- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

২৮ করলে পুড়ে, ২৯ করলে ডুবে’/ নতুন জাতের ধান চাষাবাদ জরুরি

‘সাইদুর রহমান আসাদ
হাওরাঞ্চলের জেলা সুনামগঞ্জের ছোট-বড় সকল কৃষক ব্রি-২৮ জাতের ধান চাষাবাদ করেন আগাম খোরাকি’র জন্য। চৈত্রমাসের মাঝামাঝি সময়ের এই ধান কেটে শ্রমিকসহ পরিবারের খোরাকি’র ব্যবস্থা হয়। আগাম ওঠানো ধান বিক্রি করেই ফসল কাটা মৌসুমের খরচ মেঠানো হয়। এবার এই ধান চাষ করে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। আগাম ফলনের আশায় লোকসানের মুখে পড়েছেন তারা। ধানের অধিকাংশই চিটা, ফলে ‘খোরাকি’ ও মৌসুমের খরচ নিয়ে দুঃশ্চিন্তার মধ্যে পড়েছেন কৃষকরা। কৃষিবিদরা বলেছেন, হাওরের কৃষকদের সচেতন হতে হবে। বুঝতে হবে ব্রি- ২৮ জাতের ধান চাষাবাদ করলে পুড়ে যাবে বা চিটা হয়ে যাবে। ব্রি- ২৯ জাতের ধান করলে অকাল বন্যায় ডুবতে পারে। এই অবস্থায় নতুন জাতের ধান চাষাবাদে মনযোগী হতে হবে।
কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জ জেলায় এবার ২ লাখ ২২ হাজার ৭৯৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। এরমধ্যে ব্রি- ২৮ ধান আবাদ হয়েছে ৪৩ হাজার ২৭২ হেক্টর জমিতে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. কাউসার ভূইয়া। তিনি এবার দেখার হাওরে চার কেয়ার (৩০ শতাংশে ১ কেয়ার) জমি ২৫ হাজার টাকায় রংজমা (বর্গা নেয়া) নিয়েছেন। ব্রি-২৮ ধানের বীজ বপন, রোপন, সার ও শ্রমিক বাবদ খরচ হয়েছে আরও ২০ হাজার টাকা। মোট ৪৫ হাজার টাকা খরচ করে এখন জমির ধান সব চিটা। এতে বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে ‘খোরাকি’ নিয়ে দুঃশ্চিন্তার মধ্যে পড়েছেন কাউসার।
তিনি এই প্রতিবেদককে বললেন, ৪ কেয়ার জমি চাষ করতে আমার খরচ হয়েছে ৪৫ হাজার টাকা। ধারকর্য করে ব্রি-২৮ ধান আবাদ করেছিলাম। এখন সব জমি জ¦লে গেছে। বাড়িতে ১০ টি গরু আছে। গরুর খেরের (খড়) জন্য রোজ ছয়শ’ টাকা করে ৭ জন কামলা (কাজের মানুষ) দিয়ে ধান কাটতেছি।’
কাউসার বলেন, ব্রি- ২৮ ধান চাষ করার উদ্যেশ হলো এটি আগে কেটে ঘরে তুলা যায়। ব্রি- ২৯ ধান চাষ করলে আগাম বন্যায় ডুবে (তলিয়ে) যায়। এনিয়ে সমস্যার মধ্যে পড়েছি। ‘২৮ করলে পুড়ে যায়, ২৯ করলে ডুবে যায়’।
এমন চিত্র শুধু দেখার হাওরের কৃষকদের নয়, জেলার ১২ উপজেলার ছোট বড় মিলিয়ে ১৪২ টি হাওরে আবাদকৃত ব্রি- ২৮ জাতের ধানের এমন দশা। ধানের ভেতরে চিটা হয়ে উপরে সাদা হয়ে গেছে। এতে লোকসানের মুখে পড়েছেন কৃষক।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টার ফলে ১৯৯৪ সালে উদ্ভাবন হয় বোরো মৌসুমে চাষ উপযোগী ব্রি-ধান ২৮ জাতের ধান। এর ফলে বোরোতে ধান উৎপাদনে আমুল পরিবর্তন হয়। যেসব এলাকায় একফসলি হিসেবে শুধু বোরো চাষ হয়, সেসব এলাকার জন্য ব্রি-ধান ২৮ জাতটি বিশেষ উপযোগী ছিল। এই ধানের জীবনকাল ১৩৫-১৪০ দিন, উচ্চতা ৮৫-৯০ সেন্টিমিটার এবং ফলন হেক্টরপ্রতি ৫ দশমিক ৫ থেকে ৬ টন। চাল মাঝারি চিকন সাদা। ভাত ঝরঝরে ও সুস্বাদু। একারণে কৃষকদের এই ধান চাষে জোক বেশি।
