বিশেষ প্রতিনিধি
দুই মাস আগেও সবজী, কাঁচামাল, বালুপাথরবাহি ট্রাক, লরি, অ্যাম্বুলেন্স, ব্যক্তিগত গাড়ী চলতো এই সড়ক দিয়ে। এখন তিনটি ভাঙায় যাত্রী নামিয়ে কোনভাবে অটোরিক্সা বা মোটর সাইকেল ছাড়া অন্যকোন যানবাহন চলে না সুনামগঞ্জ-ধারারগাঁও-হালুয়ারঘাট সড়ক দিয়ে। ধারারগাঁওয়ের মাস্তুরা-মবশি^র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক উজ্জ্বল চন্দ্র শীল মানুষের এমন কষ্টের কথা জানিয়ে বললেন,‘তিন দফা বন্যার দুর্ভোগ যেন, সড়কে রেখে গেছে মানুষের জন্য।’
সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ-গজারিয়া সড়ক দিয়ে কমপক্ষে তিন লাখ মানুষের যাতায়াত। এই সড়কে গেলে কেউ বুঝবেনই না, দুই মাস আগেও এই সড়ক দিয়ে গাড়ী চলতো। সড়কের অনেকাংশ দেবে গেছে। অ্যাপ্রোচ সড়কের মাটি সরে গেছে। দুটি অংশ একেবারে ভেসেই গেছে। এই অংশগুলো ট্রলারে যাতায়াত করেন মানুষ। এই সড়কে ছোট ছোট কিছু যানবাহন, ভেঙে ভেঙে কিছু কিছু অংশে চলে। জামালগঞ্জের গণমাধ্যমকর্মী ওয়ালিউল্লা সরকার যাতায়াতের এই দুর্ভোগের কথা জানিয়ে বলেন, জামালগঞ্জের ভাটিতে আমাদের যাদের বাড়ি,
তাদের দুর্ভোগ কবে শেষ হবে জানি না।
কেবল এই দুটি জনপদই নয়। সুনামগঞ্জের ১১ উপজেলায়ই গ্রামীণ জনপদ থেকে জেলা সদরের সঙ্গে উপজেলার সংযোগ সড়ক, উপজেলা থেকে ইউনিয়ন পরিষদের সংযোগ সড়ক ও পৌরসভা এলাকার সড়কেও রয়েছে বন্যার কষ্ট। তিন দফা বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সড়কের। দায়িত্বশীলরা বলছেন, বিশেষ প্রকল্প ছাড়া এসব সড়ককে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া কঠিন।
সুনামগঞ্জ এলজিইডি জানিয়েছে, তাদের ১৮৬ টি সড়কের ৯০০ কিলোমিটারেরও বেশি কাঁচা পাকা গ্রমীণ সড়ক ডুবে এবং ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া সড়ক বিভাগের ৫ টি সড়কের ৩০ কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এসব সড়কের মধ্যে রয়েছে, জাউয়াবাজার-ছাতক সড়কের আন্দারগাঁও অংশ, কৈতক-সিরাজগঞ্জ সড়ক, ছাতক-কাটাখালী-দোয়ারাবাজার, জালালপুর-রসুলগঞ্জ- দোয়ারাবাজার, গোবিন্দগঞ্জ-রসুলপুর- বুরাইয়াবাজার, জাউয়া-জগন্নাথপুর হয়ে পরগনা বাজার সড়ক, কালারুখা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কালারুখা বাজার পর্যন্ত সড়ক সহ ছাতকের ১৯ টি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের খারাপ অবস্থা।
রজনীগঞ্জ-নগদীপুর হয়ে কাউয়াজুরী, বাংলাবাজার-আলীপুর হয়ে লিপসা, দিরাই-শ্যমারচর, দিরাই-জগদল হয়ে কলকলিয়া, হোসেনপুর-পাইকাপন- তেলিকোণা, জগদল-কবিরপুর হয়ে ভোরাখালী সড়ক, বদলপুর-শ্যামারচর হয়ে গচিয়া, কর্ণগাঁও-চকবাজার হয়ে গচিয়া, টুকদিরাই-কচুয়া- গচিয়াসড়ক সহ দিরাই উপজেলার ২২ টি সড়কে খানাখন্দ-ভাঙাচোরা দেবে গিয়ে চলাচলের অনুপযোগী গেছে।
সুনামগঞ্জ-দোয়ারাবাজার, বাংলাবাজার-হকনগর- বোগলাবাজার, দোয়ারাবাজার-হরিনাপাটি-আদারবাজার, বোগলাবাজার-বাংলাবাজার, টেবলাই থেকে বালিউড়া বাজার, দোয়ারাবাজার-বড়খাপন-কপলাবাজার, বোগলাবাজার- ভাঙাপাড়াসহ দোয়ারাবাজার উপজেলার ১৯ সড়কেরও একই অবস্থা।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জের বাংলাবাজার হয়ে আমরিয়া, বেতগঞ্জ হয়ে চিকারকান্দি, উপজেলা সদর থেকে ডুংরিয়া, জয়সিদ্দি, ঠাকুরভোগ, ভমভমি বাজার হয়ে ইসহাকপুর-হলদারকান্দি, জয়কলস, নোয়াখালি হয়ে, হাসনাবাজ-জামলাবাজ সড়ক, শিমুলবাক-জয়নগর হয়ে মুক্তাখাই-চাঁনপুর সড়কসহ ২২ সড়কের বেহাল অবস্থা।
