- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

সালেহ চৌধুরী ও সুনামগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনার তাৎপর্য

ইকবাল কাগজী
গত ০১ সেপ্টেম্বর মুক্তিযোদ্ধা সালেহ চৌধুরীর জীবনাবসান ঘটেছে। সান্তনা এই যে, পরিণত বয়সে তাঁর এই জীবনাবসানের ঘটনাটি ঘটেছে। তাঁর চেয়ে বড় সান্তনা, জীবনসায়াহ্নের দিনগুলি তাঁর অথর্বতার পালঙ্কে শুয়ে অতিবাহিত হয়নি, এক অন্যরকম জীবনের দিকে তিনি টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন  নিজেকে। যে-অন্যরকম জীবনে মুক্তিযোদ্ধার কার্যকর বীরত্ব প্রদর্শনে একেবারে আক্ষরিক অর্থেই নিমগ্ন ও ভীষণ ব্যাপৃত ছিলেন তিনি। সে-জীবন আর এক অন্যরকম কঠিন-কঠোর যুদ্ধের জীবন, জীবন যেমন ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রাণপণ যুদ্ধের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত তেমনি। যতদূর জানা যায় নয়, অনুমান করা যায়, এমনি ছিল তাঁর জীবনসায়াহ্নের ক্ষয়িষ্ণু দিনগুলি। একটু ভেবে নিয়ে বললে বলতে হয়, এমনি কর্মময় হওয়া চাই একজন মুক্তিযোদ্ধার জীবন কিংবা মুক্তিযোদ্ধার জীবনের শেষ ক’টা দিন, যে দিনগুলোতে তিনি লিখেছিলেন, ‘ভাটি এলাকার মুক্তিযুদ্ধ : আমার অহংকার’। এ বইটি তাঁর যুদ্ধদিনের স্মৃতিকথা। দিরাই-শাল্লা কেন্দ্রিক ভাটি অঞ্চলের জলজঙ্গলে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন তিনি। সেই যুদ্ধকালের অকপট কথকতা তাঁর এই বই। বইটি পড়ে কেউ যদি কবিত্ব করে বলেই ফেলেন, ‘ভাটির যুদ্ধের কথা অমৃত সমান, সালেহ চৌধুরী ভনে শুনে পূন্যবান’, তবে বোধ করি মন্দ হয় না।
সালেহ চৌধুরী মৃত্যুর আগে কী করেছেন তার মূল্যায়ন করার আগে বাঙলাদেশের ইতিহাস ইতোমধ্যে কী হয়েছে তার একটা পর্যালোচনা দরকার, তা না হলে সালেহ চৌধুরীর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চার তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করার বিষয়টি ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থেকে যাবে। জানা কথা, স্বাধীনতার দীর্ঘ সাড়ে চার দশকের ভেতরে এই দেশে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী অনেক ঘটনা ঘটেছে। সে-সব ঘটনা প্রত্যক্ষ করে কবি শামসুর রাহমান বলেছিলেন, ‘উদ্ভট উটের পীঠে চলেছে স্বদেশ’। কারও কারও লেখায় দেশ ও রাষ্ট্রক্ষমতায় স্বাধীনতাবিরোধীদের আধিপত্যের জ্বলন্ত ও দ্রোহী বিবরণ মেলে। মোটাদাগে কয়েকটি উদাহরণ উদ্ধৃত করা যাক। যেমন স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যে রাষ্ট্রস্থপতিকে হত্যা করা হয়েছে, সংবিধানের অভিমুখ প্রগতিশীলতা থেকে প্রতিক্রিয়াশীলতার দিকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে, স্বাধীনতাবিরোধীরা রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিনাশ করে বাংলাদেশকে আর একটি ‘মিনি পাকিস্তান’ বানাবার প্রচেষ্টা ও ষড়যন্ত্র এখনও বহালতবিয়তে অব্যাহত আছে, সংবিধানের মৌলিক চেতনাবিরোধী মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের বিস্তার অব্যাহত আছে। একজন হুমায়ুন আজাদ বলেছেন, ‘১৯৭৫-এর নভেম্বর থেকে ১৯৮১-এর ৩০ মে পর্যন্ত, সাড়ে ৫ বছরে, তিনি (জিয়াউর রহমান) বাঙলাদেশের মুখটিকে পিছনের দিকে ফিরিয়ে দিয়ে গেছেন। তিনি দেশটিকে প্রতিক্রিয়াশীলতায় দীক্ষিত করেছেন। বাঙলাদেশে এখনও চলছে পিছনের দিকেই, প্রতিক্রিয়াশীলতার ভেতর দিয়েই।’ (আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম, আগামী প্রকাশনী, ৩য় মুদ্রণ : ২০০৪, পৃষ্ঠা : ৭৮)। এই বর্ণনাটি সত্যিকার অর্থেই ভয়ঙ্কর, যে ভয়ঙ্করতা সিন্দবাদের দৈত্যের মতো বাঙলাদেশের ঘাড়ে চেপে বসে আছে, সময় পেরিয়ে গেছে চার দশক, নামনো যাচ্ছে না।  
বাংলাদেশের বর্তমান ভাবমূর্তিকে বর্ণনা করা যায় কীভাবে? তার একটি সহজ কৌশল হলো কতিপয় শব্দকে হাজির করা।  শব্দগুলো হতে পারে এরকম : সংবিধানধর্ষণ, সততাহরণ, স্বৈরাচার, অগণতান্ত্রিকতা, অমানবিকতা, হত্যা, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, গুম, অযৌক্তিকতা, দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাতন্ত্র,  বিজ্ঞানমনষ্ককতাহীনতা, নিরাপত্তহীনতা, সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ, বর্বরতা, ধর্মান্ধতা, মিথ্যাচার, প্রতারণা, দুর্নীতি, ঘুষ, কপটতা, পরিবারতন্ত্র, স্তাবকতা, হিং¯্রতা, দলবাজি, দলীয়করণ, রাজনীতিক পৃষ্ঠপোষকতা, ব্যাংক লুট, অর্থ পাচার, চাঁদাবাজী, দখল, ইতিহাস বিকৃতি, বিচারহীনতা, চোরাচালান, নারীপাচার, ইয়াবাবাণিজ্য ইত্যাদি। এইসব শব্দ যে-সামাজিক বাস্তবতাকে প্রকাশ করে সালেহ চৌধুরীর জীবিতাবস্থায় বাঙলাদেশের সমাজে এইসবই বাস্তবতা পেয়েছে হয়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
এ ছাড়া প্রসঙ্গক্রমে ক’য়েকটি অন্যরকম ও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কার্যকর মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ষড়যন্ত্রের বাস্তব উদাহরণ দেওয়া বোধ করি অসঙ্গত হবে না। তাতে বোঝা যাবে সারা দেশে কতোটা কী হয়েছে, তার পরিসরটা কতোটা ব্যাপক। তাছাড়া, এই উদাহরণগুলি যদিও ছোটখাটো ও মামুলী ধরনের কিন্তু সেগুলি প্রকৃতপ্রস্তাবে তাৎপর্যে বিশাল এই জন্য যে, দৃষ্টান্তগুলি  প্রমাণ করে মুক্তিযুদ্ধের দ্বারা অর্জিত দেশে মুক্তিযুদ্ধের চর্চাকে কতোটা বিপদশঙ্কুল করে তোলা হয়েছে এবং বোধ করি সেটা বাঙলাদেশের মতো দেশেই কেবলমাত্র সম্ভব হতে পারে। কারণ এখানে সাধারণ মানুষকে এখনও জাতিগত আত্মপরিচয়ের সঙ্কটের মধ্যে ফেলে রাখা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে জড়িয়ে রেখে এবং জনমনে অযৌক্তিক মতান্ধতার বিস্তার ব্যাপক ও সুগভীর করে তোলা হচ্ছে এবং প্রকৃত জীবনমুখী  শিক্ষা ও ইতিহাস চেতনার বিস্তার মানুষের মধ্যে অতিমাত্রায় কম এবং তার বিপরীতে এখানকার কীছু স্বার্থান্বেষী প্রতিক্রিয়াশীল মানুষ বোঝতে অক্ষম যে, বেরিয়ে পড়া বাচ্চাকে আর পূর্বপথে মাতৃগর্ভে ফেরত পাঠানো যায় না, তেমনি বাঙলাদেশকেও আর পাকিস্তান বানানো যাবে না।
