পুলক রাজ
সংগ্রামী পাঁচ জয়িতার সফল হওয়ার পেছনে রয়েছে অনেক দুঃখকষ্টের কাহিনি। কেউ শিক্ষা ও চাকরি, জননী নারী, নির্যাতন ও সমাজ উন্নয়নের ক্ষেত্রে নিজেকে স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখেছেন। তেমনি একজন অর্থনৈতিক ভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী মোছা. রোজিনা বেগম। ১৯৯৮ সালে বিয়ের পর জগন্নাথপুর থেকে আসেন স্বামীর বাড়ি দিরাই উপজেলার জগদল গ্রামে। বিয়ের পর স্বামী মো. আফজল মিয়ার সাথে সংসার করেন ৮ বছর। এরপর তিনি বিদেশে চলে যান। বিদেশ থেকে আসার পর মো. আফজাল মিয়া যৌতুকের জন্য রোজিনা বেগমকে নির্যাতন করতেন। নির্যাতন সহ্য না করতে পেরে একমাত্র পুত্র সন্তান আল মাহিকে নিয়ে আসেন বাবার বাড়ি। এরপরও নির্যাতন থেমে থাকেনি। শেষে রোজিনা বেগম স্বামীকে তালাক দেন। ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাস থেকে শুরু করেন আল মাহি ডেকোরেটার্স এন্ড সাজঘরের ব্যবসা। বর্তমানে আরো দুইটা শাখা করেছেন।
যাত্রী বর্মণ
নির্যাতনের বিভিষিকা মুছে ফেলে নতুন জীবন ক্যাটাগরিতে জয়িতা হয়েছেন যাত্রী বর্মণ। তিনি ছোট বেলায় বাবা রছেন্দ্র বর্মণকে হারিয়েছেন। অসহায় হয়ে পরেন তার মা সুবা রানী বর্মণ। তারা ছিলেন তিন বোন। সবার বড় বোন যাত্রী রানী। অন্যের বাসায় কাজ করতেন। কয়েক বছর বাসা কাজ করে সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়ে সংসারের হাল ধরেন যাত্রী রানী। দুই বোন বিয়ের উপযুক্ত হলে বিয়ে দেন। পরে সে রিক্সা চালক হৃদয় চন্দ্র দত্তকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন তিনি। নেমে আসে তার সংসারে অন্ধকার। এর মধ্যে তাদের সংসারে আসে এক ছেলে ও এক মেয়ে। এই সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা মাথায় তিনি অটোরিক্সা চালাতে শুরু করেন। সংসারের হাল ধরেন। মাইক্রোবাস চালানোও শিখেছেন।
লক্ষী রাণী দাস
সফল জননী ক্যাটাগরিতে জয়িতা হয়েছেন দিরাই উপজেলার মধুপুর গ্রামের মৃত উপেন্দু সাধু কল্যাণের স্ত্রী লক্ষী রাণী দাস। তার দুই ছেলে ও তিন মেয়ে আজ স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। বিয়ের কিছুদিন পর স্বামী হারা হওয়ার পরও নিজের প্রচেষ্টায় সংসারের হাল ধরেছেন, ছেলেমেয়েদেরকে সুশিক্ষিত করেছেন। বড় ছেলে নৃপেন্দ্র কুমার দাস সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ল্যান্স করপোরাল, মেঝো ছেলে উদ্ধব কুমার দাস খাদিম শিল্পনগরী সিলেটে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত, ছোট মেয়ে পুষ্প রানী রায় রাজবাড়ির বালিয়াকান্দির চামটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ।
নাসরিন আক্তার খানমে
শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্যে পেয়েছেন নাসরিন আক্তার খানম। জন্ম ১৯৬৭ সালের ৩১ জানুয়ারি দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার উজানিগাঁওয়ে। ১৯৯৩ সালে আব্দুর রকিবের সাথে বিয়ে হয়ে সদর ্্্্্্্্্্্্্উপজেলার ইব্রাহিমপুর গ্রামে স্বামীর সংসারে আসেন। মহিলা পরিষদ, মহিলা কল্যণ কেন্দ্র সহ বিভিন্ন সংগঠনের সাথে জড়িত আছেন। এরই মধ্যে বই প্রকাশিত হয়েছে। কবিতার বই ‘নীল প্রজাপতি ও খসে যাওয়া তাঁরা’ ও ‘নীলগিরি যাব আমি’ এবং একটি গল্পের বই ‘মনি চলে যাব আমি’। ২০০১ সাল থেকে শহর বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। কর্মের সাফল্যের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি পাবলিক সার্ভিস পদকও পেয়েছেন ।
ফরিদা পারভীন
সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার সম্মাননা পেয়েছেন জয়িতা মোছা. ফরিদা পারভীন। ছাত্র জীবন থেকে বিভিন্ন নারী সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন তিনি। ‘রজনী গন্ধা মহিলা পল্লী সমাজ কেন্দ্র’ নামে তার একটা নারী সংগঠন আছে। ২০০৬ থেকে তৃণমূল নারীদেরকে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে এই সংগঠন। নারী নির্যাতন, বাল্য বিবাহ ও যৌতুকের বিরুদ্ধে কাজ করছেন তিনি। সুনামগঞ্জ পৌরসভার প্রয়াত মেয়র আয়ূব বখত্ জগলুুল থাকাকালীন রজনী গন্ধা মহিলা পল্লী সমাজ কেন্দ্রে’ ২১ লক্ষ টাকা অনুদান দেন। এই টাকা দিয়ে ২টি সড়ক, ১টি ড্রেন, ২১টি নলকূপ, ২৩ টি গণশৌচাগার করে দিয়েছেন। প্রতি বছর ফ্রি জন্ম নিবন্ধন করিয়ে দেন প্রায় ৭০ জন থেকে ৮০ জন নারীকে।