বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
রক্তি সেতুর পশ্চিম পারে একটি পরিত্যক্ত বিল্ডিংয়ের ওয়াল টপকে সেতুতে উঠছিলেন মো. আলী নূর নামের এক মধ্যবয়সী। সেতুর ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে জামালগঞ্জের সাচনা বাজার ইউনিয়নের সুজাতপুর গ্রামের এই বাসিন্দা বললেন, ‘ব্রিজের কাজটা না হওয়ায় যাইতে আইতে খুব কষ্ট হয়। এই কাজটা নগদ হওয়া দরকার, কিন্তু হইতাছে না। এই রাস্তা দিয়ে শুধু আমরার ইউনিয়নের মানুষই না, টুবঘাট এলাকার যতটি গ্রাম আছে সব গ্রামের মানুষই কমবেশি আসা-যাওয়া করে। এ ব্রিজের কাজ কবে শুরু হইছে আর কবে শেষ হইব এইডা কেউ কইতে পারতো না।’
জামালগঞ্জে রক্তি নদীর ওপর নির্মীয়মাণ সেতুর কাজ শুরুর দীর্ঘপ্রায় ৯ বছর পার হয়েছে। এখনও চলছে এপ্রোচ তৈরির কাজ। শুরুর ৯ বছরে সেতুটি চলাচল উপযোগী না হওয়ায় জনমনে ক্ষোভ আছে। খেয়া পারাপারে বিলম্ব হওয়ায় এর অপেক্ষা না করে অর্ধনির্মিত এপ্রোচ ডিঙিয়েই ঝুঁকি নিয়ে সেতু পার হচ্ছে হাজারো মানুষ। কবে নাগাদ এ ভোগান্তি দূর হবে সে কথা বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন রক্তি পারের মানুষেরা। অবশ্য দুই মাসের মধ্যে সেতুটি যাতায়াতের উপযোগী করে তোলা হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় এলজিইডি।
এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালে এ ব্রিজের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ৪ কোটি ৮১ লাখ ৫৪ হাজার ৩৬১ টাকা ব্যয়ে মূল সেতুর কাজ শেষ হয়েছে ২০১৮ সালে। ৭২ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৭.৮ মিটার প্রস্থের এ ব্রিজের কাজ সমাপ্ত করে কাজী নাছিম উদ্দিন অ্যান্ড হাজী সাদেক আলী সন্স নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। পরবর্তীতে এপ্রোচ নির্মাণের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয় নেত্রকোণার বাছিত প্রকৌশলী নামের আরেকটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে। ব্যয় ধরা হয় ৮ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে মূল সেতুর কাজ শেষ হয়ে পেরিয়ে গেছে আরও প্রায় ৫ বছর। কিন্তু কাজের কাজ এখনও হয় নি।
শনিবার সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মন্থর গতিতে এগুচ্ছে রক্তি সেতুর এপ্রোচ তৈরির কাজ। যতটুকু হয়েছে তাতে গাছাড়া ভাব লক্ষ্য করা গেছে। সেতুর পশ্চিম পারের দুর্লভপুর অংশে এপ্রোচের কাজ প্রায় শেষপর্যায়ে থাকলেও পূর্ব পারের ফাজিলপুর অংশের কাজ এখনও অনেক বাকি এ অংশে চলাচলকারী নারী-পুরুষ অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে বাঁশের খাড়া আড় বেয়েই মূল সেতুতে উঠানামা করছেন। অপর পাড়ে আধানির্মিত বেষ্টনি ডিঙিয়ে মার্কেটের একটি পরিত্যক্ত সিঁড়ি বেয়ে পথচারীরা সেতু পারাপার হচ্ছেন। খেয়া পারাপারে অতি বিলম্বের কারণে মানুষ দ্রুত যাতায়াতে এ ঝুঁকি নিচ্ছেন। দুই পারে এপ্রোচ তৈরির নির্মাণ সামগ্রী পড়ে থাকতে দেখা গেলেও কোন নির্র্মাণ শ্রমিককে কাজ করতে দেখা যায়নি।
জানা যায়, উপজেলার সাচনা বাজার ইউনিয়নকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে সুরমার শাখা নদী রক্তি। যাতায়াতের সুবিধার্থে এ নদীর উপর একটি সেতু নির্মাণের দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। ২০১৪ সালে যখন সেখানে সেতু নির্মাণ কাজ শুরু হয় তখন দুই পারের ৫০ গ্রামের মানুষ আশায় বুক বাঁধতে থাকেন। বিশেষ করে রক্তি পূর্ব পারের যোগাযোগ বিড়ম্বনা দূর হবার স্বপ্ন দেখেন।
সরজমিনে দুর্লভপুর খেয়াঘাটে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, খেয়া নৌকাটি সেতুর একপার থেকে আরেক পার হয়ে সুরমার অপর পার ঘাগটিয়া থেকে নির্ধারিত গন্তব্যে ফিরতে সময় লাগে প্রায় ৩০ মিনিটের মতো। তখন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় যাত্রীদের। জনভোগান্তির কথা চিন্তা করে রক্তির উপর সেতু নির্মাণ কাজে হাত দেয় সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। কিন্তু নির্মাণ কাজ শুরুর প্রায় ৯ বছর অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত সেতুটি চালু না হওয়ায় স্থানীয় লোকজনের ক্ষোভ আছে।
সেতুসংলগ্ন দোকানে বসা ফার্মেসী ব্যবসায়ী মো. শামসুল আলম আখঞ্জীর সাথে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। দুর্লভপুর গ্রামের এই বাসিন্দা জানিয়েছেন, ‘এতদিন বাইরে ছিলাম। বাড়িতে আসছি পাঁচ বছর হয়েছে। প্রথমে আইসা শুধু ব্রিজটা দেখছিলাম। স্লোভের কাজ প্রায় দুই বছর ধরে চলমান আছে। কিন্তু শেষ হওয়ার কোন আলামত দেখছি না।’
এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ও সাচনা বাজার ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান রেজাউল করিম শামীম বলেন, রক্তি দুই পারের মানুষের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি সেতু। এর নির্মাণ কাজে দীর্ঘসূত্রিতা থাকায় জনমনে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে এটা সত্য। এলজিইডির অবহেলার কারণে দূর্লভপুর সেতুর কাজ পিছিয়েছে।
উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আনিসুর রহমান বলেন, নীচে পানি থাকলে স্লোভের কাজ দেরি হয়। বন্যা থাকায় কাজটা পিছিয়েছে। এখন একটা স্লোভের কাজ বাকি আছে। এটা এ মাসেই ঢালাই হয়ে যাবে। এরপর সামনের মাসে এপ্রোচের কিছু কাজ বাকি আছে সেগুলো করা হবে। আশা করি আগামী দুই মাসের মধ্যেই কাজ সমাপ্ত হবে।