- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

৩৫ পিআইসি সদস্য কালো তালিকাভুক্ত

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের হাওররক্ষা বাঁধের কাজে জড়িত সাতটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি’র) ৩৫ জন সদস্যকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। একইসঙ্গে এসব পিআইসিকে আর বিল না দেবারও সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটি। মঙ্গলবার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জেলা কমিটির সভায় এই সিদ্ধন্ত নেওয়া হয়।
সভায় কমিটির একাধিক গণ্যমান্য সদস্য অভিযোগ আনেন, সময়মত কাজ না করায়, বাঁধের কাজে অনিয়ম, দুর্মুজ কম হওয়া এবং ঘাস না লাগানোয় কয়েকটি বাঁধ ভেঙে হাওরের ফসল তলিয়েছে। একারণে পুরো ব্যবস্থাপনা ও কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। যারা এমন গাফিলতি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার দাবি করেন সদস্যারা। পরে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়, বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়েছে এমন পিআইসিকে নতুন করে কোন বিল দেওয়া হবে না। জড়িত পিআইসি সভাপতি, সম্পাদক এবং সদস্যদের ভবিষ্যতে আর বাঁধের কাজে পিআইসিতে যুক্ত করা হবে না। তারা কালো তালিকাভুক্ত হয়ে থাকবেন।
গেল বছর জেলার দিরাইয়ের চাপতির হাওর রক্ষা বাঁধ (পিআইসি নম্বর ১৬), হুরামন্দিরা হাওর রক্ষা বাঁধ (পিআইসি নম্বর ৪২), ধর্মপাশার চন্দ্রসোনার তাল (পিআইসি নম্বর ৭৫), তাহিরপুরের গুরমার হাওর এক্সটেনসন (পিআইসি নম্বর ২৭), শাল্লার ছায়ার হাওর রক্ষা বাঁধ (পিআইসি নম্বর ৮১), জামালগঞ্জের হালির হাওর রক্ষা বাঁধ (পিআইসি নম্বর ১৭) ও তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওরের নজরখালি বাঁধ (পিআইসি নম্বর ২৪) ভেঙে হাওরের ফসল তলায়। এই সংবাদ জাতীয় গণমাধ্যমে প্রচার-প্রকাশ হওয়ায় দেশের মানুষের নজর ছিল সুনামগঞ্জের দিকে।
এই হাওরগুলোর মধ্যে আগেভাগে ভেঙে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে দিরাইয়ের চাপতির হাওরের। চাপতির হাওর রক্ষা বাঁধের (১৬ নম্বর পিআইসি) পিআইসির সভাপতি ছিলেন তাড়ল গ্রামের জাকারিয়া চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক একই গ্রামের কামরুল হাসান চৌধুরী। জাকারিয়া চৌধুরী স্থানীয় যুবলীগ নেতা জাহেদ চৌধুরী’র নিকট আত্মীয়। জাহেদ চৌধুরী নামে- বেনামে তিন পিআইসির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি নিজে ৮৩ নম্বর পিআইসির সভাপতি ছিলেন। অন্য পিআইসিগুলোর মধ্যে ১৬ ও ১৭ নম্বর পিআইসিতেও নেপথ্যে ব্যবসা ছিল তার।
স্থানীয় কৃষকরা বাঁধ ভাঙার পর অভিযোগ করেছিলেন, কাজে অনিয়ম হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই ভেঙেছে বাঁধ, ধানে তোড় আসার আগেই ডুবেছে চাপতির হাওর।
জাহেদ চৌধুরী অবশ্য মঙ্গলবার বিকালে এ প্রতিবেদকের কাছে দাবি করেছেন, একটি পিআইসি ছাড়া অন্য পিআইসিতে তার কোন সম্পৃক্তা নেই। জাকারিয়া চৌধুরী তার আত্মীয় হলেও ১৬ নম্বর পিআইসিতে তার কোন ব্যবসা নেই। যেহেতু হাওরে তার জমি আছে এজন্য হাওরের সকল বাঁধের কাজই দেখভাল করেন তিনি। ১৬ নম্বর পিআইসির বাঁধের কাজেও তিনি সহযোগিতা করেছেন। ওই বাঁধে শতভাগ কাজ হয়েছিল। তিন নম্বর কিস্তি পর্যন্ত বিল হয়েছিল দাবি করে তিনি বলেন, বাঁধের নীচের দিকে পুরোনো মাটিতে গর্ত ছিল। বাঁধের ভেতরের আগের মাটিতে বালুও ছিল। গর্তে পানি ঢুকে এক পর্যায়ে বড় গর্ত হয়ে বাঁধ ভেঙে যায়। এখানে পিআইসির কোন দোষ নেই দাবি তার।
