সালেহ আহমদ আলমগীর
(পর্ব-৪)
ভোর হলো একসময়। সবে আশ্বিন মাসের শুরু। পাহাড়-চূড়ায় তবু শীত শীত ভাব। উত্তুরে ঠান্ডা বাতাস বইছে। জেগে দেখি প্রায় সবাই গুটি শুটি মেরে শুয়ে আছেন। পূব দিকের আকাশ একটু একটু করে পরিষ্কার হচ্ছে। চারিদিকে অবারিত পাহাড়-চূড়ায় সূর্যোদয়ের সাথে সাথে নতুন আর একটা দিনের শুরু হলো। একটু বেলা বাড়লে আবার সেই খিচুড়ি। আবাসনের কী ব্যবস্থা করা যায়, খেতে খেতে এ নিয়ে বড়দের মাঝে আলাপ চলল। গতরাতে আবহাওয়া ভাল ছিল, তাছাড়া বিকল্প আর কোনো ব্যবস্থাও ছিল নাÑ তাই হয়তো একটা রাত সবাই মিলে এই উন্মুক্ত পাহাড়-চূড়ায় কাটানো গেছে। কিন্তু প্রতিদিন তো আর এভাবে সম্ভব নয়, নিরাপদও নয় মোটেও। আব্বাকে বেশ চিন্তিত মনে হলো। কর্র্তৃপক্ষ তাঁদের ডাক্তারের বাসস্থানের একটা ব্যবস্থা নিশ্চয়ই করবেন, হয়তো দু’চারদিন সময় লাগবে, কিন্তু এই দু’চারদিনের জন্যেও তো মাথা গোঁজার মতো একটা কিছু দরকার। তার উপর খালা ও মামারা মিলে আমাদের পরিবারে সদস্য-সংখ্যাও কম নয়। খাওয়া শেষ করে আব্বা কাছেই কোথায় যেন গেলেন। ভারতের এ এলাকাটায় কোনো ডাক্তার না থাকায় এবং সীমান্ত উন্মুক্ত থাকায় কিছু কিছু ভারতীয় নাগরিক গত কয়েকমাসে আব্বার কাছে চিকিৎসা নিয়েছেন। সেই সুবাদে দু’একজনের সাথে পরিচয় বেশ ঘনিষ্ঠতা পেয়েছে। এতগুলো মানুষ নিয়ে থাকার মতো একটা বাড়ি বা বাসার খোঁজে গেছেন তেমনি পরিচিত একজনের কাছে। অন্যরাও যার যার মত করে এ ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিতে লাগলেন। তাঁদের সাথে মানুষ কম, হয়তো বড়ছড়ার আশেপাশেই পেয়ে যাবেন। ঘন্টা দুই পরে হাসিমুখ নিয়ে ফিরলেন আব্বা। লাকমাছড়ার ওপারে একটা গারো-বাড়িতে কদিন থাকা যাবে। স্থানীয় ট্রাইবাল চীফের বাড়ি। জুম চাষ উপলক্ষে কয়েক মাসের জন্য বাড়ির সবাই ২-৩ মাইল উত্তরে ‘উলুকিত্তা’ নামের এক জায়গায় গেছেন। সেখানে তাঁদের ঘরবাড়ি আছে। বুড়ো চীফ এখন লাকমাছড়ার বাড়িতে একাই থাকছেন। প্রয়োজনে টিলার অন্য পাশেও তাঁর থাকার ব্যবস্থা আছে। মূল বাড়িটাতে আপাতত কদিন আমরা থাকতে পারি।
সবাই মিলে আবার পথে নামলাম। এবার গন্তব্য লাকমাছড়ায় গারো ট্রাইবাল চীফের বাড়ি। প্রথমে বড়ছড়ায় নামতে হবে, তারপরে টেকেরঘাট পার হয়ে পশ্চিম দিকে মাইল খানেক হাঁটলে পৌঁছাব লাকমাছড়া। সব মিলিয়ে প্রায় তিন মাইল। জানা গেছেÑ বড়ছড়া টু শিলং রাস্তাটা আজ সকাল থেকে চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। যাক বাঁচা গেল। গতকালের ওই শর্ট-কাট পথে আর যেতে হচ্ছে না আজ। এ যাত্রায় পায়ের নিচে মোটামুটি চওড়া রাস্তা পাওয়া