বিশেষ প্রতিনিধি
১০ টি গরু ৬ মাস আগে ৮ লাখ টাকায় কিনে রেখেছিলেন সুনামগঞ্জ শহরতলির হাছনবাহারের আম্বির মিয়া। ৮ লাখ টাকার ৬ লাখ টাকাই ঋণ করে আনা। লাভের আশায় ভাই, ভাতিজা, স্ত্রীসহ সকলেই দিন রাত কেটে গরুগুলোকে খাইয়ে আরও তাজা করেছেন। এখন ৮০ হাজার টাকায় কেনা গরু ক্রেতাদের কেউই ৭০ হাজার টাকার বেশি দিতে চাইছে না। হতাশ হয়ে সুনামগঞ্জের বালুর মাঠের গরু’র বাজারের এক কোনে সময় কাটাচ্ছিলেন সুনামগঞ্জ শহরতলির হাছন বাহারের আম্বির মিয়া।
আম্বির মিয়া বললেন,‘লস (লোকসান) দিয়াই বেছন লাগবো, আজকের দিন দেখমু, কাইল গরু বেইচ্চা বাড়িত টেকা লইয়া না গেলে, মাইনসের টেকা দিমু কিলা।’
বেতগঞ্জের শাহাদতপুরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নূর হোসেন সাড়ে তিন বছর আগে একটি ছোট গরু কিনে যতœ করেছেন পরিবারের সকলে মিলে। হৃষ্টপুষ্ট ছোট এই গরুটি এখন এলাকার চৌখুস ষাড় ‘লাল চাঁন’।
আবেগতাড়িত কণ্ঠে নূর হোসেন বললেন, করোনা ও বন্যায় ব্যবসা-বাণিজ্য নেই বললেই চলে। সখের লালাচাঁনকে বাজারে নিয়ে এসেছি বিক্রি করে ঋণ দেব।
জানা গেল, লাল চাঁন’এর দাম হাঁকা হয়েছে ৪ লাখ টাকা। বাজারে ক্রেতা কম থাকায় বুধবার বিকাল ৩ টা পর্যন্ত ২ লাখের বেশি দাম ওঠেনি। এজন্য আরও বেশি মন খারাপ নূর হোসেন’এর।
আম্বির মিয়া ও নূর হোসেন ছাড়াও এবারের কোরবানির হাটের পশু কেনা বেচার পেছনে করুন কাহিনীই বেশি।
তাহিরপুরের বাদাঘাটের গরু বিক্রেতা জিয়াউল হক ৫ গরু নিয়ে সুনামগঞ্জের হাটে এসেছেন বেশি দাম পাবার আশায়। তার আশায় গুড়ে বালি হয়েছে। এখানে ক্রেতা নেই বললেই চলে।
বিশ^ম্ভরপুরের চালবন্দের তমিজ উদ্দিনের গোয়াল ঘরে এখনও ঘণ্ঠা পানি। এজন্য হালের দুটি বলদই বিক্রি করে দিচ্ছেন। বললেন, দুটি গাভীর দুধ বিক্রি করে বাজার খরচ চালাই। দুটি গরু চাষাবাদের সময় কাজে লাগাই। ঘরে পানি গরু রাখতে সমস্যা, আর করোনার কারণে গাভীর দুধও এখন বেচা যায় না। এজন্য দুটি গরু বিক্রি করতে এসেছি। কিন্তু এখনো (বুধবার দুপুর পর্যন্ত) কেউ দামই করেনি গরুগুলো।
সুনামগঞ্জের অস্থায়ী গরু’র হাটের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছিল ষোলঘর স্টেডিয়ামে। সেখানে এখনো হাটু থেকে ঘণ্টা সমান বন্যার পানি। এজন্য পৌরসভা ভবনের সামনের সরকারি জুবিলীর মাঠের অস্থায়ী কাঁচা বাজারকে সংকুচিত করে ওখানে গরু’র হাট বসানো হয়েছে। একারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাও কঠিন হচ্ছে।
বালু’র মাঠে গরু কিনতে আসা শহরের হাছননগরের বাসিন্দা অ্যাডভোকেট হোসেন তৌফিক চৌধুরী বললেন, স্বাস্থ্যবিধি একেবারেই রক্ষা হচ্ছে না গরুরহাটে। প্রশাসনের আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন।
বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার চিনাকান্দি, পলাশ, বাঘবেড় ও কারেন্টের বাজারে গত কয়েকদিন হয় গরু’র হাট বসছে। ওখানেও স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না বেশিরভাগ ব্যবসায়ী। এমনকি মাস্ক ব্যবহারও হচ্ছে না ওখানে। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমন তিনদিন আগে পলাশ বাজারের গরুর হাটে গিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে হাট পরিচালনার অনুরোধ করেছেন, প্রচারণাও চালিয়েছেন।
মঙ্গলবার ভ্রাম্যমাণ আদালত হাটগুলোতে অভিযানে গিয়ে ৬ ক্রেতা-বিক্রেতাকে ৪৪০০ (চার হাজার চার’শ টাকা) জরিমানা করেছে।
সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখ্ত বললেন,‘বন্যার কারণে নির্ধারিত স্থান শহরের ষোলঘর স্টেডিয়ামে গরুর হাট বসানো যায় নি। সরকারি জুবিলীর মাঠে সবজী বাজার একপাশে নিয়ে আরেকপাশে গরু’র হাট বসানো হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি স্বাস্থ্যবিধি মেনে হাট পরিচালনা করতে। এজন্য ক্রেতা বিক্রেতা সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।


