- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ভ্রমণ-দুবাই, শারজাহ, আবুধাবি

অ্যাড. এনাম আহমদ
(দ্বিতীয় পর্ব)
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। একাধিকবার এর নাম পরিবর্তন করা হলেও কার্যধারায় তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি। একে দেশীয় কৃষ্টি ও ঐতিহ্য ব্যবহার করে মনোরম ভাবে বর্ণিল করা যেতো, দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত, সুন্দরবনকে উপজীব্য করে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার ব্যবস্থা করা যেতো। কিন্তু তা না, মলিন ও হৃদয়হীন একটা বন্দর। এর কর্তা ব্যক্তিদের আচার ব্যবহারে সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থাকে মনে করিয়ে দেয়। আজকাল হাত ধোয়া শিখতেও অনেকে রাষ্ট্রীয় অর্থে বিদেশে যান। যারা বিদেশের দরজায় থাকেন তারা ঐ দেশগুলোর বন্দরের চমৎকার ব্যবস্থা দেখেও শিখেন না? আমিরাত এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ পরিস্কার জানিয়ে দিল, তারা আমাকে বোর্ডিং কার্ড দেবে না। আমি আকাশ থেকে পড়লাম! অথচ আমি তো আকাশে উড়তে এসেছিলাম। দুবাই গিয়ে অভাগা দেশের লোকজন ভেগে যায় বলে নাকি তাদের এই ব্যবস্থা। মানুষ অধিক শোকে পাথর হয়। আমি লোহা হয়ে ব্যথিত কন্ঠে বললাম, আমাকে যেতে না দেয়ার সিন্ধান্ত দেবে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ। আপাতত আমাকে বোর্ডিং কার্ড দেয়া ছাড়া আপনাদের কোন উপায় নেই। আমার উত্তরে উনারা যথাক্রমে বিভ্রান্ত, বিরক্ত এবং পরিশেষে সদয় হলেন। স্বগতোক্তি করে বললেন, আপনাদের এভাবে বোর্ডিং কার্ড দেই, বেল্টে লাগেজ প্লেনে পাঠিয়ে দেই। পরবর্তিতে ঐ যাত্রীদের ইমিগ্রেশনে আটকে দেয়। যাত্রীদের লাগেজ প্লেন থেকে নিয়ে আসতে সময় নষ্ট হয়। প্লেন সময় মতো ছাড়তে পারে না। মনে পড়লো অকাল প্রয়াত আমাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন ও সব বিপদের কান্ডারি মইনুদ্দিন জালাল দা’কে। বরাবরের মতো আমাকে এ বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারতেন নিমেষেই। সাময়িক বাধা অতিক্রম করে দাঁড়ালাম ইমিগ্রেশনের একটি লাইনে। কর্তৃপক্ষের বেদম প্রশ্নের মুখোমুখি হলাম। আমার উত্তরগুলো শুনে তিনি কিছুক্ষণ ঝিম ধরে থাকলেন। আশেপাশের কাউন্টারগুলোতে আমাদের রেমিটেন্স যোদ্ধাদের চরম হয়রানি প্রত্যক্ষ করতে করতে এগিয়ে গেলাম। দেশকে মধ্যম আয়ে ঠেলে দেয়া এই যোদ্ধাদের
বিমানবন্দরে প্রায়ই ‘উত্তম মধ্যম’ খেতে হয়। আমাদের এই অর্ধ শিক্ষিত, অশিক্ষিত প্রবাসী শ্রমিকগণ যে বেদনা নিয়ে বিদেশে যাওয়ার জন্য পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসেন, বিমানবন্দরের হয়রানি ও অসম্মানের দুঃশ্চিন্তা করে ঠিক একই পরিমাণ শিউরে উঠেন। ইমিগ্রেশন থেকে পার হয়েও রেহাই নেই! আবার লাইন দিতে হয় চূড়ান্ত নিরাপত্তা তল্লাশী ও বোর্ডিং কার্ড চেক করার জন্য। অবশ্য বাঙালি জাতির পরীক্ষা দিতে দিতে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করতে করতেই এই পর্যায়ে আসা। বসলাম বাংলাদেশের সর্বশেষ ওয়েটিং রুমে। কাঁচের তৈরি রুম। বিমানে উঠা-নামা প্রত্যক্ষ করা যায়। ইতোমধ্যে যাত্রীরা সবাই ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, অপদস্ত। এর মধ্যে একজন তরুণ যাত্রী অনুযোগের সুরে জানালেন, নিরাপত্তাকর্মীরা তার কাছ থেকে পাঁচশত টাকা নিয়ে গেছে। আমরা আঁতকে উঠলাম! আশেপাশে খোঁজ নিয়ে আর কারো ক্ষেত্রে এমন ঘটেছে বলে জানা গেল না। কি বলে টাকা নিল জানতে চাইলে সে জানালো, তার এক ভাই দুবাই আছে। ঐ ভাইয়ের জন্য সে হাতব্যাগে রসমালাই নিয়ে এসেছে। এজন্য নিরাপত্তাকর্মী তার কাছ থেকে টাকা রেখেছে। আমরা হতভম্ব! নিরাপত্তার জন্য পৃথিবীর সর্বত্র হাতব্যাগে লিকুইড বহন নিষিদ্ধ। সামান্য টাকা দিয়ে তা প্লেনে আনা গেল! না জানি আর কী করা যায় টাকা দিয়ে। আমাদের বিস্ময় সেখানেও শেষ হলো না। বরং মাত্র শুরু বলা চলে। একজন মধ্যবয়স্ক সিলেটি ভদ্রলোক কাতর সুরে বললেন, ‘ভাইসাব ইখানো কিতা সিগরেট খাওয়া যাইবনি’ আমি বললাম, ‘ইয়া মাবুদ! এটা কী বলেন? এখানে তা পাবেন কোথায়?’ তিনি জানালেন, ‘আছে। তা আমার কাছে আছে।’ বললাম, ‘আচ্ছা থাকতেই পারে। হয়তো কোন ভাবে লুকিয়ে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু এই চরম নিরাপত্তা তল্লাশীর পর এখানে আগুন পাবেন কোথায়?’ তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ^াসের সুরে বললেন, ‘আছে! তাও আমার কাছে আছে!’ আমাদের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়লো। একজন যাত্রী বলল, ‘আপনি তো প্লেনে উঠে আরব আমিরাতের প্লেনে আগুন ধরিয়ে দিতে পারবেন।’ তিনি রেগে বলছেন আমি তো সেটা বলিনি, আমি তো সিগারেটে আগুন দেয়ার অনুমতি চাচ্ছি। কথায় বলে, বাহিরে ফিটফাট, ভেতরে সদরঘাট। আমাদের বন্দরে, বাহিরে সদরঘাট, ভেতরেও সদরঘাট। আমিরাত প্লেনটি অত্যন্ত বিশাল এবং চিত্তাকর্ষক। যাত্রীরা উঠছে তো উঠছেই। প্লেন ছাড়লো আধঘন্টা বিলম্বে রাত দেড়টায়। পাইলট এই বিলম্বের জন্য ক্ষমা চাইলেন। জানালেন ইমিগ্রেশনে বিলম্বের জন্য দেরি হয়েছে। ক্ষমা চাইতে চাইতে যাত্রীরা বিমানবন্দর পার হয়ে এসেছিলাম। যখন শুনলাম, অন্য কেউ আমাদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছে, তখন বিশ^াস হলো, তাহলে সত্যি বিদেশে যাচ্ছি। প্লেন যাত্রায় যদি আকর্ষণীয় কিছু থাকে, তবে সেটা হচ্ছে ‘টেক অফ’। কিন্তু এতোটাই ক্লান্ত ছিলাম যে, প্লেন যে গতিতে রানওয়েতে দৌঁড় শুরু করলো, এর চেয়ে দ্রæত গতিতে ঘুম এসে আমাকে চেতনার উর্দ্ধে নিয়ে গেল।
ঘুম ভাঙল একটি ভোতা শব্দে। চোখ মেলে সামনের স্ক্রিনে দেখি আমি ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের উপর! সদা যুদ্ধ-বিক্ষুব্ধ স্থানে আমার মতো নিরীহ মানুষ কি করে যে গেলাম, তা প্রথমে বুঝতে পারিনি! এরমধ্যে খাবারের ট্রে নিয়ে একজন হাসিমুখে আমার সামনে দাঁড়ালেন। গত দশ বছরে খাবার হাতে আমার প্রতি বিরক্ত একজনকে দেখে অভ্যস্ত আমি! বিজ্ঞানী নিউটন আবিস্কৃত মহাকর্ষজ বলকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আমি তখন পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে অনেক উপরে। পৃথিবীর অনেক উপরে, পৃথিবীর মানুষের চেয়ে অনেক ভালো ব্যবহারে, পৃথিবীর মানুষের থেকে অনেক সৌন্দর্যে ……মনে হলো স্বর্গে আছি। তবে কোনো কিছুর একেবারে চূড়ায় উঠে যাবার পর যখন আর উঠার কিছু থাকে না, তখন নামতেই হয়। খাবারের ট্রে টি সামনের টেবিলে নামার পর মনে হলো, পৃথিবীতে আমি কখন নামব? খাবার পরিবেশন সুদৃশ্য, খাবার নিজে অদৃশ্য! সুন্দর করে মোড়ানো খাবারের বক্সটির আয়তন একটি দিয়াশলাই বক্সের কাছাকাছি। একটি মাইক্রোস্কোপিক কন্টেইনারে যে পরিমাণ পানি দিয়েছে, তার থেকে বেশী পানি দিয়ে আমরা বাসায় কুলি করি। আপেল জুসের যে পরিমাণ, প্লেনের তিন শতাধিক যাত্রীকে আপ্যায়ন করাতে তাদের তিন কেজির বেশী আপেল লাগার কথা না। এক পর্যায়ে জানানো হলো আমরা দুবাইয়ে নামছি। এটি বলার পর আরও আধা ঘন্টা আকাশে ভাসলাম। প্রতি মিনিটে বিমান নামছে সেখানে। আমরা প্লেন জটে পড়ে গেলাম। ঢাকায় এতো সংগ্রামের পর এবার মধ্যেপ্রাচ্য ¯œায়ুযুদ্ধের পালা। তিন নাম্বার টার্মিনালে নেমেছি আমরা। এটিতে শুধু আমিরাতের বিমান নামে। হাঁটছি তো হাঁটছিই। কোন কূল কিনারা নেই। এর মধ্যে সুরঙ পথে আমাদের হাঁটার কাফেলায় যোগ দিচ্ছে বিভিন্ন দেশ থেকে কে আসা যাত্রীরা। এক পর্যায়ে সুদৃশ্য ইমিগ্রেশনের কাউন্টার এবং তাতে বসা আরবি পোশাকে তাদের কর্মকর্তাদের দেখা গেল। এরমধ্যে হঠাৎ একজন আমার হাত শক্ত করে ধরে বলল, Are n’t Mr. Anam?…(চলবে)

  • [১]