গেল। পিচঢালা না হলেও ট্রাক জীপ চলে এ রাস্তায়। উপরে উঠার কষ্ট নেই, শুধু নিচের দিকে নামা। তাছাড়া তাড়াহুড়োও নেই। বেশ স্বস্তি নিয়ে হাঁটছি আর চারিদিকে পাহাড়ের অপরূপ দৃশ্য দুচোখ দিয়ে গিলছি। জীবনে দেখিনি এমন কত রকমের গাছ, লতা পাতা, কত রঙের ফুল! বেশ ক’টা চোখ-জুড়ানো ঝরণা দেখলাম যেতে যেতে। পাহাড়-পেঁচানো রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে একমসয় শেষ বাঁকটা ঘুরতেই বি.এস.এফ. ক্যাম্পের সামনে চলে এলাম। ক্যাম্পটা সমতল থেকে বেশ খানিকটা উপরে। একটা পাহাড়ের দক্ষিণমুখো ঢালের ভাঁজে ভাঁজে এমনভাবে বানানো হয়েছে, যেন পাহাড়ে বসে নিচে বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আছে। আমাদের চোখেও পুরো দক্ষিণ দিকটা খুলে গেল। ওই তো দেখা যাচ্ছে আমাদের গ্রাম, পাশে মাটিয়ান হাওড়। আর একটু দূরে ওই যে তাহিরপুর। যতদূর চোখ যায় পুরোটাই বাংলাদেশ, প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ। দেখা যেন শেষ হতে চায় না! তবু পা চালাতে হলো। আর কিছুটা নেমে বড়ছড়া বাজারে পৌঁছালাম। সেখানে দেরি না করে টেকেরঘাটে আমাদের বাসায় পৌঁছে গেলাম। আজ আর পাকিদের গুলির ভয় ছিল না। ইতোমধ্যে হেড কোয়ার্টারকে কেন্দ্র করে বড়ছড়া থেকে এদিকে ডাম্পের বাজার আর লাকমাছড়া পর্যন্ত শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বলয় তৈরী করা হয়েছে। গত দুদিনেই পাকিদের চলাচল অনেকটা গুটিয়ে গেছে। স্পীডবোটে চড়ে এ গ্রামে সে গ্রামে অবাধে যাওয়ার আর সুযোগ পাচ্ছে না। সুবিধামত বিভিন্ন গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের ছোট ছোট দল পজিশন নিয়েছে। হাওড়ে বোট দেখলেই এঁদের অস্ত্র গর্জে উঠছে। গুলিতে বোট ডুবে যাওয়ার ভয়ে ওরা কাছে ভিড়ার সাহস পাচ্ছে না। বাসায় ঘন্টা খানেক বিশ্রাম নিয়ে সবাই আবার লাকমাছড়ার দিকে রওয়ানা হলাম এবং বিকেলের দিকে বুড়ো চীফের বাড়িতে পৌঁছালাম। যাক, আকাশের তারা গুণে আর রাত কাটাতে হবেনা, অন্তত কয়েকটা দিন তো থাকা যাবে বুড়োর ঘরে।
বুড়োর নাম আনন্দ্ মারাক। ভদ্রলোককে সেই থেকে বুড়ো বুড়ো বলছি কারণ বয়সে তিনি বুড়োই। তাছাড়া পরিচয়ের কিছুক্ষণের মধ্যে তাঁকে ‘নানা’ ডাকতে শুরু করেছি, তিনিও আম্মাকে ‘মা’ সম্বোধন করছেন। লাকমাছড়ায় যে গারো-পুঞ্জিটা আছে, সেই পুঞ্জির প্রধান তিনি। সে হিসাবে চীফই তো। বাড়ির ও আশপাশের সবকিছু দেখিয়ে বুঝিয়ে দিয়ে সন্ধ্যাবেলা তিনি চলে গেলেন। যাওয়ার আগে বলে গেলেন কাল বিকেলে ফের দেখা হবে।