ধর্মপাশা উপজেলা সুখাইর রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নের নুরপুর গ্রামের বড় কৃষক আবদুল্লাহ আল আজাদ বললেন, আমাদের এলাকায় যারা ব্রি-২৮ ধান আবাদ করেছেন তারাই ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সবারই ধান চিটা হয়ে গেছে। অতিরিক্ত গরম ও সময় ২৮ ধানের উপযোগি সময়ে বৃষ্টিপাত না হবার কারণে এমন হয়েছে বলে জানান তিনি।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার জানিগাঁওয়ের বাসিন্দা মো. শামছুদ্দিন বলেন, দেখার হাওরে ৫ কেয়ার জমি আবাদ করেছি। এরমধ্যে ব্রি-২৮ ধান অর্ধেক। ১ কেয়ার জমি আবাদ করতে সাড়ে তিন হাজার টাকা খরচ হয়েছে। নিজের শ্রমতো বাদই দিলাম। এতো কষ্টের আবাদ ব্রি-২৮ ধান গেছে জ¦লে। এখন কিভাবে চলবো বাকী দিন সে চিন্তায় পড়েছি।
তিনি বলেন, আমরা বাজার থেকে ব্রি-২৮ ধানের বীজ কিনে রোপন করেছি। কেউ আমাদের বলে নি এই ধান আবাদ না করতে। বললে, আমরা এই ধান আবাদ করতাম না।
হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য সচিব অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, গেল বছরও ব্রি- ২৮ ধানে চিটা হয়েছে। আমরা কৃষকদের বুঝিয়েছি ব্রি- ২৮ ধানের পরিবর্তে অন্য জাতের ধান আবাদ করতে। কিন্তু যে কৃষকেরা গতবছর মার খেয়েছে ২৮ আবাদ করে এবারও সে ২৮ আবাদ করে মার খেয়েছে। এর দায় কৃষি অফিস এড়াতে পারে না। এই ধান আবাদ না করতে যেরকম প্রচার-প্রচারণা করার কথা কৃষি অফিসের, সেরকম তারা করছে না। ফলে কৃষকরা বারবার একই ভুল করে লোকসানের মুখে পড়ছে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. শওকত ওসমান মজুমদার বললেন, ব্রি- ২৮ সহ স্থানীয় কিছু ধানের মধ্যে চিটা দেখা গেছে। এটি নিরসন করতে মৌসুমের প্রথম থেকেই কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বালাই নাশক প্রয়োগ, সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। প্রকৃতি অনুকূলে থাকলে এবার বোরো’ বাম্পার ফলনের আশা করছি।
তিনি বলেন, ব্রি-২৮ ও ব্রি- ২৯ জাতের ধান পুরোনো হওয়ায় এগুলো চাষাবাদ না করতে কৃষকদের বিভিন্ন উঠান বৈঠক, মতবিনিময় সভায় অনুৎসাহিত করেছি। এই দু’টি ধানের পরিবর্তে বাজারে আসা নতুন জাতের ধান আবাদ করতে কৃষকদের উৎসাহিত করছি। ব্রি- ২৮ ধানের পরিবর্তে ব্রি- ৮৮, ব্রি-৯৬, ব্রি-১০০ ও ব্রি-২৯ ধানের পরিবর্তে ব্রি- ৮৯, ব্রি-৯২, বিনা-২৪, বিনা-২৫ সহ উচ্চ ফলনশীল ধান আবাদ করতে বলা হয়েছেকৃষকদের।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) সুনামগঞ্জ অফিসের বীজ বিপনন শাখার উপসহকারী পরিচালক মো. আমিনুর রহমান বলেন, ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ খুবই জনপ্রিয় জাতের ধান। এজন্য হঠাৎ করে বন্ধ করে দেয়া সম্ভব নয়। এই দু’টি ধানের পরিবর্তে আমরা অন্য জাতের ধান বাজারে এনেছি। কিন্তু এই পরিবর্তনের জন্য সময় লাগবে।

  • [১]