেই চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব। এখন পনেরো দিন বিছানাবন্দি। জয় বাংলা।’ ঊনিশ দিনের মাথায় তিনি চোখ বুঁজলেন। তবে এই সময়ে অনুজ সাক্ষাৎপ্রার্থীদের সঙ্গে গল্প করেছেন, আড্ডা দিয়েছেন। সব শুনে মনে হয়, হেসে হেসেই আমার এই প্রিয় মানুষটি অজানার উদ্দেশে পা বাড়িয়েছেন।
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার গচিয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তার জন্ম ১৯৩৬ সালের ১১ নভেম্বর। তার বাবা আজমান রাজা চৌধুরী (রাজা মিয়া) সেই এলাকার জমিদার ছিলেন। সালেহ চৌধুরী মৌলভীবাজার সরকারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে সিলেট এমসি কলেজের কলা বিভাগে ভর্তি হন। তখনই তিনি সাংবাদিকতার দিকে ঝুঁকে পড়েন। তিনি গল্পÑকবিতার পাশাপাশি সংবাদের সারÑসংক্ষেপ লিখতে উৎসাহী হন। ইতিমধ্যে তিনি সাপ্তাহিক ‘ইশারা’ নামের একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন (মাত্র দুইসংখ্যা বেরিয়েছিল)। ‘যুগবাণীÑযুগভেরী’ খ্যাত প্রথিতযশা সাংবাদিক মকবুল হোসেন চৌধুরীর সম্পাদনায় সাপ্তাহিক ‘সিলেট পত্রিকা’ আত্মপ্রকাশ করে ১৯৫৭ সালে। ‘মকবুল হোসেন চৌধুরী : যার হাতে দীক্ষা’ শীর্ষক এক নিবন্ধে সালেহ চৌধুরী লিখেছেন, ‘অমন একজন দিকপাল সাংবাদিকের হাতে সাংবাদিকতায় আমার হাতেখড়ি সম্পন্ন হয়।’ তিনি মকবুল হোসেন চৌধুরীকে ‘মহীরুহতুল্য দীক্ষাগুরু’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। মকবুল হোসেন চৌধুরী ছিলেন আমার পিতা। তার ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ২০০৭ সালে ‘কালের দর্পণে সাংবাদিকÑরাজনীতিবিদ মকবুল হোসেন চৌধুরী’ স্মারক গ্রন্থটির সম্পাদনা করেন সালেহ চৌধুরী। আমাদের পুরো পরিবার তার কাছে কৃতজ্ঞ।
বিএ পাস করার পর চিত্রকলার দিকে আকৃষ্ট হন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই মত পাল্টালেন। তিনি চলে গেলেন তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে, ভর্তি হলেন পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগে। কিন্তু তার লেখালেখি বন্ধ হয়নি। সেখান থেকে ১৯৬৩ সালে তিনি এম এ পাস করে ঢাকা ফিরে আসেন। সমাজকল্যাণে পাস করায় চাকুরির কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু চাকুরিস্থল ঢাকার বাইরে থাকায় তিনি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন। খ্যাতনামা সাংবাদিক ও ভাষা সৈনিক আব্দুল গাফফার চৌধুরীর সঙ্গে তার সদ্ভাব ছিল। তার রচিত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ গানটি তাকে অমরত্ব দান করেছে। তিনি ‘জেহাদ’ ছেড়ে অর্ধÑসাপ্তাহিক ‘সোনার বাংলা’ বের করলে সালেহ চৌধুরী সেখানে যোগদান করেন। এর পর দুর্দ- প্রতাপশালী গভর্নর মোনায়েম খানের ‘পয়গাম’ পত্রিকায় যোগ দেন। তার সর্বশেষ বই ‘ভাটি এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ : আমার অহংকার’। এখানে তিনি লিখেছেন, ‘কাজ করতাম পয়গামÑএ আর কম্যুনিস্ট পার্টিকে নিয়মিত চাঁদা দিয়ে স্বপ্ন দেখতাম পাকিস্তানি বাঁধন থেকে মুক্তির।’ কিছুদিনের মধ্যে গাফফার চৌধুরীর সঙ্গে যোগ দিলেন সান্ধ্য দৈনিক ‘আওয়াজ’Ñএ। তারপর তিনি চলে যান সরকারি মালিকানাধীন ‘দৈনিক পাকিস্তান’ পত্রিকায়। স্বাধীনতার পর এর নতুন নাম হয় ‘দৈনিক বাংলা’। এখানে তিনি সহকারি সম্পাদক এবং ফিচার এডিটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এনটিভির বার্তা প্রধান খায়রুল আনোয়ার মুকুল জানিয়েছেন, কোনো কাজ না থাকলে সালেহ চৌধুরী বার্তা বিভাগে এসে নীরবে বসতেন, আর চুপিসারে কোনো সহÑসম্পাদক বা রিপোর্টারের ছবি আঁকতেন। তার আঁকা স্কেচ অনেকেই যতœসহকারে বাঁধিয়ে রেখেছেন। সরকার তার নিজস্ব মালিকাধীন ‘দৈনিক বাংলা’ ১৯৯৭ সালের অক্টোবর মাসে বন্ধ করে দিলে সালেহ চৌধুরী বাহ্যত অবসর জীবন যাপন করেন। তবে প্রায়ই প্রেসক্লাবে আসতেন দাবা খেলতে; মাঝেÑমধ্যে ‘সমকাল’সহ বিভিন্ন পত্রিকায় কলাম লিখতেন।