উদাহারণের কথা বলছিলাম। বলা বাহুল্য উদাহরণগুলি সুনামগঞ্জের। যেমন  ৭৫-য়ের পটপরিবর্তনের পর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাঠাগারের নাম পাল্টে ফের সুনামগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরি করা হয়েছিল, রাজাকারদের তালিকা তৈরির প্রয়াস চালানোর কারণে একজন অধ্যাপক হুমকির সম্মুখিন হয়ে কাজে বিরত থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন, জামালগঞ্জে  একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম ‘জিন্নাহ মেমোরিয়েল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়’ অপরিবর্তিত থেকে গেছে (শিক্ষাক্ষেত্রে অধিষ্ঠিত আমলাতন্ত্র এটিকে এতো দিন সহ্য করেছে বোধ করি এজন্য যে, সেটা পাকিস্তানি জন্মদোষ মুক্ত হতে পারেনি) স্বাধীনতার সাড়ে চার দশক পরেও, অথবা দুঃস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের কোনও খোঁজ রাখেনি রাষ্ট্র, এমনকি একাত্তরে সৃষ্ট বধ্যভূমিগুলোকে সংরক্ষণ করা হয়নি। অর্থাৎ সমগ্র দেশে অবস্থাটা এমন করে তোলা হয়েছিল যে, মুক্তিযুদ্ধচর্চার কোনও পরিবেশ আদৌ বজায় থাকেনি, এক অর্থে যাকে বলা যায়, বিভিন্ন কূটকৌশলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কবর রচনার রাজনীতিক সংস্কৃতির চর্চার ব্যাপক বিস্তার বা  পৃষ্ঠপোষকতার বিস্তৃতি ঘটেছিল, সারা দেশে, ব্যাপকাকারে। হুমায়ুন আজাদ বলেছেন, ‘জিয়ার এমন অসামান্য প্রতিভা ছিলো যে তিনি রাজকারদের মুক্তিযোদ্ধা ক’রে তোলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের রাজাকার ক’রে তোলেন।’      
 ১৯৭১-য়ে তৎকালের পূর্বপাকিস্তানে আমরা বাঙালিরা ছিলাম সাড়ে সাত কোটি। সেকালে মুক্তিযুদ্ধ করে আমরা প্রতিষ্ঠা করেছিলাম ভারতীয় উপমহাদেশের একমাত্র জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে বিপুল জনস্ফীতি ঘটেছে। বাড়তে বাড়তে এখন হয়েছি সতেরো কোটিরও অধিক। কোনও কোনও বিশেষজ্ঞ’র ধারনা, আগামী দশক পেরোতে না পেরোতে  সে সংখ্যা দাঁড়াতে পারে ত্রিশ কোটিরও বেশি। বলা হচ্ছে দেশ মধ্য-আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে, সেটা দেশের কতিপয় ধনী মানুষের জন্য সত্য হলেও দেশের সকল সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে সত্য নয় কীছুতেই। এই সত্য উপলব্ধি করতে অর্থনীতিবিদ হতে হয় না। কিন্তু বর্তমানে দেশের আর্থসামজিক অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, সতেরো কোটির এই বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন কেবল শেষ হয়ে যায় উদরপূজারী পেটুকদাসসুলভ ও বংশগতি রক্ষার সঙ্গে নিমগ্ন থেকে নারীগর্ভে বীজবপনের নিতান্ত জৈবিক চর্চায় এবং যে-জৈবিকতাকে সিংহভাগক্ষেত্রে বেঁচে থাকার জন্য খাওয়া আর নিরন্তর ধর্ষণ বলাই সঙ্গত, প্রকৃতপ্রস্তাবে জীবনের জন্য যার কোনও প্রয়োজনই  নেই। এইরকম অর্থহীন আত্মপরতায় নিমগ্নতাকে জীবনের উপজীব্য করে বংশবিস্তারে ব্রতী মানবজন্মযাপনের উর্ধ্বে আর কোনও উদ্দেশ্য নেই এই দেশের সাধারণ মানুষের, এভাবে যদি বলি বা অনেকটা আহাম্মকের মতো হিম্মৎ দেখিয়ে বলেই ফেলি, তা হলে বোধ করি একেবারে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাওয়ার