তাহিরপুর উপজেলার মহেশখোলা-পলাশ হয়ে বিন্নাকুল বাজার, তাহিরপুর-বাদাঘাট, বালিয়াঘাটা-শ্রীপুর উত্তর সড়ক, তাহিরপুর-মধ্যনগর হয়ে চাতাপাত্তি সড়ক চলাচলে অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
ধর্মপাশা উপজেলার ধর্মপাশা-জয়শ্রী, ধর্মপাশা-গোলকপুর হয়ে মহদীপুর, মধ্যনগর-বাদাঘাট-মহেশখোলা-বাঙালভিটা, জয়শ্রী- গোলকপুর-সুখাইড় রাজাপুর বাজার সড়কসহ এই উপজেলার ৩০ সড়কে চলা দায়।
শাল্লা উপজেলার শ্যমারচর-অনন্তপুর, শাল্লা সদর-রাহুতলা, শাল্লা সদর-আদিত্যপুর সড়কে পায়ে হেঁটেও চলা যাচ্ছে না।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সুনামগঞ্জ- মঙ্গলকাটা সড়কের নবীনগর-ধারারগাঁও অংশ, কাঠইড়-জয়নগর, বেতগঞ্জ-লালপুর, টুকেরঘাট-জয়নগর, জানিগাঁও-জয়নগর, জানিগাঁও-জয়নগর সড়কসহ ৩৯ গ্রামীণ সড়ক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার সলুকাবাদ-চালবন-রামপুর, সলুকাবাদ- সোনারপাড়া-রতারগাঁও, সলুকাবাদ-চালবন, মথুরকান্দি-চিনাকান্দি, পলাশ-করচার হাওর সড়কসহ ৬ সড়কে চলাচল করাই দায়।
জামালগঞ্জ উপজেলার জামালগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে জয়নগর হয়ে নোয়াগাঁও, জামালগঞ্জ- সেলিমগঞ্জ সড়ক, সেলিমগঞ্জ-আলীপুর সড়ক, সাচনা-রামনগরসহ ৫ সড়কের বেহাল দশা।
জগন্নাথপুর উপজেলার জগন্নাথপুর- শিবগঞ্জ- বেগমপুর, জগন্নাথপুর- চিলাউড়া, জগন্নাথপুর-হবিবপুর, সৈয়দপুর- তেঘরিয়া, রানীগঞ্জ-স্বজনশ্রী, শিবগঞ্জ-রানীগঞ্জ সড়কসহ ২১ টি সড়কের বেহাল অবস্থা।
এছাড়া সুনামগঞ্জ সড়ক বিভাগের ৫ টি সড়ক দিয়ে যানবাহন চলাচল কষ্টকর হয়ে পড়েছে। সড়কগুলোর মধ্যে রয়েছে সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ, গোবিন্দগঞ্জ- ছাতক- দোয়ারাবাজার, সুনামগঞ্জ- দোয়ারাবাজার, সুনামগঞ্জ-কাচিরগাথি-বিশ^ম্ভরপুর সড়ক যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে গেছে।
সুনামগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম জানালেন, প্রায় ৩০ কিলোমিটার সড়কের এমন অবস্থা। এই সড়কে নতুন করে কাজ করতে হবে। এজন্য প্রায় ৪০ কোটি টাকার প্রয়োজন। সড়কগুলোতে সাময়িকভাবে বস্তা, কংক্রিট পেলে কোনভাবে যান চলাচলের উপযোগি করা হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে নতুন করে কাজ করা হবে।
সুনামগঞ্জ এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহবুব আলম বললেন, জেলার ১১ উপজেলার প্রায় ৯০০ কিলোমিটার গ্রামীণ কাঁচা-পাকা সড়ক তিন দফা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২৪ টি সেতু কালভার্ট ভেসে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির এসব প্রতিবেদন আমরা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট পাঠিয়েছি। কিছু সড়কে সাময়িক কিছু কাজ করে আপাতত চলাচলের উপযোগি করে হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক সড়কই নতুন করে করতে হবে।