স্টাফ রিপোর্টার
রক্তঝরা উত্তাল অসহযোগ আন্দোলনের আজ ছিল দ্বিতীয় পর্যায়ের পঞ্চম দিবস। ১৯৭১-এর ১২ মার্চ ছিল শুক্রবার। বস্তুত বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ জাতির পিতার নির্দেশে পরিচালিত হতে থাকে। রাষ্ট্রীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে সমাজের সর্বত্র সংগ্রামী জনতা তার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে থাকে। এমন সর্বাত্মক অসহযোগ ইতিহাসে নজিরবিহীন। রক্তাক্ত এদিনেও অসহযোগ পালনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ও নির্দেশে বাংলার মানুষ আসন্ন সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সেই যুদ্ধের প্রস্তুতিই নিচ্ছিল। প্রতিটি নিরস্ত্র মানুষ সেদিন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ প্রতিপালনের মধ্য দিয়ে সশস্ত্র হয়ে উঠছিল।
এদিকে পাকিস্তানের উভয়াংশের জাতীয় নেতৃবৃন্দ রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণে বঙ্গবন্ধুর শর্তগুলো মেনে নেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার প্রতি জোর দাবি জানান।
ন্যাপ (পিকিংপন্থি) সেক্রেটারি জেনারেল সিআর আসলাম সংবাদপত্রে প্রেরিত এক বিবৃতিতে বলেন, কোনো দেশপ্রেমিকই শেখ মুজিব প্রদত্ত শর্তের বিরোধিতা করতে পারে না। রাজনৈতিক সংকটের জন্য তিনি ভুট্টোকে দায়ী করে বলেন, দেশের সংকটের জন্য একচেটিয়া পুঁজিপতি ও আমরাই দায়ী। ভুট্টো ৩ মার্চের অধিবেশনে যোগদানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করার কারণেই এ সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।
জাতীয় লীগ সভাপতি আতাউর রহমান খান বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে এক বৈঠকে মিলিত হন। ময়মনসিংহে এক জনসভায় মজলুম নেতা মওলানা ভাসানী এদিনও বঙ্গবন্ধুর কর্মসূচির প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করে বলেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্বের মুখে লাথি মেরে শেখ মুজিবুর রহমান যদি বাঙালিদের স্বাধিকার আন্দোলনে সঠিক নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হন, তবে ইতিহাসে তিনি কালজয়ী বীররূপে, নেতারূপে অমর হয়ে থাকবেন। এদিন বিবিসির সংবাদে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আগামী শনিবার রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে আলাপ-আলোচনার জন্য ঢাকা আসছেন।
এদিকে দেশের সর্বস্তরের মানুষ বঙ্গবন্ধু ঘোষিত কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে মিছিল সহকারে ধানম-ির বাসভবনে আসতে থাকে। সারাদিন এমনকি গভীর রাত পর্যন্ত সংগ্রামী জনতা বিভিন্ন স্লোগান ধ্বনিতে চারদিক প্রকম্পিত করতে থাকে। এদিন অন্তত দেড় শতাধিক মিছিল বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে আসে এবং বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। নেতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে সরকারি-আধা সরকারি কর্মচারীরা ঐক্যবদ্ধভাবে অফিস-আদালত বর্জন করেন। জনসাধারণ খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দিয়ে অহিংস-অসহযোগ আন্দোলনের ক্ষেত্রে নবতর অধ্যায়ের সূচনা করে। যথারীতি আজও সারা ঢাকা শহর স্বাধিকার আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে কালো পতাকার শহরে পরিণত ছিল। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনেকেই সরকার প্রদত্ত খেতাব বর্জন শুরু করেন। জাতীয় পরিষদ সদস্য জহিরউদ্দীন তার ‘তমঘায়ে হেলাল কায়েদে আজম’ খেতাব বর্জনের ঘোষণা দেন। বিশিষ্ট সংবাদ পাঠক সরকার কবীরউদ্দীন রেডিও পাকিস্তান বর্জনের ঘোষণা দেন। এক কথায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশবাসী যে যার অবস্থানে থেকে তাদের অংশগ্রহণ চালিয়ে যেতে থাকে। এক ঘোষণায় স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা কালোবাজারি, মজুদদারি ইত্যাদি অপতৎপরতার বিরুদ্ধে কঠিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যারা এসব কার্যকলাপ চালাচ্ছে, তারা স্বাধীনতাবিরোধী গণশত্রু। ধরা পড়লে এদের বিরুদ্ধে কঠিন এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ছাড়াও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির কাছে কোনো প্রকার তেল-জ্বালানি দ্রব্য বিক্রি না করতে ব্যবসায়ীদের প্রতি ছাত্রনেতারা আহ্বান জানান। এদিন শহীদদের স্মৃতিতে শোক পালনরত দেশবাসীর সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে দেশের ১৯টি প্রেক্ষাগৃহের মালিক তাদের সিনেমা হলগুলো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন এবং বঙ্গবন্ধু ঘোষিত আওয়ামী লীগের সাহায্য তহবিলে ১৩ হাজার ২৫০ টাকা দান করেন। চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত পেশাজীবীরা, সাংবাদিক সমাজ, চারু ও কারুশিল্পীরা সবাই মিছিল সহকারে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেন। এদিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে, সিএসপি ও ইপিসিএস কর্মকর্তাদের সংগঠন পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম শ্রেণির প্রশাসকরা এক সভায় মিলিত হয়ে বলেন, এখন থেকে আমরা জননেতা শেখ মুজিবের সকল নির্দেশ মেনে চলব এবং এ মর্মে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন। গত কয়েক দিনের মতো এদিনও বগুড়ার কারাগার ভেঙে ২৭ জন কয়েদি পালিয়ে যায়। পুলিশের গুলিবর্ষণে এদিনও একজন নিহত ও ১৬ জন আহত হয়।
অসহযোগের মধ্যে স্বাধীনতাবিরোধীরা যাতে শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট করতে না পারে, সে জন্য গত রাত থেকে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী যে তৎপরতা শুরু করে, তা সর্বমহলের প্রশংসা অর্জন করে। এক শ্রেণির স্বার্থান্বেষী মহল বিভিন্ন জায়গায় লুটতরাজ শুরু করলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। সে জন্য রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পথঘাট ও বিপণিকেন্দ্রগুলোর সামনে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী অবস্থান গ্রহণ করে এবং পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। শিল্পী মুর্তজা বশীর ও কাইয়ুম চৌধুরীর নেতৃত্বে এ দিন ‘চারুশিল্প সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন বিকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ করে। প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগ দলের নেতা ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের জন্য প্রেরিত খাদ্য বোঝাই মার্কিন জাহাজের গতি বদলে করাচী প্রেরণের ঘটনায় উৎকন্ঠা ও নিন্দা প্রকাশ করেন। চট্টগ্রাম থেকে পাকিস্তানে মুদ্রা পাচারের প্রতিবাদে চট্টগ্রাম আওয়ামীলীগ ব্যাংক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে। স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এক বিবৃতিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ব্যবহারের জন্য কোন জ¦ালানি লে সরবরাহ না করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়।