প্রাণ বাঁচাতে অজানার পথে

সালেহ আহমদ আলমগীর
মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি সবে তের পেরিয়েছি। যুদ্ধে যাওয়ার কথা নয় ওই বয়সে। তবে একজন মুক্তিযোদ্ধা-চিকিৎসক হিসেবে আমার বাবা ডা. মো. হারিছ উদ্দিন ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। ৫ নম্বর সেক্টরের অধীনে টেকেরঘাট সাব-সেক্টরের মেডিকেল অফিসার ছিলেন তিনি। সেই সুবাদে মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সাত মাস পরিবারের সবাই আমরা সেখানে থেকেছি, প্রথম চার মাস টেকেরঘাটে আর শেষ তিন মাস বড়ছড়ায়। আব্বা ছাড়াও নিকট আত্মীয় আরও ক’জন সাব-সেক্টরের সামরিক ও বেসামরিক কার্যক্রমের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। ফলে একটা যুদ্ধক্ষেত্রের সার্বিক কর্মকান্ডের অনেক কিছু খুব কাছে থেকে দেখা ও শোনার বিরল সুযোগ পেয়েছি। পারিবারিক জীবন আর মুক্তিযুদ্ধ যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। সে দিনগুলোর আগলে রাখা স্মৃতির সংগ্রহটি খুব একটা অকিঞ্চিৎকর নয়। সেখান থেকে আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ক’টা দিনের ঘটনা বা গল্প শোনাচ্ছি। মৃত্যু-আতঙ্ক মাথায় নিয়ে একটি পরিবারের এক দিশাহীন যাত্রার রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার গল্প এটি।
গল্পের নাম ঠিক করতে গিয়ে দেখি, সে এক মস্ত বিড়ম্বনা। মানানসই একটা নাম কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছি না। অথচ নাম পরিচয়হীনও তো রাখা যায় না গল্পটাকে। তাই, আপাতত ‘টেকেরঘাট টু বড়ছড়া-প্রাণ বাঁচাতে অজানার পথে’ নামেই গল্পটাকে হাজির করছি আপনাদের সামনে।
কিছুদিন ধরে আবহাওয়ার মতি গতিটা ঠিক আন্দাজ করা যাচ্ছে না। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি এখন। বর্ষা শেষ হতে চলেছে। ভরা বর্ষার একটানা মুষলধারে বৃষ্টি আর নেই। তার বদলে এখন চলছে রোদ বৃষ্টির খেলা। সকালে রোদ তো বিকেলে বৃষ্টি। সেই সাথে বিচ্ছিরি রকমের একটা ভ্যাপসা গরম। এমনি এক সকালে ঘুম থেকে জেগে বারান্দায় দাঁড়িয়ে চারপাশটা দেখছি। সকালটা বোধহয় বুঝে উঠতে পারছে না, গায়ে রোদ মাখবে নাকি বৃষ্টিতে ভিজবে। ব্রাশে পেস্ট নিয়ে কেবল মুখে দিয়েছি, অমনি দক্ষিণ দিকে বেশ দূর থেকে ভেসে এল বিকট একটা শব্দ। শুনে মনে হলো, বোমা কিংবা গোলা-জাতীয় কিছু একটা হবে। খানিক বাদেই ধোঁয়া। দিক দূরত্ব আন্দাজ করে ধারণা হলো তাহিরপুরেই হবে। আবার বিকট শব্দ, তারপরে আবার… আবার। ধোঁয়ার কুন্ডুলি দিগন্ত রেখা থেকে আরও উপরে উঠছে। টু’ইঞ্চ মর্টারের আওয়াজ ততদিনে চেনা হয়ে গেছে। পাশের পাহাড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ফায়ারিং প্র্যাকটিসের সময় শুনে শুনে কান পেকে গেছে। এ আওয়াজ তো টু’ইঞ্চ মর্টারের নয়, আরও বড় কিছুর আওয়াজ এটা। ভাল করে জানি, তাহিরপুরের ঘাঁটিতে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে এরচেয়ে ভারী কোনো অস্ত্র নেই। বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল। তবে কি এগুলো পাকিস্তানিদের ছোঁড়া গোলার শব্দ? ওরা কি তাহিরপুর আক্রমণ করেছে?