ধর্মপাশার চন্দ্র সোনার তাল হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ ভাঙার পরও অভিযোগ ওঠে ওই বাঁধের কাজের পিআইসি সভাপতি মো. নুরুল হুদা’র বাঁধের পাশে হাওরে কোন জমিই নেই। একজন কৃষক বাঁধের কাজের অনিয়মের কথা এই বাঁধের ভাঙন অংশ পরিদর্শনের সময় পানি সম্পদ উপমন্ত্রীকেও জানান।
তাহিরপুরের গুরমা এক্সটেনসন বাঁধটি নদীর তীর ঘেঁষে দেওয়া হয়েছিল। বাঁধের স্থান আরও উপরে হওয়া জরুরি ছিল দাবি কৃষকদের। এই বাঁধে আশপাশের কৃষকদের সম্পৃক্ত না করে বহু দূরের কৃষকদের পিআইসিতে যুক্ত করার অভিযোগ ওঠেছিল।
শাল্লার ছায়ার হাওরের পিআইসি সভাপতি কৃপেন্দ্র দাস উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান অমিতা রানী দাসের ননদের জামাই, সেক্রেটারী দেবর। কৃপেন্দ্র দাস সিলেটে স্টুডিও ব্যবসা করেন। বাঁধ ঝুঁকিতে যখন পড়ে এলাকার কৃষকরা ফোন দিয়ে তাকে শাল্লায় এনেছিলেন। কিন্তু বাঁধ রক্ষায় গুরুত্ব দেননি তিনি।
দিরাইয়ের হুরা মন্দিরা হাওরের পিআইসি সভাপতি শেখ মো. মকসুদ আলী ও সেক্রেটারী মিরন কান্তি দাসসহ কমিটির বিরুদ্ধে বাঁধের কাজ করতে অবহেলা ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠেছিল।
জামালগঞ্জের হালির হাওরের বাঁধ ভাঙার পর সভাপতি মুহিবুর রহমান ও সদস্য সচিব খলিলুর রহমানসহ কমিটির লোকজনকে খুঁজে পাওয়া যায় নি। বাঁধের কাজ ঠিকঠাকভাবে না করায় বাঁধ ভেঙে ফসল তলানোর অভিযোগ করেন হাওরপাড়ের কৃষকরা।
তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওরের নজরখালী বাঁধ ‘ব্যবসার’ জন্য করা হয়েছিল বলে বাঁধ ভাঙার পর কৃষকরা তাৎক্ষণিক অভিযোগ করেছিলেন।
হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের বিগত সময়কার কাজের চূড়ান্ত মূল্যায়ন প্রতিবেদনের সভায় মঙ্গলবার এসব অভিযোগের কথা জানিয়ে কমিটির দুই জন সদস্য বাঁধ ভাঙার পরও পিআইসিদের বিল দেওয়া হলে ভবিষ্যতে বাঁধের ব্যবসা আরও বেড়ে যাবে বলে মন্তব্য করেন। ভবিষ্যতে বাঁধের কাজে ব্যাপকভাবে অনিয়ম হবে বলে জানান তারা।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেনও এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, কমিটির সকলে একমত থাকলে বাঁধ যেসব পিআইসির ভেঙেছে, তাদেরকে কালো তালিকাভুক্ত এবং তাদের আটকে থাকা বিল আর না দেবার সিদ্ধান্ত নিতে চাই। পরে সভায় উপস্থিত কমিটির সকল সদস্য এই বিষয়ে একমত পোষণ করেন। সভায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুই নির্বাহী প্রকৌশলী, জেলা পর্যায়ের অন্য কর্মকর্তাগণ এবং ১১ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাগণসহ জেলা কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, গেল বোরো মৌসুমে কয়েকটি বাঁধ ভাঙায় বাঁধের কাজ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বহু জায়গায় এজন্য জবাবদিহিতা করতে হয়েছে। যারা অনিয়ম করেছেন বা যাদের বাঁধের কাজে গাফিলতি ছিল হাওররক্ষা বাঁধের কাজে আর কখনোই তাদের যুক্ত করা হবে না। বাঁধের কাজের আর কোন বিলও তারা পাবে না। বাঁধের কাজের অনিয়মের বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে করা তদন্ত কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।

  • [১]