সালেহ চৌধুরী ছিলেন সাদা মনের মানুষ, সদালাপী ও সুরসিক। তবে স্পষ্টবাদী। অন্যায় হলে কাউকে ছাড়তেন না। তিনি আত্মপ্রচারণা পছন্দ করতেন না। রাজাকার ছাড়া সবাইকেই তিনি ভালবাসতেন। পরনিন্দা ও পরচর্চা ছিল তার পরম শত্রু। উদার মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি ধর্মের বিধিবিধান পর্যালোচনা করতেন। মানুষকে আপন করে নেওয়ার এক অদ্ভুত গুণ ছিল তার। সুনামগঞ্জের এডভোকেট মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ খসরু তার প্রিয়পাত্রদের শীর্ষে ছিলেন। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আমাদের সঙ্গে তার বয়সের তফাৎ থাকলেও তিনি ছিলেন একজন অকৃত্রিম বন্ধু। প্রতি বছর ডিসেম্বরে মুক্তিযোদ্ধা কর্ণেল এ এস হেলালউদ্দিন, কর্ণেল আব্দুর রউফ প্রকৌশলী আলমগীর হোসেন ও অধ্যাপক ড. রানা চৌধুরীসহ আসতেন সহযোদ্ধাদের দেখতে। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা দিয়ে সাথী শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের কবরগুলো সংরক্ষণ করে গেছেন।’
আমরা একসঙ্গে দেশেÑবিদেশে ভ্রমণ করেছি। মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, সাহিত্য, সাংবাদিকতা ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে অনর্গল কথা বলতেন যেমনটি করতেন সাংবাদিক ও কবি প্রয়াত ফয়েজ আহমদ। গল্প বলার এক অভিনব ভঙ্গি ছিল তার। শ্রোতা কখনও নিরুৎসাহিত হতেন না। মুক্তিযুদ্ধ ছিল তার প্রিয় বিষয়। বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি দাশের অবদান ও বীরত্ব তিনি ভুলতে পারেননি। জগৎজ্যোতি ও তার দলের সদস্যদের সাহসিকতার কথা উল্লেখ করে দুঃখের সঙ্গে তিনি বলতেন, ‘জগৎজ্যোতি সেনাবাহিনীর সদস্য ছিল না বলে তাকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করা হয়নি। এটি ছিল রাষ্ট্রীয় অন্যায়।’ কোথাও বক্তৃতা দিলে শেষ করতেন ‘জয় বাংলা’ বলে। দিনকয়েক আগে তার এক সহÑমুক্তিযোদ্ধা তার সমালোচনা করে এক নিবন্ধ প্রকাশ করেন। তার সুহৃদেরা বিষয়টি তাকে গোচরিভূত করলে কোন উষ্মা প্রকাশ না করে তিনি বলেন, ‘সে ছিল এক বীর মুক্তিযোদ্ধা।’ তার এই উদারতা দেখে বন্ধুরা অবাক হয়েছিলেন। সাহিত্যিক মাঈনুল আহসান সাবের ফেসবুকে লিখেছেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি সালেহ চৌধুরীকে ‘চাচা’ বলে সম্বোধন করতেন। তার জন্মদিন উপলক্ষে গত ২৩ মে তার বন্ধুরা এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। হঠাৎ করেই তিনি গিয়ে হাজির। সাবের বললেন, ‘চাচা, আপনি ?’ স্বভাবসুলভ হাসি হেসে সালেহ চৌধুরী জবাব দিলেন, ‘তোমার জন্মদিন হচ্ছে আর আমি আসব না ?’ শুভেচ্ছা আর শুভকামনা জানিয়ে অনুষ্ঠানের মাঝপথের আগেই বিদায় নেন।
