- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

৫২’র ভাষা আন্দোলনই স্বাধীনতার মূল মন্ত্র

অ্যাডভোকেট আলী-আমজাদ
১৯৪৭ সাল, অবিভক্ত ভারতে ইংরেজ রাজত্বের সমাপ্তিকাল এ অবস্থায় ইংরেজ সা¤্রাজ্যবাদের বিদায় এবং খন্ডিত ভারতে “পাকিস্তান” নামে একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের দুটি অংশ একটি হচ্ছে পূর্ববঙ্গ অপরটি হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তান। পাকিস্তানের জনসংখ্যার মধ্যে পূর্বঙ্গের জনসংখ্যা হলো ৫৬ ভাগ এবং মাতৃভাষা হলো বাংলা। এটাই হলো পাকিস্তানের বিভ্রাটের মূল কারণ। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী প্রথম থেকেই বাঙালির বিরুদ্ধে এক গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং বাঙালি জাতিকে দুর্বল করার লক্ষ্যেই বাংলা ভাষার উপর প্রথমেই আক্রমন করে।
১৯৪৭ এর শেষ দিকে করাচিতে তৎকালীন বাঙালি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুল হক উর্দুকেই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা হিসাবে স্থান পাওয়ার জন্য সুপারিশ করে কার্যকরি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানায়। আর তখন থেকেই বাঙালিরা মাতৃভাষার জন্য জেগে উঠে। শুরু হয় ভাষা রক্ষার আন্দোলন।
বাংলা ভাষা আন্দোলন দু’দফায় হয়েছিল। ১৯৪৮ সালে প্রথম ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়। ২য় টি হলো ১৯৫২ সালে। পাকিস্তান অর্জিত হওয়ার পর অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে “তমদ্দুন মজলিশ” নামে একটি সংগঠন বাংলা ভাষা রাষ্ট্র ভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সোচ্চার হয়ে উঠে। কিন্তু তাদের প্রভাব ছিলো খুব কম।
অধ্যাপক আবুল কাশেমের সম্পাদনায় ১৯৪৭ সাল ১৫ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্র ভাষা বাংলা না উর্দু এই শিরোনামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়। আলোচ্য পুস্তিকায় বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাহিত্যক জনাব আবুল মনসুর আহমেদ, ডক্টর মোতাহের হোসেনের রচিত দুইটি নিবন্ধ স্থান পায়।
১৯৪৮ সাল ২ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় ফজলুল হক হলে এক বৈঠকে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ হঠন করা হয়। সংগ্রাম পরিষদ গঠনে সেদিনের ছাত্রনেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা ছিলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংগ্রাম পরিষদে অন্যান্য যারা ছিলেন তাদের মধ্যে- ১. মো. তোয়াহা, ২. তাজউদ্দিন আহমদ, ৩. শহীদুল্লা কায়সার (শহীদ), ৪. শামছুল হক (আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক), ৫. অধ্যাপক আবুল কাশেম (তমুদ্দুন মজলিসের সাধারণ সম্পাদক), ৬. অজিত গুহ, ৭. রমেশ দাস গুপ্ত, ৮. নারী নেত্রী লিলি খান সহ আরা অনেকে। সংগ্রাম পরিষদ ১১ মার্চ ১৯৪৮ সাল সমগ্র দেশব্যাপী ধর্মঘট আহ্বান করে। ১৯৪৮ সাল ১৯ মার্চ পাকিস্তানের ¯্রষ্টা গভর্নর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ববঙ্গ সফরে আসেন। ১৯৪৮ সাল ২১ মার্চ ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে জনসভায় ভাষণ দান কালে বললেন যে, উর্দুই কেবলমাত্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। সঙ্গে সঙ্গে ছাত্ররা চিৎকার করে প্রতিবাদ জানালোÑ মানি না মানবো না। ২৪ মার্চ কার্জন হলে মি. জিন্নাহ সাহেব পুনরায় ঘোষণা করেনÑ পকিস্তানে উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। ছাত্ররা সিংহের মত গর্জন করে প্রতিবাদ জানায়Ñ না না না, মানি না, মানবো না।