মতো কোনও কীছু একটা করে ফেলা হবে না। বর্তমান আর্থমাসাজিক ব্যবস্থাধীনে সমাজের সিংহভাগ মানুষের অবস্থা এমন যে, সাধারণ মানুষের অধঃস্তন অবস্থাটা দেখে সঙ্গত কারণেই ভাবা যেতে পারে যে, প্রকৃতপ্রস্তাবে বিদ্যমান আর্থনীতিক ব্যবস্থার পরিসরে মানুষকে যে-জীবনচর্চায় দীক্ষিত ও প্রকারান্তরে বাধ্য করা হয়েছে, তাতে মানুষ ‘যাবৎজীবেৎ সুখংজীবেৎ ঋণাংকৃত্যা ঘৃত্যাপিবেৎ  …’-য়ের স্থ’ূলাদর্শে আদর্শায়িত চার্বাকপন্থী’র বেশি কীছু হতে পারে না বা পারছে না, কোনওভাবেই। সামগ্রিক আর্থব্যবস্থার বাস্তব অবস্থাটা এমন যে, এর কোনও অন্যথা কিংবা বিকল্প হতেই পারে না। অর্থাৎ ‘খেয়ে পরে বেঁচে বর্তে থাকা আর সন্তান উৎপাদন’ এই আদর্শের বাইরে কোনও জীবনাদর্শ নেই, এই অর্থহীন জীবনযাপনই সমাজের সিংহভাগ অধঃস্তন মানুষের একমাত্র ভবিতব্য। স্বাধীনতা অর্জনের সাড়ে চার দশক পেরিয়ে যাবার পরও এখানে স্বাধীনতাকে প্রকৃতপ্রস্তাবে অর্থবহ করে তোলা যায়নি। মানুষের জীবন এখানে এতটাই স্থ’ূল ও অর্থহীন হয়ে উঠেছে যে, একজন উচ্চশিক্ষিত সচিব অবলীলায় বলে ফেলেন, অর্ধেকজনসংখ্যা মারা না গেলে এই দেশের এক কোণের সুনামগঞ্জ জেলাকে দুর্গত ঘোষণা করা যাবে না, যেখানে মাত্র ক’দিন আগে সমুদয় ফসলহানির পরে প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষের একবেলার খাদ্যের কোনওরূপ সংস্থান নেই। তিনি এ কথা বলছিলেন, জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে বসে। ভাবনার বিষয় এই যে, স্বাধীনতা অর্জনের সাড়ে চার দশক পরও এ দেশে ব্রিটিশামলের আমলার কোনও পরিবর্তন হলো না, সংবিধানানুসারে রাষ্ট্রের মালিক জনগণকে আমলা এখনও  চূড়ান্তভাবে তাচ্ছিল্য করার সাহস দেখিয়ে প্রকারান্তরে সংবিধানকেই পদদলিত করে। অথচ ইতোমধ্যে এই আমলাদের বেতন বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, জানা কথা, যে বেতন জনগণের পকেট থেকেই দেওয়া হবে।  আর এই রাষ্ট্রসীমার মধ্যেই বেঁচে ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সালেহ চৌধুরী, যিনি বাঙালি জাতির জন্য একটি সংবিধান রচনার পথের প্রতিবন্ধকতাকে উৎখাত করেছিলেন হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র যুদ্ধে প্রাণপণ লড়ে, দেশকে স্বাধীন করার মহান ও বীরত্বপূর্ণ কাজে অংশ নিয়ে। তারপর তিনি আর কী করতে পারতেন? উত্তর দিয়েছেন তিনি মুক্তিযুদ্ধের উপর বই লিখে।   
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা একটি বই, হতে পারে তা নিতান্ত সাধারণ মানের, সেটা নাই বা হলো অসাধারণ শিল্পসুষমাম-িত, তাতে কীছু যায় আসে না। মুক্তিযুদ্ধের বইয়ের প্রধান সুষমা মুক্তিযুদ্ধ, এর চেয়ে বড় কোনও শিল্প নেই। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা বইয়ের একটা আলাদা রাজনীতিক-দার্শনিক তাৎপর্য  আছে, সেটা জাতীয়মুক্তির পথে অভিযাত্রী যে-কোনও জাতির জন্য অবশ্যই জরুরিভাবে প্রণিধাণযোগ্য, সে কথা ভুলে গেলে চলবে না। বিষয়টি  আরও খোলাসা করে নয় বরং সাদামাটাভাবে বললে বলতে হয়, খাওয়া-পরা ছাড়াও কোনও কোনও মানুষ কোনও কোনও ক্ষেত্রে বিরাট বিরাট  কাজ করেন। আর সে-সব কাজ হলো, গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে জাতির উন্নতির জন্য কিংবা উত্তরসূরিদের জাতীয় জীবনে সুখসমৃদ্ধি অর্জনে পথনির্দেশিকার কাজ করে এমন কোনও একটা কীছু করা। সালেহ চৌধুরী সেটা করেছেন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, যে-যুদ্ধে তিনি সশরীরে অংশ নিয়েছিলে, তাঁর নিজের মতো করে একটি বই লিখে।
তিনি জানতেন, ইতোমধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত অর্জন বাঙলাদেশ বলতে গেলে নষ্টদের দখলে চলে গেছে। তারা দেশটিকে কতোটা নষ্ট করেছে তার বর্ণনা মেলে কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহর উচ্চারণে। তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতাÑ এ কি তবে নষ্ট জন্ম?/ এ কি তবে পিতাহীন জননীর লজ্জার ফসল!/ জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরনো শকুন।/ বাতাসে লাশের গন্ধÑ/ নিয়ন আলোয় তবু নর্তকীর দেহে দোলে মাংসের তুফান।’ এমন নষ্টদের অধিকৃত স্বদেশে বসে তিনি উপলব্ধি করেন যে, এই নষ্টদের বিরুদ্ধে একট কীছু করা দরকার, যা তাঁর উত্তরসূরিদেরকে এই নষ্টদের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি ও সাহস যোগাবে। অন্তরের গহীন থেকে একটা তাগিদ তিনি অনুভব করেছেন এবং উজ্জীবিত হয়েছেন। একটা কীছু করার কাজটা আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা অনেকেই  করে যেতে পারেননি, অথচ কেউ কেউ মৃত্যুর আগে সেটি করে যেতে পারতেন। তাতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সমৃদ্ধ হতো কেবল নয়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে মুছে ফেলার ও সচেতনভাবে বিকৃত করে দিয়ে জাতিকে বিভ্রান্তির বেড়াজালে বন্দি করার যে সাম্প্রতিক ষড়যন্ত্র  পরিলক্ষিত হয় সেটাকেও প্রতিরোধ করা যেতো।
সাধারণ মানুষের জীবনের গতানুগতিকতার বাইরে কোনও কাজে সাধারণত কেবল আমাদের দেশে নয়, বোধ করি পৃথিবীর সকল দেশেই, বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষকে নিরত হতে দেখা যায় না। তাঁরা সকলেই শেক্সপিয়র কিংবা রবীন্দ্রনাথ অথবা মাও কিংবা মুজিব অথবা চে গুয়েভারা কিংবা ক্যাস্ট্রো হয়ে উঠেন না, সাধারণের মধ্যে যাঁরা ব্যতিক্রম, তাঁরা ব্যতীত। সাধারণ মানুষদের মধ্য থেকে এইরূপ ব্যতিক্রমী অসাধারণ মানুষরাই জাতি ও জাতির সংস্কৃতির নির্মাতা। জাতিকে সময়ের সঙ্গে উন্নতির চূড়ায় বহন করে নিয়ে যাওয়ার ভার বহন করেন তাঁরাই। সালেহ চৌধুরী সাধারণ মানুষদের একজন হয়েও তাঁদের থেকে একটু ব্যতিক্রমী বলে তিনি অসাধারণ। উচ্চতায় হয়তো তিনি রবীন্দ্র-নজরুল কিংবা মাও-মুজিবের তুলনায় তুচ্ছ, তবু তাঁর সেই তুচ্ছতার সঙ্গে অসাধারণত্বের ঔজ্জ্বল্য জড়িয়ে আছে। সে ঔজ্জ্বল্যটি কী? তিনি মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখক। তাঁর সাংবাদিক ও লেখক সত্ত্বার এই অবদানের কথা ভুলে গেলে চলবে না বা ভুলে থাকা যাবে না। এখানেই তিনি বিশিষ্ট, মহৎ ও সর্বকালের মানুষের কাছে নমস্য এবং আমাদের সুনামগঞ্জের গৌরব।   