মে মাসের প্রথম দিকে এখানে, মানে টেকেরঘাটে এসেছি। আব্বা আম্মা ভাই বোন সবাই। দেশ জুড়ে ততদিনে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। টেকেরঘাট চুনাপাথর খনি প্রকল্পের (খরসবংঃড়হব গরহরহম চৎড়লবপঃ) স্থাপনাগুলোকে কেন্দ্র করে টেকেরঘাট সাব-সেক্টরের কর্মকান্ড সবে শুরু হয়েছে তখন। মার্চের আগে থেকেই আব্বা সুনামগঞ্জ টি. বি. ক্লিনিকের মেডিকেল অফিসার পদে কাজ করছিলেন। সরকারী চাকরি ফেলে রেখে এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে তাহিরপুর থানার বড়দল গ্রামের নিজ বাড়িতে চলে এসেছেন। পাকিস্তানিদের চাকরি আর করবেন না। লেখাপড়া লাটে তুলে আমরা ভাই বোনরাও বাড়ি চলে এসেছি। সাব-সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধাদের ডাক্তারের ভীষণ দরকার। যোগাযোগ হতেই আব্বা তাৎক্ষণিক যোগ দিয়েছেন সেখানে মেডিকেল অফিসার হিসাবে। কদিন পরে আমার মামা, সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তরুণ হাউস সার্জন, ডাঃ মোঃ নজরুল হকও (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল) যোগ দিয়েছেন রেজিমেন্টাল মেডিকেল অফিসার হিসেবে। মাসখানেকের ভেতর আমার আর এক মামা (আম্মার খালাতো ভাই) সিলেট মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র, জালাল আহমেদও (বর্তমানে ঢাকায় অবস্থানরত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ) টেকেরঘাটে চলে আসেন। মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় তিনি ডাক্তার দুজনকে, বিশেষ করে নজরুল মামাকে চিকিৎসা কার্যক্রমে সাহায্য করে গেছেন। পাশাপাশি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে যুদ্ধেও অংশ নিয়েছেন। কলোনির বিল্ডিংগুলোর বেশীর ভাগ ফ্ল্যাট তখন খালি পড়ে আছে। অধিকাংশ বাসিন্দারা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই দূর দূরান্তের নিজ নিজ বাড়ি চলে গেছেন। পাঁচ সাতটি পরিবার কেবল রয়ে গেছেন, যেতে পারেন নি। মামারা সহ আমাদের পরিবারের থাকার জন্যে বরাদ্দ হয়েছে খালি পড়ে থাকা ফ্ল্যাটগুলোর একটি। সেই বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি এই সকালে। নানা প্রশ্ন, উৎকন্ঠা আর আতঙ্ক নিয়ে তাকাচ্ছি এদিক ওদিক। আশে পাশের অনেকে ইতস্তত দৌঁড়াদৌঁড়ি করছেন, জানার চেষ্টা করছেন আসলে কী ঘটছে ওদিকে। সবার মনে একই শঙ্কা। পাঞ্জাবিরা বোধহয় তাহিরপুর দখল করে নিয়েছে! তাহলে ওখানে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের কী হলো, তাঁরা কী করছেন ? পাঞ্জাবিরা কি এখানে চলে আসবে? আমাদের কী হবে?
ঘন্টা খানেকের মধ্যে ব্যাপারটা পরিষ্কার হতে থাকল। মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের দ্রুতগামী নৌকাগুলো নিয়ে টেকেরঘাটে ফিরতে লাগলেন। জানা গেলÑ পাঞ্জাবিরা একটি গানবোট (পরে জানা গেছে, গানবোট নয়, ওটা আসলে একটা আর্মার্ড লঞ্চ ছিল) ও কয়েকটি স্পীডবোট নিয়ে জামালগঞ্জ থেকে খুব সকালে শনির হাওড়ে প্রবেশ করে। (টেকেরঘাট, তাহিরপুর ও জামালগঞ্জের ভৌগলিক অবস্থান সম্পর্কে যাঁদের ধারণা নেই তাঁদের জন্যে বলছিÑ তাহিরপুর থানা সদরের পাশেই দক্ষিণ দিকে দিগন্ত বিস্তৃত ‘শনির হাওড়’। এরও মাইল কয়েক দক্ষিণে সুরমা নদী, যার উত্তর পাড়ে সাচনা বাজার আর দক্ষিণ পাড়ে জামালগঞ্জ থানা সদর। অন্য দিকে উত্তরে তাহিরপুর থানা সদরের পাশেই বিশাল ‘মাটিয়ান হাওড়’। এর মাইল দুয়েক উত্তরে সীমান্ত-লাগোয়া টেকেরঘাট সাব-সেক্টর। সীমান্ত এখানে পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত। টেকেরঘাটের মাইল খানেক পূর্বে ‘বড়ছড়া বাজার’ আর পশ্চিমে প্রায় সমদূরত্বে ‘লাকমাছড়া’, ছড়ার নামে জায়গার নাম। (গুগল ম্যাপেও গোটা এলাকাটা দেখা যেতে পারে)। জুলাই-আগস্ট মাসের কয়েকটা দিন ছাড়া এপ্রিল থেকেই জামালগঞ্জ ওদের দখলে ছিল। আর নদীর উত্তর পাড়ে সাচনা বাজার ও আশেপাশের গ্রামগুলো বাদ দিয়ে সীমান্ত পর্যন্ত পুরো এলাকাটা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের কব্জায়, টেকেরঘাট সাব-সেক্টরের নিয়ন্ত্রণে থাকা মুক্তাঞ্চলÑ যার প্রায় কেন্দ্রস্থলে তাহিরপুর থানা-সদরের অবস্থান। থানা ও বাজার নিয়ে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের একটা ঘাঁটি বা ক্যাম্প। কিন্তু আজ সকালে পাকিরা শনির হাওড়ে ঢুকে ৩-৪ মাইল দূর থেকে ভারী গোলা বর্ষণ করতে করতে এই ঘাঁটি দখলের উদ্দেশ্যে তাহিরপুরের দিকে এগোতে থাকে। গোলার এই আওয়াজগুলোই টেকেরঘাট থেকে আমরা শুনছিলাম। হালকা অস্ত্র নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে ওদের আক্রমণ ঠেকানোর কোনো উপায় ছিল না। অসম যুদ্ধ চালিয়ে অযথা প্রাণ না দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা তাই টেকেরঘাটে পিছু হটে আসেন। সকাল দশটার দিকে আবার সংগঠিত হয়ে একটা লঞ্চ, স্পীডবোট ও কয়েকটা নৌকা নিয়ে পাকিদের তাড়াবার চেষ্টায় তারা তাহিরপুরের দিকে গিয়েছিলেন বটে। কিন্তু ওরা ততক্ষণে তাহিরপুরের দখল নিয়ে নিয়েছে। থানা ও বাজার সংলগ্ন বেশ কিছু ঘর-বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। আগুনের শিখা, ধোঁয়া আর গোলাগুলির শব্দ সব মিলিয়ে এক ধ্বংস যজ্ঞ চলছে সেখানে। মাটিয়ান হাওড়ের উত্তর-পূর্ব কোনায় মুক্তিযোদ্ধাদের লঞ্চটা দেখতে পেয়ে পাকিরা উত্তরদিকে এগিয়ে এসে উল্টো এদের ধাওয়া দেয়। তবে হাওড়ে নাব্য স¦ল্পতার কারণে ওদের গানবোট মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ভিড়তে পারেনি। তাছাড়া ওদের সাথে পাল্লা দেবার মত সমরশক্তিও মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তখন ছিল না। ফলে তাঁরা যুদ্ধে না জড়িয়ে টেকেরঘাটে ফিরে আসেন।
বেলা বাড়ার সাথে সাথে তাহিরপুরের সংগ্রাম কমিটির নেতৃস্থানীয়রা এবং পাকিদের টার্গেট হতে পারেন এমন লোকজন, বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বিরা, পরিবার পরিজন নিয়ে উ™£ান্তের মতো সীমান্তের দিকে আসতে লাগলেন। এখানে কোনো শরণার্থী শিবির ছিল না (পরেও হয়নি)। তাই যে যেভাবে পারেন টেকেরঘাট ও আশেপাশের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে আশ্রয় নিতে থাকেন। আমাদের আর মামাদের বাড়ি একই গ্রামে। দুপুরের ভেতর উভয়দিকের আত্মীয় স্বজনে ভরে উঠল আমাদের বাসা। আব্বা ও মামা কাজের এক ফাঁকে বাসায় এলেন। সবাই মিলে আলাপ আলোচনা হলো। দীর্ঘদিনের জন্য সবার থাকার ব্যবস্থা তো আর এখানে করা যাবে না। তাই সিদ্ধান্ত হলোÑ নানু ও খালা (সুনামগঞ্জ ন্যাপ-এর সেক্রেটারি আলী ইউনুস অ্যাডভোকেট সাহেবের স্ত্রী) সহ মামাদের বাড়ির সবাই আপাতত এখানে থেকে যাবেন। বাকিরা সন্ধ্যার আগেই মোটামুটি নিরাপদ অবস্থানে বিভিন্ন গ্রামে আত্মীয় স্বজনের বাড়ি চলে যাবেন। কথাবার্তা শেষে সামান্য কিছু মুখে দিয়ে আব্বা ও মামা আবার দৌঁড়ালেন যার যার কাজে। আজ-কালের মধ্যেই টেকেরঘাট আক্রান্ত হতে পারেÑ এ বিবেচনায় সম্ভাব্য যুদ্ধাহতদের চিকিৎসার জন্য যতটুকু পারা যায় প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। সাব-সেক্টর