সম্প্রতি দায়িত্বশীলদের মুখে সামাজিক অস্থিরতা আর অপতৎপরতার বিরুদ্ধে জনগণকে প্রতিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। আমাদের সমাজের চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী মানুষ সবসময়ই সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে দৃঢ় ভূমিকা রাখেন। কিন্তু রাজনীতি-সমাজে দুর্বৃত্তায়নের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে মানুষের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাবোধ প্রবলভাবে হুমকিতে পড়ায় এখন সাধারণ মানুষের সহজাত প্রতিরোধপ্রবণতা কমতে দেখা গেছে। চোখের সামনে মানুষকে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে হত্যা করতে দেখলেও তাকে রক্ষায় কেউ এগিয়ে আসেন না। এই ধরনের অবস্থা বজায় থাকলে অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয় সমাজ সংসার। তারপরেও এখন বিবেকবান ও নীতিবোধসম্পন্ন অনেকে অন্যায় আর অপরাধের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। আর রুখে দাঁড়ানোর ‘বোকামি’র খেসারতও পান তারা হাতেনাতে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে কলেজছাত্র এনামুল হক হত্যাকা-ের বিষয়ে যে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে তাতে প্রতিবাদী এনামুলকে কী নির্মম পাষবিকতায় পিটিয়ে হত্যা করেছে কতিপয় দুর্বৃত্ত তার করুণ কাহিনী উঠে এসেছে। দরিদ্র এনামুল সৎভাবে সামান্য দর্জির কাজ করে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিল। এসএসসিতে ভাল ফলাফল করার পর এবার সে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল। কিন্তু ফলাফল প্রকাশ হওয়ার আগেই কতিপয় অন্ধকারের বাসিন্দা তাকে আলোর জগৎ থেকে সরিয়ে দিল। কী করেছিল এনামুল? না, কোন অন্যায় সে করেনি। বরং দায়িত্বশীলদের উপদেশ মত সে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিল। এনামুল দর্জির কাজ করত কাটাখালি বাজারের যে দোকানে তার সামনেই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কার্যালয়। ১৯ জুলাই রাতে ওই কার্যালয়ে জুয়া খেলায় বাধা দেয় এনামুল। এতেই ক্ষিপ্ত হয় জুয়া আসরের পা-া সাইফুল ইসলামসহ তার সাগরেদরা। এনামুল জুয়া খেলা থেকে সাইফুলকে নিবৃত্ত করতে তার স্ত্রীর অনুরোধেই সেখানে গিয়েছিল। কিন্তু চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী। সাইফুল ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা বেদম পিটিয়ে মেরে ফেলে এনামুলকে। পরে হত্যাঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য হত্যার খবর চেপে গিয়ে এনামুল বিষ খেয়েছে এবং এজন্য তারা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে বলে সাইফুলরা এনামুলের পরিবারকে জানায়। প্রথমে বিশ্বম্ভরপুর হাসপাতাল পরে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল আবার কিছুক্ষণ পরে সিলেট নিয়ে যাচ্ছে এবং শেষে রাত সাড়ে তিনটায় এনামুল মারা গেছে বলে খবর দেয়। এনামুলকে নিজ বাড়িতে এনে দাফন করা হয়। লাশ যারা গোসল করিয়েছেন এবং প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন নিহত এনামুলের শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন ছিল যা থেকে স্পষ্টতই তাকে পিটিয়ে হত্যা করার বিষয়টি বুঝা যায়।
ঘটনার সাথে ক্ষমতাসীন দলের সিকি নেতারা জড়িত থাকায় প্রথমে থানা পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করে। আওয়ামী লীগের উপজেলা সভাপতি বিষয়টি আপোসের প্রস্তাব দেন বলেও গণমাধ্যমে তথ্য এসেছে। এখন দেখা যাচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় গায়ে আঁটা থাকলে মানুষ মেরেও পার পেয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু বাধ সেধেছেন এলাকাবাসী। তারা হত্যাকা-ের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিবাদসভা ও মানববন্ধন করেছেন। হত্যাকা-ের বিষয়ে থানায় মামলা হয়েছে। মামলায় যাদেরকে আসামী করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ কামনা করি আমরা। পাশাপাশি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকেও এ বিষয়ে কিছু দায়িত্ব নিতে হবে। ঘটনাস্থল এবং জড়িতদের সাথে যেহেতু দলীয় পরিচয়ের তথ্য উঠে এসেছে সুতরাং দলটি এ ব্যাপারে চুপ থাকতে পারে না। আমরা দলটির দায়িত্বশীলদের নিকট থেকে এ বিষয়ে পরিষ্কার বক্তব্য ও তারা এ ব্যাপারে সাংগঠনিকভাবে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন তা খোলাশা করার জন্য অনুরোধ জানাই। নতুবা একটি অপকর্মের দায় কাঁধে নিয়ে বেড়াতে হবে সংগঠনটিকে।

