বিশেষ প্রতিনিধি
বন্যায় জেলার গ্রামীণ সড়কের বেহাল অবস্থা জেলাজুড়েই। কোন কোন উপজেলা সড়কের অবস্থাও চলাচল অনুপযোগী হয়ে আছে। সবচেয়ে বেশি খারাপ অবস্থা জামালগঞ্জ, দোয়ারাবাজার, ধর্মপাশা ও শাল্লা উপজেলার। এই চার উপজেলার মানুষ যোগাযোগ বিপর্যয়ে পড়েছেন। বন্যার পানি নামার দেড়মাস পরেও ঢলের পানির চাপে স্থানে স্থানে ভাঙন দেখা দেওয়ায় জেলা সদর সহ সারাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারী সড়ক পথে এখন আর সরাসরি যানবাহন চলছে না। ১০ বছর আগে ব্যবহার করা লঞ্চ, ট্রলার এবং পায়ে হাঁটাই ভরসা কমপক্ষে ১০ লাখ মানুষের। সড়কের জরুরি মেরামত কাজ করে যোগাযোগ সচল করার দাবি জানিয়েছেন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এসব উপজেলার বাসিন্দারা।
সুনামগঞ্জ থেকে দোয়ারাবাজারে সামান্য ভারী মালামাল নিয়ে যেতে হলে ট্রলারে, না হয় গোবিন্দগঞ্জ ছাতক ঘুরে দোয়ারাবাজার যেতে হচ্ছে। অর্থাৎ ১৯ কিলোমিটার সড়কপথ হয়েছে এখন ৬৩ কিলোমিটার।
বুধবার সকালে সুনামগঞ্জ শহরের হাজীপাড়া এলাকা থেকে কৃষি অফিসের কিছু ভারী মালামাল নিয়ে দোয়ারাবাজার যাচ্ছিলেন পিকআপ চালক রফিকুল ইসলাম। শহরতলির বৈঠাখালির এই পিকআপ চালক বললেন,‘বন্যার আগে দোয়ারাবাজারে ১৫ শ’ টেকায় (টাকায়) গেছি, আজকে আটাইশ’ (দুই হাজার আটশ’) টেকায় ট্রিপ লইয়াও পুষার না, ১৯ কিলোমিটার যাওন লাগের ৬৩ কিলোমিটার ঘুইরা।’
দোয়ারাবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্মআহ্বায়ক মো. আব্দুল খালেক বললেন,‘গ্রামীণ সড়কের অবস্থা এতোটা বেহাল, কোন কোন এলাকায় বলতে হয়, এইখানে আগে সড়ক ছিল। এছাড়া উপজেলার যোগাযোগ সড়ক নিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন দোয়ারাবাসী। সুনামগঞ্জ- দোয়ারা-ছাতক সড়কের কাঞ্চনপুর গ্রামের পাশের কাঞ্চনপুর-দোহালিয়া অংশে ৭০ থেকে ৮০ ফুট সড়কে এখন গভীর খাল। আরও কয়েকস্থানে ভাঙন আছে।
এই সড়কে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল সড়কটি যেন পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। মোটর সাইকেল ছাড়া বড় কোন যানবাহন চলছে না সড়ক দিয়ে। সড়কের দোহালিয়া-বাজিতপুর অংশের সেতু’র অস্তিত্বই নেই। ওখানককার বিশাল ভাঙনে খেওয়া নৌকা চলছে।
সড়কের মান্নারগাঁও গ্রামের পাশের বড় সেতু’র অ্যাপ্রোচ ভেঙে ভয়াবহ অবস্থা ছিল। সেনাবাহিনী এই অংশে স্টিলের পাত দিয়ে কাজ করে সচল করে দেওয়ায়, এই অংশে আপাতত চলাচলের ব্যবস্থা হয়েছে।
চার উপজেলার যোগাযোগ সড়কের বেহাল অবস্থা
সুনামগঞ্জ-সাচনা সড়কের জগাইরগাঁও এলাকায়ও সেনাবাহিনী ড্রেজার দিয়ে মাটি ফেলে কোনভাবে এই পথটি সচল করায় জামালগঞ্জের একাংশের মানুষ জেলা সদরে আসতে পারছেন। অন্য অংশের লক্ষাধিক মানুষ সুনামগঞ্জ—জামালগঞ্জ—মান্নানঘাট সড়কের স্থানে স্থানে ভাঙন হওয়ায় পথ কষ্টে আছেন। সুনামগঞ্জ—জামালগঞ্জ সড়কের জাল্লাবাজ গ্রামের পাশের সেতুর অ্যাপ্রোচ ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। এই সড়কের উজ্জ্বলপুর অংশ ভেঙে সুরমা নদীর সঙ্গে মিশে গেছে। এছাড়া সড়কের মান্নানঘাট পর্যন্ত স্থানে স্থানে ভাঙন হওয়ায় ধর্মপাশা উপজেলাবাসী জামালগঞ্জ হয়ে সড়ক পথে এখন আর জেলা সদরে আসতে পারছেন না।
ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমদ বিলকিস বললেন, ‘আমাদেরকে ১০ বছর আগের লঞ্চ যোগাযোগের উপর এখন নির্ভর করতে হচ্ছে। উপজেলাবাসী মান্নানঘাট গিয়ে সড়কপথে সুনামগঞ্জসহ সিলেট যাতায়াত করতে পারায় এই পথে লঞ্চ ওঠেই গিয়েছিল। একটি লঞ্চ কেবল ছিল, এখন নতুন আরেকটি লঞ্চ ঢাকা থেকে এসেছে।’
সুনামগঞ্জ-দিরাই-মিলনবাজার হয়ে গত কয়েক বছর হয় বর্ষায়ও বেশিরভাগ এলাকা সড়ক পথেই যাতায়াত করেছেন শাল্লাবাসী। এবারের বন্যার পর সেই সুযোগও নষ্ট হয়ে গেছে। ভাটিবাংলা কলেজের পাশের সড়ক এবং আনন্দপুরের কালভার্টের অ্যাপ্রোচ ভাঙায় ওখানকার মোটর সাইকেল এবং অটো চালকেরা আর এই পথ দিয়ে যাত্রী টানতে পারছেন না।
শাল্লা উদীচীর সভাপতি তরুণ কান্তি দাস বললেন, ‘শাল্লার যোগাযোগের দাবি কেউ আমলে নেয় না, যেটুকু হয়েছিল, বন্যায় সেটুকুও গেছে, এখন আবারও ট্রলারের দিকেই চেয়ে থাকতে হচ্ছে আমাদের।’
সুনামগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান চার উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থার করুণ চিত্রের কথা স্বীকার করে বললেন, বন্যার পানি নামার পর সারা জেলার গ্রামীণ সড়কের বেহাল অবস্থার কথা উর্ধ্বতন কর্তর্ৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। উপজেলা সড়ক জরুরিভাবে মেরামত করে চলাচল উপযোগী করে দেবার জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পেলে সড়কে কাজ করে চলাচল উপযোগী করে দেওয়া হবে।