প্রশাসনের সবাই তখন ভীষণ ব্যস্ত হেড কোয়ার্টারের নিরাপত্তার আয়োজন নিয়ে। তাহিরপুর ওদের দখলে চলে যাওয়ায় হেড কোয়ার্টারের সামনে এখন আর কোনো প্রতিরক্ষা-বলয় নেই। যে কোনো সময় পাকিরা হেড কোয়ার্টার আক্রমণ করে বসতে পারে। আর আক্রমণ যদি হয় তাহলে সন্ধ্যার পরে রাতের আঁধারেই হবে বলে সবার আশঙ্কা। যে করে হোক হেড কোয়ার্টার আগলে রাখতে হবে। সামনের দক্ষিণদিকে ছোট একটা হাওড়, কোনো স্থলভূমি নেই। রেল লাইন বসানো মাইল খানেক দীর্ঘ একটা রাস্তা দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে চলে গেছে ডাম্পের বাজার পর্যন্ত। হাওড়ের স¦ল্প পানিতে ওদের জলযান চলবে না, তাই পাকিদের আসতে হলে নদীপথে এসে ডাম্পের বাজারেই উঠতে হবে। উঠতে পারলে এ রাস্তাটা ধরে সোজা চলে আসবে হেড কোয়ার্টারে। রাস্তাটার আশেপাশে লাকমাছড়া পর্যন্ত কোনো বাড়ি ঘর নেই, একেবারে বিরান এলাকা। কাজেই হেড কোয়ার্টারের নিরাপত্তার জন্যে ডাম্পের বাজার সহ গোটা এলাকাটাই প্রতিরক্ষা ব্যুহের আওতায় রাখতে হবে। এ রকম অভূতপূর্ব একটা পরিস্থিতিতে টালমাটাল অবস্থা সবার। পিছুহটা যোদ্ধাগণ ইতোমধ্যে সংগঠিত হয়েছেন। কোম্পানী কমান্ডার, প্লাটুন কমান্ডাররা যে যার দল গুছিয়ে নিয়েছেন। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এম.পি.এ. সাব-সেক্টরের কমান্ডার হলেও সামরিক কর্মকান্ড অর্থাৎ যুদ্ধ পরিচালনা করার মতো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কোনো অফিসার তখন পর্যন্ত এখানে যোগ দেননি। ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর বাট ও ক্যাপ্টেন ভার্মা দেখভাল করছেন সবকিছু। আজ আবার সুরঞ্জিত বাবু ও মেজর বাটও নেই, দু’জনই শিলং গেছেন। তাই ক্যাপ্টেন ভার্মাকেই সব সামাল দিতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও গোলা বারুদ সরবরাহ করা হলো। ছোট একটা দলকে পাঠানো হলো ডাম্পের বাজারে। পাকিরা এলে যাতে সিগন্যাল-ফায়ারের মাধ্যমে আগে ভাগে জানান দিতে পারেন। বাকিরা সবাই পজিশন নিলেন টেকেরঘাটকে পেছনে রেখে সামনের ছোট হাওড়ের পাড় ঘেঁষে দক্ষিণমুখো হয়ে। মরণপণ প্রতিজ্ঞা নিয়ে প্রস্তুত সবাই।
সব কিছু গুছিয়ে সন্ধ্যা বেলা একটু দম ফেলবার সময় হতেই কর্তা ব্যক্তিদের খেয়াল হলোÑ আরে, সিভিলিয়ানদের কী হবে? প্রজেক্টের থেকে-যাওয়া পরিবারগুলো আর সাব-সেক্টরের সামরিক-বেসামরিক কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গের পরিবারগুলো তো এখনও হেড কোয়ার্টারের একেবারে মাঝখানে রয়ে গেছে! ওদের নিরাপত্তার ব্যাপারে তো কিছু করা হলো না! পাকিদের আক্রমন শুরু হলে এরা আক্ষরিক অর্থেই সরাসরি তোপের মুখে পড়বে। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত হলোÑ আমাদের আর এখানে থাকা চলবে না। কর্তৃপক্ষের পক্ষে কিছু ব্যবস্থা করার মতো সময় আর হাতে নেই। তাই নিজ দায়িত্বে অতি দ্রুত টেকেরঘাট ছেড়ে সরে পড়তে হবে। সীমান্তের এপাড়ে থাকা একেবারেই নিরাপদ নয়, যেদিক দিয়ে পারা যায় ভারতের ভেতরে ঢুকে যেতে হবে। বি.এস.এফ-কে বলা হয়েছে, ওরা প্রস্তুত আছে, সিভিলিয়ানদের নিরাপত্তার দিকটা ওরা দেখবে। এ রকম সিদ্ধান্ত হওয়ার পর আব্বা দৌঁড়ে বাসায় এলেন। বললেন, পাঁচ মিনিটের মধ্যে তৈরী হও। এখনই এ জায়গা ছাড়তে হবে। মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়া কী জিনিস, আমার সাড়ে তের বছর বয়সের ছোট্ট জীবনে এই প্রথম টের পেতে শুরু করলাম। (চলবে)
লেখক: চিকিৎসক