- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

১৬ ইউনিয়নে হলো মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

বিশেষ প্রতিনিধি
নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত করতে এবং মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণে রাখার জন্য সুনামগঞ্জের ১১ উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও লাইব্রেরি চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে জেলার ১৬ টি ইউনিয়ন এবং একটি উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও লাইব্রেরি চালু হয়েছে। সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে এই কার্যক্রম শুরু হয়। জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম দাবি করেছেন, দেশে ইউনিয়ন পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্যোগ তাঁর জানামতে সুনামগঞ্জেই প্রথম। আগামী ৩ বছরের মধ্যে জেলার ৮৮ ইউনিয়ন এবং ১১ টি উপজেলায় এমন প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হবে এবং এটি ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।
জেলার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার পলাশ ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সর একটি কক্ষেই গত ১৯ সেপ্টেম্বর চালু হয়েছে ইউনিয়ন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও লাইব্রেরি। নতুন চালু হওয়া এই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আসা শুরু করেছেন মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র, শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
পলাশ ইউনিয়নের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. শাহিন বললো,‘আমাদের জন্য একটি বড় পাওয়া এটি। এই জাদুঘর বা লাইব্রেরি না হলে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে অনেক কিছুই জানা হতো না আমাদের। এলাকার শহীদ বা মৃত মুত্তিযোদ্ধাদের নাম পরিচয় জানা হয়েছে। লাইব্রেরিতে এসে এই পর্যন্ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগর, মুক্তিযুদ্ধে নারী, সাতজন বীরশ্রেষ্ট’র কথা, গণহত্যা ৭১’সহ অনেক বই পড়া হয়েছে।’ একই ধরণের মন্তব্য করলেন পলাশ উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী রফিক, বিল্লালসহ অনেকেই।
কেবল পলাশ ইউনিয়নেই নয় গত প্রয়া আড়াই মাসে (২ মাস ১৫ দিনে) মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগানিয়া এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেছে জগন্নাথপুর উপজেলার কলকলিয়া, পাটলী, আশারকান্দি, রানীগঞ্জ, মীরপুর, সৈয়দপুর, শাহারপাড়া, পাইলগাঁও, চিলাউড়া হলদিপুর, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সলুকাবাদ, পলাশ, ধনপুর, ফতেপুর, বাদাঘাট দক্ষিণ এবং বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা সদরেও।
বিশ্বম্ভরপুরের গণমাধ্যম কর্মী সালেহ্ আহমদ   বলেন,‘ইউনিয়ন বা উপজেলা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর একটি যুগান্তকারী কর্মসূচি। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা পাকহায়েনা বা তাদের দোসরদের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের নাম পরিচয় লিখে বোর্ড করা যায়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভিত্তিক বইয়ের সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং সকাল ১০ টা থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত খোলা রাখার ব্যবস্থা থাকতে হবে। ইন্টারনেট সংযোগ বা ওয়াইফাইয়ের ব্যবস্থা থাকলে আরো ভাল হয়।’
পলাশ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল কাইয়ুম বলেন,‘মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর সমৃদ্ধ করার জন্য আমরা কাজ করছি। ইতিমধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যারা মারা গেছেন, তাঁদের নামের তালিকার বোর্ড করা হয়েছে। জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের নামের একটি বোর্ড থাকবে। মুক্তিযোদ্ধারা কেউ কেউ তাঁদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের নানা ছবি সরবরাহ করেছেন, সেগুলোও রাখা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সমৃদ্ধ বই সংগ্রহের চেষ্টা হচ্ছে।’ তাঁর মতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের জন্য আলাদা একটি ভবন এবং মুক্তিযোদ্ধা বা তরুণ প্রজন্মের পড়–য়াদের বসার প্রয়োজনীয় চেয়ার-টেবিলের জন্য সরকারি সহায়তা পেলে ভালো হতো।
জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাছুম বিল্লাহ্ বলেন,‘নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকর্ম তুলে ধরার লক্ষেই জেলা প্রশাসক এই উদ্যোগ নিয়েছেন। আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের গল্প রেকর্ড করবো এবং এগুলো প্রকাশনা আকারে এবং সিডি আকারেও সংরক্ষণ করবো। মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী নির্ভর বই-পত্র সংরক্ষণ করা হবে।’ তিনি জানান, জগন্নাথপুরের ইউনিয়নগুলোর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্বোধন করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান। উদ্বোধনকালে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনপ্রিয় করার তাগিদ দিয়েছেন তিনি। উপজেলা সদরে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স হচ্ছে, ওখানে সমৃদ্ধ উপজেলা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর করার পরিকল্পনার কথা জানালেন তিনি।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সমীর বিশ্বাস বললেন,‘আমরা চেষ্টা করছি ইউনিয়ন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ধাপে ধাপে বইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে। নতুন প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানানোর চেষ্টা হচ্ছে।’
জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম বলেন,‘আমার জন্ম ৭১’এ, আমার বাবা পরিবার পরিজন ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। চেতনাবোধের জায়গা থেকে মনে হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলতে, স্থানীয় সরকার পর্যায়ের তৃণভূমি ইউনিয়ন পরিষদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলকে সক্রিয় করতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর স্থাপন করতে পারি। স্থানীয় সরকার কার্যক্রমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে একিভূত করা গেলে নতুন প্রজন্ম ইতিহাস জানতে পারবে। মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স হয়েছে। প্রয়াত হচ্ছেন তাঁরা। তাঁদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য আমি সুনামগঞ্জে যোগদানের পরই সিদ্ধান্ত নেই জেলার ৮৮ ইউনিয়ন এবং ১১ উপজেলায় ৯৯ টি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর করবো। এটি ৩ বছরের পরিকল্পনা। ইতিমধ্যে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান তানিয়া সুলতানার সহায়তায় বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা সদরে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর হয়েছে। ঐ উপজেলার সবকয়টি ইউনিয়ন এবং জগন্নাথপুর উপজেলার সবকয়টি ইউনিয়নসহ ১৬ টি ইউনিয়নে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও লাইব্রেরি স্থাপন হয়েছে। আমরা এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমৃদ্ধ করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবো।’

  • [১]