- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

১৯ মার্চ ১৯৭১- প্রথম স্বতঃস্ফূর্ত সশস্ত্র বিদ্রোহ

স্টাফ রিপোর্টার
১৯৭১-এর ১৯ মার্চ দিনটিও ছিল শুক্রবার। স্বাধিকার আদায়ের দাবি এবং বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার সমর্থনে রাজধানীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গণসংগঠনের সভা-সমাবেশ, শোভাযাত্রা, বিক্ষোভ মিছিল ও স্লোগানে রাজপথ প্রকম্পিত থাকে। সকাল ১০টায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর তৃতীয় দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা শেষে দুপুর ১২টায় নিজ বাসভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু আলোচনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, আমি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেড় ঘণ্টা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আমাদের আলোচনা অব্যাহত থাকবে। আমরা আগামীকাল সকাল ১০টায় প্রেসিডেন্ট ভবনে পুনরায় আলোচনা বৈঠকে বসব। তৎপূর্বে উপদেষ্টা পর্যায়ে সন্ধ্যায় আমার প্রতিনিধি এবং প্রেসিডেন্টের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে জনৈক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আলোচনার কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে আরও সময়ের প্রয়োজন। আমি বিশ্বাস করি, জেনারেল ইয়াহিয়া বাস্তবতাকে অনুধাবনের চেষ্টা করছেন। তার বিপরীত কিছু ঘটলে তা হবে অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও দুঃখজনক। আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আমরা পিছু হটতে পারব না- এটা তাদের বুঝতে হবে। আলোচনাকালে প্রেসিডেন্ট কোনো প্রস্তাব দিয়েছিলেন কি-না- এরূপ প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, ইয়াহিয়া খান বিচারপতি এআর কর্নেলিয়াসের ব্রিফ অনুযায়ী আগে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের প্রস্তাব দিলে আমি সঙ্গে সঙ্গে তা নাকচ করে দিই এবং প্রথমে সামরিক আইন প্রত্যাহার ও গণপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবির পুনরুল্লেখ করি। শাসনতান্ত্রিক সংকট প্রশ্নে কোনো আলোচনা হয়েছে কি-না- একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, আমি প্রেসিডেন্টকে বলেছি, দেশের সংবিধানের খসড়া রচনা হয়ে গেছে এবং সম্ভাব্য স্বল্প সময়ের মধ্যে তা পেশ করা হবে। এর ফলে দেশে যে শাসনতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক সংকট বা জটিলতা সৃষ্টির কথা বলা হচ্ছে, তা একটি কাল্পনিক বিষয় ছাড়া আর কিছুই নয়। বরং আমার দাবিগুলো না মানা হলেই এসব জটিলতা বাড়তে পারে এবং দিন দিন পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠছে। অযথা কালক্ষেপণ করা ঠিক নয়।
আজকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল বেলা আড়াইটায় সেনাবাহিনীর গণবিরোধী কাজের প্রতিবাদে জয়দেবপুরে প্রায় ১০ হাজার লোক এক বিক্ষোভ মিছিল বের করে। শান্তিপূর্ণ এ মিছিলটি জয়দেবপুর চৌরাস্তা ও রেলগেটের কাছে অবস্থান গ্রহণ করলে বিনা উস্কানিতে সেনাবাহিনীর সদস্যরা জনসাধারণের ওপর গুলিবর্ষণ ও এলোপাতাড়ি বেয়নেট চার্জ করে। ফলে ঘটনাস্থলে নয়জন এবং পরে আরও ১১ জনের মৃত্যু ঘটে এবং শতাধিক লোক আহত হয়। ঘটনাটি ছিল বঙ্গবন্ধু-ইয়াহিয়া আলোচনা চলাকালেই স্বাধিকারের দাবি আদায় না হলে পূর্ণ স্বাধীনতার লক্ষ্যে প্রথম স্বতঃস্ফূর্ত সশস্ত্র বিদ্রোহ।
সকালে অনুষ্ঠিত বঙ্গবন্ধু-ইয়াহিয়া বৈঠকের সিদ্ধান্ত মোতাবেক সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু এবং প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টাদের মধ্যে দু’ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন সর্বজনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ ও ড. কামাল হোসেন। অন্যদিকে প্রেসিডেন্টের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন মি. এআর কর্নেলিয়াস, লে. জেনারেল পীরজাদা ও কর্নেল হাসান।
বৈঠক শেষে ধানম-িতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে ফিরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তাজউদ্দীন আহমদ জানান, উপদেষ্টা পর্যায়ের এই বৈঠকে দেশের স্বার্থসংশ্নিষ্ট রাজনৈতিক সমস্যাবলির বহু বিষয় আলোচিত হয়েছে।
আজও বঙ্গবন্ধুর বাসভবন মিছিল আর জনস্রোতে প্লাবিত ছিল। বিজ্ঞান কর্মচারীদের এক বিশাল মিছিলের উদ্দেশে বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু বলেন, বাংলাদেশের জনগণের স্বাধিকার অর্জনের কোনো ত্যাগকেই অসাধ্য বলে বিবেচনা করা হবে না। বাংলাদেশের রাজপথ, অলি-গলি শহীদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। আজ আবার জয়দেবপুরের মাটি শহীদের রক্তে সয়লাব হয়ে গেছে। সামরিক শাসকদের উদ্দেশে তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করে তিনি বলেন, আর কত রক্ত চাও? আর কত রক্ত পান করলে তোমাদের তৃষ্ণা মিটবে? আমরা শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যার সমাধান চেয়েছি। আর তোমরা চাও অস্ত্রের জোরে, শক্তির জোরে শাসন করতে। কিন্তু বাঙালিদের শক্তির জোরে দাবিয়ে রাখা যাবে না।
চট্টগ্রামে এক সংবাদ সম্মেলনে মজলুম নেতা মওলানা ভাসানী বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে পূর্ণ ক্ষমতা অর্পণ ভিন্ন অন্য কোনো উপায়ে পাকিস্তানকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার জানা উচিত যে, তিনি জনগণের প্রতিনিধি নন। সুতরাং জনগণের ওপর কর্তৃত্ব করার কোনো অধিকারও তার নেই।
অন্যদিকে বাংলাদেশে চলমান সর্বব্যাপী অসহযোগের বিপরীতে জনাব ভুট্টোও তার শক্তিমত্তা প্রমাণে মরিয়া হয়ে ওঠেন। আজ এক বক্তৃতায় তিনি বলেন, আমি এখন পরিস্কার বুঝতে পেরেছি, আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোয়ালিশন গঠনের আমাদের আর কোনো সুযোগ নেই। কেন্দ্রে ক্ষমতার ব্যাপারে আমাদের হিস্যা থেকে বঞ্চিত করার ষড়যন্ত্র করা হলে আমিও চুপ করে থাকব না। আপনারা পূর্ব পাকিস্তানের লোকদের শক্তি দেখেছেন; এবার পশ্চিম পাকিস্তানের লোকদের শক্তি দেখবেন। ভুট্টোর এই উস্কানিমূলক বক্তব্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

  • [১]