যেভাবে উদরপূজাসর্বস্ব বার্ধক্যের পালঙ্কে শুয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে করতে কালগত পাপক্ষয়ে কেটে যায় প্রায় সকল সাধারণ মানুষের জীবন, তাকে অর্থহীনতা ছাড়া আর কীছু বলা যায় না। বিশ্বের উন্নত দেশে যে-ভাবে সম্ভব হয়েছে, বাঙলাদেশে এই বিপুল (বর্তমানে প্রায় ১৭ কোটি) সংখ্যক মানুষের শক্তিকে সেভাবে আমরা এখনও মানবসম্পদে পরিণত করতে পারিনি বলে তাঁরা দেশের জন্যে মূর্তিমান আপদ হয়ে বিদ্যমান। এখানে মানুষজীবনের বয়োবৃদ্ধকাল কিংবা পুরো জীবনসায়াহ্নের পূর্ণ পরিসরটি রাষ্ট্রের কোনওরূপ আনুকূল্যহীন একটি  বিবর্ণ সময়। সালেহ চৌধুরীর বার্ধক্য সে ‘বিবর্ণ সময়’-য়ের মতো নয়, বরং সৃজনশীলতায়Ñ যাকে বলি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিকথা রচনায়Ñ পরিপূর্ণ না হলেও তিনি তাতে ব্যাপৃত, যেখানে প্রাণপ্রাচুর্যের কোনও অভাব নেই। তাঁর বার্ধক্য জীবনের জয়গানে প্রদীপ্ত, রঙিন আর অপার স্বাপ্নিকতায় ভরা।    
যৌবনে সালেহ চৌধুরী যেভাবে সাংবাদিকতায় ব্যাপৃত ছিলেন, তেমন হতে আমাদের দেশের নিরান্নব্বই শতাংশের কম মানুষকে দেখা যায়। কলম রেখে দিয়ে রাইফেল হাতে তুলে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে নেমে পড়েছিলেন   তিনি। বাঙলাদেশের ইতিহাসে এখানেই তিনি বিশিষ্ট হয়ে থাকবেন, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তারপর তিনি আরও ব্যাপকার্থে বিশিষ্ট এই জন্যে যে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনায় ব্যাপৃত হয়ে তিনি নতুন করে আর একটি মুক্তিযুদ্ধে নিজেকে শরিক করে তোলেন। যাকে বলি, দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ।  কেউ কেউ বলেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ একটি অসমাপ্ত যুদ্ধ। তাই ‘একাত্তরের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেক বার’ এই কথাটা মাঝে মাঝেই কারও কারও মুখে বজ্রধ্বনির মতো উচ্চারিত হয়। বলি কি, আমাদের অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের শুরু এখানেই, সালেহ চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখার মধ্য দিয়ে সে যুদ্ধের একজন সূর্যসৈনিক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন আমাদের মধ্যে। তাঁর এই ভূমিকা সুনামগঞ্জের জন্য একান্তভাবেই ছিল আরাধ্য আর জাতির জন্য গৌরবের।
বলা বাহুল্য, সুনামগঞ্জের প্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস উদ্ধারের অভিযানে তিনি একা নন, তাঁর পূর্বসূরি আছেন বেশ ক’জন, যাঁরা  সমবয়সী কিংবা অনুজ। তাঁদের মধ্যে আছেন মেজর আব্দুল মোতালিব, বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু, তাজুল মোহাম্মদ, আবু সুফিয়ান, হাসান  মোর্শেদ, অপূর্ব শর্মা, রণেন্দ্র তালুকদার পিংকু, লে. ক. নূরুন্নবী খান ও নিজাম উদ্দিন লস্কর প্রমুখ। এঁরা প্রত্যেকেই প্রকারান্তরে বাঙলাদেশের দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের সাহসী সৈনিক। তাঁদের জানাই অভিবাদন।   

  • [১]