বি.এস.এফ. ক্যাম্পটার মতো বুড়োর বাড়িটাও বেশ উঁচু একটা টিলার দক্ষিণমুখো ঢালের উপর বানানো। নিচের বাংলাদেশ থেকে উপরের দিকে তাকালে বাড়ির কিছুটা অংশ দেখা যায়। ছন দিয়ে ছাওয়া চারচালা বেশ বড় একটা ঘর। চালের অবস্থা বিশেষ ভাল মনে হলো না। পাশে ছোট আর একটা ঘর। সামনে মাঝারি সাইজের উঠোন। ঘর, পাশের আঙ্গিনা, উঠোন সবকিছু খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। উঠোনের সামনে বিশাল একটা পাথর বাড়িটাকে প্রায় আড়াল করে রেখেছে। পাথরটার অর্ধেক মাটিতে গাঁথা আর অর্ধেক ঝুলে রয়েছে। দেখলে মনে হয় এই বুঝি সামনের দিকে খসে পড়ে যাবে। বুড়ো বলেছেন জন্মের পর থেকে নাকি তিনি এটাকে এভাবেই দেখছেন। ভালই হলো। খোলা দক্ষিণ দিক থেকে পাকিরা গোলাগুলি করলেও ঘরে লাগবে না, পাথরটাই ঠেকিয়ে দেবে। এই কদিনে টেকেরঘাটের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও বেশ গোছানো হয়ে গেছে। অপরিচিত কেউ প্রতিরক্ষা বলয়ের ভেতরে ঢুকতে পারছে না। চেনা জানা হওয়ায় দিনের বেলা লাকমাছড়া থেকে টেকেরঘাট যেতে আসতে আমাদের কোনো বাধা পেতে হয়নি। রাতের বেলা হলে সেন্ট্রিদেরকে ‘পাসওয়ার্ড’ বলতে হবে। যুদ্ধের সময়ে এটাই নিয়ম। ইতোমধ্যে সবাই মিলে ঠিক করেছেন আগামীকাল দুপুরে নানু সহ মামাদের পরিবারের সবাই একটু ঘুরপথে আম্মাদের মামাবাড়ি মশলঘাট-এ চলে যাবেন। তবে ছোট দুই মামা ও তিন শিশুকন্যা সহ খালা আমাদের সাথে এখানেই থেকে যাবেন। সন্ধ্যা ঘনাবার আগে আব্বা ও বড় মামা বাদে বড়রা টেকেরঘাটের বাসায় চলে গেলেন। মহিলারা দুটি ঘরের মধ্যেই কী করে যেন এতগুলো মানুষের রাত কাটানোর একটা ব্যবস্থা করে ফেললেন। বাস্তু হারাবার পর আজ তৃতীয় রাত। রাতে বৃষ্টি নামলো। চালের অবস্থা কতটা খারাপ এবার বোঝা গেল। বেশ কিছু জায়গা দিয়ে পানি পড়ছে। বুড়ো অবশ্যি এ বিষয়ে আগেই কিছুটা আভাস দিয়েছিলেন। কী আর করাÑ শোয়ার জায়গা বদলিয়ে, অল্প-বিস্তর গা ভিজিয়ে কোনোভাবে ঘুমানো গেল।
সকালে আর বৃষ্টি নেই। তবে ভেজা ভেজা একটা ভাব চারিদিকে। পাহাড়ের গায়ে গাছের পাতাগুলো কী সবুজ আর সতেজ দেখাচ্ছে। বাড়ির আশেপাশে চালকুমড়ো আর ধুন্দুল গাছের ছড়াছড়ি। ধরেছেও প্রচুর। পাশ দিয়েই লাকমা ছড়া বয়ে চলেছে। ছড়ার পাড় থেকে মানুষের উপস্থিতি আর কথা বার্তার শব্দ ভেসে আসছে। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখা গেল ৮-১০ টা পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন ছড়ার পাড়ে। পাহাড় থেকে কলাপাতা, লতাগুল্ম ইত্যাদি এনে মাথার উপর ছাউনির মত বানিয়ে ওঁরা বৃষ্টি ঠেকিয়েছেন। অথচ এ লোকগুলোই দুদিন আগে নিজ নিজ বাড়িতে আর দশটা দিনের মতো নিশ্চিন্তমনে সময় কাটিয়েছেন। কল্পনাও করেননি এভাবে পাহাড়ে জঙ্গলে বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে বৃষ্টি মাথায় সাপ-জোঁকের মাঝে রাত কাটাতে হবে।
দুপুরে বড় মামরা সবাই চলে গেলেন। কেমন এক শূন্যতা চেপে বসল মনটাতে। মনে হলো, আজ সত্যিই একলা হয়ে গেলাম। বিকেলে বুড়ো নানা এলেন। আমাদের কোনও অসুবিধা হচ্ছে কি না এসব নিয়ে আম্মার সঙ্গে কথা বললেন। ঘরে বৃষ্টির পানি পড়ার বিষয়ে খুব লজ্জিত হয়ে বললেন জুম চাষ শেষে পরিবারের সবাই ফিরে এলে প্রতিবছর চালসহ ঘর মেরামত করা হয়। এর আগে তেমন কিছু করা যাবে না, একটু কষ্ট করে এভাবেই থাকতে হবে। তারপর হাতের দা’ নিয়ে উঠোনের এক কোনায় বসলেন। ঝুড়ি বানানোর জন্য বাঁশের মাপমতো টুকরো থেকে পাতলা পাতলা ফালি (আমরা বলি বেত) তুলতে থাকলেন। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। মৃদু বাতাস বইছে। অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, বাড়িটাতে মশা নেই বললইে চলে। অন্ধকারে চোখে না দেখেই বুড়ো অবলীলায় বেত তুলতে থাকলেন। আমরা একজন দুজন করে তাঁকে ঘিরে বসে পড়লাম। শুরু হলো গল্প। উনি বক্তা আর আমরা মুগ্ধ শ্রোতা। ছোটদের পছন্দের সব গল্প হরিণ শিকার, ফাঁদ পেতে বন-মোরগ ধরা। বাঘ কীভাবে মহিষের ঘাড়ে কামড় দিয়ে কাবু করে ফেলে, দূর থেকে দেখা সে দৃশ্যের লোমহর্ষক বর্ণনা। আর পরতে পরতে তাঁদের সহজ সরল জীবনের সাতকাহন। এক ফাঁকে আম্মা চা নিয়ে এলেন। উঠোনে টানানো দড়িতে শুকাতে দেয়া কাপড় ঝুলানো ছিল, চুরি যাওয়ার আশঙ্কায় বুড়ো আম্মাকে কাপড়গুলো ঘরে তুলে রাখতে বললেন। আমরাও পেয়ে বসলাম বুড়োকে। বললাম নানা, এই না তুমি বললে তোমরা মিথ্যা বল না, মানুষকে ঠকাও না, তোমাদের পুঞ্জিতে চুরি-চামারি নেই, তবে যে আম্মাকে কাপড়গুলো ঘরে তুলে রাখতে বলছ? তাহলে তো দেখা যাচ্ছে তোমার কথাতেও মিথ্যা আছে, তোমাদের মাঝেও চোর আছে! নানার জবাব শুনে মাথাটা হেট হয়ে গেল। বললেন “ঠিকই তো কইছিÑ আগে তো আছিলো না, এখন উপ্রে বঙ্গাল আইছে যে!” ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিণত বয়সের এক বৃদ্ধের সারা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে নেয়া এ উপলব্ধি। পাল্টা বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পেলাম না। এক সময় তাঁর বেত তোলা শেষ হলো। সব কিছু গুটিয়ে নিয়ে তিনি তাঁর ঘরের দিকে রওয়ানা হলেন। আমরাও রাতের খাবার খেয়ে শুতে গেলাম। সে রাতেই জ্বরে পড়লাম। (চলবে)
লেখক : চিকিৎসক
- ছাতক পৌরসভা, ভোটারের দুয়ারে ২৮ কাউন্সিলর প্রার্থী
- দোয়ারায় গৃহকর্মী হত্যায় জড়িতদের শাস্তির দাবিতে সংবাদ সম্মেলন