কিন্তু পরক্ষণেই শামছুল হুদা চৌধুরী ও শাহ আজিজুর রহমানের নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের একটি ছাত্র প্রতিনিধি দল গভর্নর জেনারেল জিন্নাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলে যে, প্রকৃতপক্ষে ভাষা আন্দোলন যারা করেছে তারা রাষ্ট্রের শত্রু। মি. জিন্নাহ সাহেব এ বক্তব্যটি মনে প্রাণেই গ্রহণ করেন। কিন্তু জিন্নাহ সাহেব মৃত্যুবরণ করায় লিয়াকত আলী খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এভাবে ২০ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান পূর্ববঙ্গে এসে ময়মনসিংহের এক জনসভায় তিনিও ঘোষণা করেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা এবং আরো বলেন যে, যারা এর বিরোধিতা করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান পাকিস্তানের সংবিধান তৈরির খসড়া মূল নীতির বিরুদ্ধে পূর্ববঙ্গে আন্দোলন গড়ে উঠে। ঠিক সেই সময় প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ১৯৫১ সাল ৩ অক্টোবর রাউয়ালপিন্ডির এক জনসভায় আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। ১৯৫২ সাল ২৬ জানুয়ারি পরবর্তী নতুন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজীম উদ্দিন পূর্ববঙ্গে এসে ঢাকার পল্টন ময়দানে একইভাবে উচ্চারণ করেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। ১৯৫২ সাল ৩০ জানুয়ারি মৌলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর ডাকে ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ববঙ্গে হরতাল আহ্বান করা হয়। বঙ্গবন্ধু তখন কারাগারে বন্দী। সরকারি ঘোষণায় বলা হয় ২১ ফেব্রুয়ারি অনির্দিষ্টকালের জন্য ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হলো। ২১ ফেব্রুয়ারী রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশ অবস্থান নিতে থাকে। কিন্তু এই অবস্থায় ছাত্রদের মধ্যে মারাত্মকভাবে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। যা বিস্ফোরণ ঘটার জন্য শুধু কাঠখড় আর কেরোসিনের দরকার। দরকার ছিল আগুনের ফুলকি বা জ্বলন্ত দেশলাইয়ের কাটির ছোঁয়া। ছাত্রদের মনে জমে থাকা ক্ষোভ মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবে বলেই নিশ্চিত হলো।
বেলা ১২ টা থেকে ৩টা বেজে গেলো। নেতারা মধুর কেন্টিনে। হাজার কয়েক ছাত্রের জমায়েত। ছাত্ররা স্লোাগান দিতে থাকে রাষ্ট্রভাষা বাঙলা চাই চল চল এসেমব্লিতে চল। কারণ ঐ দিন বাজেট অধিবেশন বসার কথা। অনেক নেতারা আসেননি তাই কারো নির্দেশের অপেক্ষা না করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে এসেমব্লিতে যেতে চাইলে মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে পুলিশ বেপরোয়াভাবে ছাত্রদের উপর গুলি চালায়। একজন তরুণের মাথার উপর গুলি লেগে একেবারে মগজ ছিটকে পড়ে যায়। ছাত্ররা চিৎকার করে বলেছে স্ট্রেচার স্ট্রেচার। কিছুক্ষণের মধ্যেই রফিক, বরকত, সালামসহ আরো কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তখন শুধু ছাত্রদের চোখে জল আর কান্না।
২১- এর ঘটনাকে অমর করে রাখতে ঐ রাতেই রাজশাহীতে শহিদের স্মরণে সর্বপ্রথম শহিদমিনার তৈরি করা হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে যেখানে শহিদদের পবিত্র রক্ত ঝরেছে সেখানেই তাঁদের স্মরণে শহিদমিনার তৈরি করা হয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়েছেন। কখনও রাজপথে কখনও আত্মগোপনে আবার কখনও আপোষহীনভাবে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে তোলেন। এভাবে ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পূর্ববাংলায় গণহত্যা শুরু করে এবং সেই মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেওয়ার পরক্ষণেই গ্রেফতার হন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ৩০ লক্ষ তাজা প্রাণ আর ২ লক্ষ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে জাতির জনকের হৃদয় ভরা স্বপ্ন পূরণে বাংলার পবিত্র মাটিতে স্বাধীনতার পতাকা উড়তে থাকে। আমরা আজ আরো বেশি করে গর্ববোধ করি জাতির জনকের সুযোগ্য কন্যা বাংলার প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা জাতিসংঘের অধিবেশনে ভাষা আন্দোলনের কথা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করায় জাতিসংঘের স্বীকৃত লাভ করে। যার ফলে আজ বিশ্বব্যাপী আমাদের ৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের স্মারক স্বরূপ আন্তর্জাতিক দিবস হিসাবে পালিত হচ্ছে। তাই আমি বলে যেতে চাই-
সালাম, রফিক, জব্বার আর বরকতের রক্তে
আমাাদের চেতনা যেন আরো শাণিত হয়।
বাংলার রাজপথ যেনো স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করে
হৃদয় ভরা স্বপ্ন পূরণে- শহীদের সফলতা নিয়ে আসে।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী।

  • [১]