- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

মুক্তমত-বাঁধরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ

আবিদ খান হৃদয়
‘মৎস্য-পাথর-ধান, সুনামগঞ্জের প্রাণ।’ বাংলাদেশের সপ্তম বৃহত্তম জেলা সুনামগঞ্জ। হাওর বিধৌত ৩,৬৭০বর্গ কি.মি. আয়তনের এ জেলায় ছোট, বড়, মাঝারি মিলিয়ে মোট ৩৭ টি হাওর আছে। তার মধ্যে জাতিসংঘের ইউনেস্কো ঘোষিত ১০৩১এম ‘ওয়ার্ল্ড হেরিডেজ’ ‘টাঙ্গুয়ার হাওর’ এর অবস্থানও এখানে। হাওর নিয়ে আমাদের যেমন নিজেস্ব চিন্তা, চেতনা আর দর্শন আছে, আছে আমাদের সংস্কৃতির বেড়ে উঠা তেমনিভাবে আমাদের এই হাওরের বাঁধ রক্ষার জন্য যেসকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত সেইসব উচিত কাজগুলোর সাথে যখন অনুচিত কাজ করা হয় তখন তা আমাদের সকল ঐতিহ্য আর সৌন্দর্যকে বিলিন করে আমাদের কৃষকদের আহাজারির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সুনামগঞ্জের হাওরে পানি ঢুকে তলিয়ে গেছে ফসল, আহাজারিতে বুক ভাসাচ্ছে আমাদের কৃষক ভাইরা। যাদের গাফিলতির কারণে এমন সব দৃশ্যপট  তাদের শাস্তি হবে কিনা তা দেখার অপেক্ষা।  যেহেতু সুনামগঞ্জ হাওর বেষ্টিত জেলা সেহেতু এইরকম সমস্যার মোকাবেলা আমাদের প্রতি বছর-ই করতে হচ্ছে। এখন সময় আসলে ঢেলে সাজানোর, দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা আমাদের গ্রহণ করতে হবে। ২ ফেব্রুয়ারী ১৯৭২ সালে ইরানের রামসার শহরে Convention on Wetlands of Int’l Important Especially as Waterfowl Habitat, ১৯৭২ সম্মেলনে পৃথিবীর জলাভূমি বিষয়ে আন্তর্জাতিক সনদ তৈরী হয়। রামসার এবং আন্তর্জাতিক প্রাণ বৈচিত্র সনদে          
বাংলাদেশ স্বাক্ষর করে। উল্লেখ্য এতে ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ স্বাক্ষর ও অনুমোদন রয়েছে। যা টিপাইমুখ প্রসঙ্গে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে কার্যকরী করা যায়। আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র সনদের (Convention on Biological Diversity) CBD, ১৯৯২ ১৪নং অনুচ্ছেদের ‘ঘ’ ধারায় স্পষ্ট করে উল্লেখ আছে, ‘চুক্তিবদ্ধ পক্ষরাষ্ট্রের আওতাধীন বা নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় সৃষ্ট কোনো কারণে যদি অন্য কোনো রাষ্ট্রের প্রাণ বৈচিত্র্যের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ে তবে সম্ভাব্য ক্ষতির শিকার সে রাষ্ট্রকে তা অভিহিত করতে হবে এবং ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে’। এছাড়াও রামসার সনদের ৫নং অনুচ্ছেদ উল্লেখ আছে, চুক্তিবদ্ধ পক্ষ রাষ্ট্রসমূহ রামসার সম্মেলন থেকে উদ্ভুত দায়-দায়িত্ব বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যা একাধিক রাষ্ট্রের ভৌগলিক সীমানা জুড়ে বিস্তৃত এবং যেসব জলপ্রণালী এক বা একাধিক রাষ্ট্র ব্যবহার করে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রগুলো জলাভূমি এবং জলাভূমির উদ্ভিদ ও প্রাণীকূল সংরক্ষণের জন্য বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নীতিমালা ও বিধান বাস্তবায়ন করবে। আন্তর্জাতিক ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় এসব চুক্তি ও সনদের গুরুত্ব উপেক্ষা করে যদি আগ্রাসী মনোভাবের প্রতিবেশী রাষ্ট্র সুরমা উপত্যকার মানুষের অস্তিত্বকে বিপন্ন করতে উদ্যত হয় তবে অস্তিত্ব রক্ষায় কঠিন সংগ্রামের দৃপ্ত প্রত্যয়ই কেবল রুখে দাড়াতে পারে সব অপতৎপরতা। এখন আমাদের হাওর রক্ষায় অবশ্য করণীয় সিদ্ধান্ত এবং সেগুলো বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে। যেসকল সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সেগুলো হচ্ছে
১। হাওর এলাকায় প্রাণ প্রবাহ হিসেবে চিহ্নিত নদী খনন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা।
২। বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত পরামর্শে বাঁধ নির্মাণ ও প্রয়োজনবোধে উঁচু করতে হবে;
৩। মিঠা পানির মৎস্য সম্পদ (অনেক বিলুপ্ত প্রায় মাছ ও জলজ সম্পদ) রক্ষার্থে হাওরে বিলগুলোর সরকারি ইজারা পদ্ধতি সংস্কার করতে হবে;
৪। পানি উন্নয়ন বোর্ড এর অসাধু কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও গাফিলতি বন্ধ করতে হবে।
৫। হাওর এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন বৃদ্ধি ও সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর পরিধি বাড়াতে হবে;
৬। অবিলম্বে হাওর উন্নয়ন বোর্ড সক্রিয় করতে হবে। যেখানে হাওরের মানুষ ও জনপ্রতিনিধিদের যোগ্য নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ থাকবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে এইসব সিদ্ধাতের অগ্রগতি সাধন করতে হবে তাতে করে এই ফসলরক্ষা বাঁধ নিয়ে চিন্তার কিছুটা হলেও সমাপ্তি ঘটবে। কৃষকদের ও সচেতন হতে হবে এইসকল বিষয়ে। দুর্নীতির প্রভাবকে পিছনে ফেলে পরবর্তী বছরের কথা চিন্তা করে এখন থেকেই কাজ শুরু করতে হবে। এই হাওর বাঁধ নির্মাণ বা রক্ষার দায়িতে সংশ্লিষ্ট সকলকে।
লেখক: সংস্কৃতিকর্মী ও সংগঠক, সুনামগঞ্জ প্রসেনিয়াম।

  • [১]