সালেহ চৌধুরীর জীবন ছিল বর্ণাঢ্য। সাংবাদিকতা ছাড়াও সাহিত্য, সংস্কৃতি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে তার অবাধ বিচরণ ছিল। জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমদ শ্রদ্ধার সঙ্গে তাকে ‘নানাজী’ বলে সম্বোধন করতেন। তিনি ছিলেন হুমায়ূন আহমদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। দাবাড়– নিয়াজ মোর্শেদের খ্যাতি অর্জনের পশ্চাতে ছিলেন সালেহ চৌধুরী। তিনি তার সম্পর্কে একটি বইও লিখেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের সামনে একজন দীর্ঘদেহী মুক্তিযোদ্ধা, সহযোদ্ধা কৃষকÑশ্রমিকের প্রতিভূ ও একজন সেবিকার যে ভাস্কর্যটি রয়েছে তা দৃঢ় প্রত্যয়, অঙ্গীকার ও প্রতিরোধেরই প্রতীক। স্থপতি ও কবি রবিউল হোসায়েন জানিয়েছেন, সালেহ চৌধুরী এর নামকরণ করেছিলেন ‘অপরাজেয় বাংলা’। আজও তাই আছে। এর স্থপতি ছিলেন বৃহত্তর সিলেটের আরেক কৃতী সন্তান সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ। সম্প্রতি তিনি ইন্তেকাল করেছেন। সুনামগঞ্জ কেন্দ্রিয় শহীদ মিনারের নকশাও তৈরি করেছিলেন সালেহ চৌধুরী।
সালেহ চৌধুরীর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ছিল পারিবারিক। তার বাবা ও আমার বাবা বন্ধু ছিলেন। আমার ভাই অধুনালুপ্ত দৈনিক ‘পূর্বদেশ’ পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টর হোসেন তওফিক চৌধুরী (বর্তমানে আইনজীবী ও কলাম লেখক) তার ¯েœহ ও ভালবাসা লাভ করেছিলেন। আমাকে তিনি আপন ছোট ভাইয়ের মতো দেখতেন। তিনি আমার ‘অতীত অতীত নয়’ বইতে লিখেছেন, ‘তার সঙ্গে আমার ভ্রাতৃপ্রতীম সম্পর্কের জন্য আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি।’ আমার যে তিনটি বই বেরিয়েছে সেগুলোর পা-লিপি তিনি দেখে দিয়েছিলেন। ১৯৯৭ সালে যখন আমরা কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের (সিজেএ) বাংলাদেশ চ্যাপ্টার গঠন করি, তখন তিনি ছিলেন অন্যতম সহÑসভাপতি। ঐ বছর সিজেএÑর হংকং সম্মেলনে তিনি যোগদান করেন। তার অনুপ্রেরণায়ই আমি তিনজন প্রতিদ্বন্দ¦ীকে পরাজিত করে কেন্দ্রিয় বা আন্তর্জাতিক কমিটির সহÑসভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলাম। পরে অবশ্য দীর্ঘ ৯ বছর সভাপতির দায়িত্ব পালন করি। সংগঠনের প্রতি সালেহ চৌধুরীর অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ গত বছর তাকে সিজেএ বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। তার আমলে ভারত ও বাংলাদেশের সিজেএ সদস্যদের একটি সম্মেলন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়। সিজেএ বাংলাদেশের যুগ্ম সম্পাদক হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী ফেসবুকে লিখেছেন, ‘সালেহ চৌধুরীর নেতৃত্বে কয়েকদিনের মধ্যেই আমাদের শিলঙ যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তিনি নিজেই আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।’ সাংবাদিকতায় প্রশংসিত কাজের জন্য ঢাকার জালালাবাদ এসোসিয়েশন ও সিলেট স্টেশন ক্লাব সালেহ চৌধুরীকে স্বর্ণপদক প্রদান করেছে। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাকে কোনো সম্মান প্রদর্শন করা হয়নি।
সালেহ চৌধুরীর মৃত্যু আমার জন্য অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। জাতি হারিয়েছে একজন দেশপ্রেমিক, মুক্তিযোদ্ধা ও তুখোর সাংবাদিক। আর আমি হারিয়েছি একজন অভিভাবক ও সুহৃদ। চলার পথে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য তিনি দীর্ঘদিন জনগণের শোক, শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকবেন। সালেহ ভাই, আপনার অবস্থান আমাদের হৃদয়ে। আমরা আপনাকে ভুলবো না।
হাসান শাহরিয়ার : প্রবীণ সাংবাদিক, কলাম লেখক ও বিশ্লেষক; কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের ইন্টারন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস।