এগারো বছরের মেয়ের চোখে মুক্তিযুদ্ধ

জেসমিন সাদিক
(পূর্ব প্রকাশের পর)
মুক্তিযুদ্ধের দামামা
রেজা মামা জয়কলসে পৌঁছে জীপ থামান আমি যেতে পারবো কিনা জিজ্ঞেস করেন। সামনেই আমার ফুফাতো ভাই শফিককে পেয়ে যাই। উনি এগিয়ে আসলে মামাকে বলি আমি উনার সঙ্গে যেতে পারবো। মামা উনাকে বুঝিয়ে দিয়ে আম্মাকে উনার সালাম জানাতে বলে চলে যান। আমি আমার ত্রাণ কর্তার চলে যাওয়া দেখি। রাস্তায় দাঁড়ানো রাজাকাররাও দেখে। আমি আর ভয় পাই না। বাড়ীতে গিয়ে জানি গাগলী এ দিন যাওয়া যাবে না। কারণ বিকাল হয়ে গেছে। দিরাই যাওয়ার লঞ্চ চলে গেছে। বাড়ীতেই বড় চাচীর কাছে থাকি। আম্মার কাছে যাওয়ার জন্য প্রাণটা আকুলী বিকুলী করে। সবচেয়ে বড় কথা যে রোগী নিয়ে গেছিলাম হামিদা যার মাথা থেকে পোকা বের হচ্ছিলো সে ভালো হয়ে যাচ্ছে, তার ক্ষত শুকাচ্ছে। ছোট চাচী এজন্য বাড়ীতেই আছেন। আমি আর তাদের ঘরের দিকে যাই না। কোন কারণে যদি একে আমার কোলে দিয়ে দেন। আমি অবাক হই এই রোগী ভালো হচ্ছে কেমন করে! আল্লাহর অশেষ লীলা। আমার চিন্তার মাঝেও ছিলো না এ বাঁচবে। সে বেঁচেছে বহু বৎসর তবে বুদ্ধি প্রতিবন্দী হয়ে।
গভীর রাতে প্রচন্ড শব্দে ধরমরিয়ে উঠি। বড় চাচীও। ঘরের বাইরে আসেন। সঙ্গে আমি আরও ভাই বোনরা। আকাশ লাল হয়ে ফুলকি উড়ছে এরপর একাধারে গুলির শব্দ শেষই হতে চায় না। সকাল থেকে গুলি চলছে তো চলছেই। সবাই বলবলি করছে মুক্তিযোদ্ধারা জয়কলস পর্যন্ত চলে এসেছে। ছত্তার মিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ হচ্ছে। কেউ কেউ খবর নিয়ে আসছে রব্বানীর দল চলে আসছে। কেউ কেউ বলছে ছত্তার মিয়া রব্বানীকে ধরে ফেলছে। ওদিকে মুক্তিযোদ্ধারা যে অপারেশনই করে সবাই বলে রব্বানী করেছে। আমরা আশান্বিত হই সত্যি কি দাদা এদিকে চলে এসেছেন। আবার ভয় পাচ্ছি সত্যি কি ধরা পড়েছেন! কিছুই বুঝা যাচ্ছে না। দুপুরের দিকে ছেইছা ভাই আমাদের জমির কামলা, এসে বলে, আহসানমারা ফেরী মুক্তিযোদ্ধারা উড়াইয়া দিছে। সকালে নৌকা নিয়ে সে ঘাস কাটতে গিয়ে খবর পেয়েছে। সিলেট থেকে বহু আর্মি নাকি এসে মুক্তিযোদ্ধাদের মারছে। ছত্তার মিয়ার বাংকারের কাছে বহু তলাশ। একেক জন আসে একেকটা গুজব ছড়িয়ে যায়। ছোট চাচা সেজো চাচা কোরান শরীফ নিয়ে বসেছেন, তাদের ভাতিজা যেনো ধরা না পড়ে। কিন্তু গুলি বৃষ্টি শেষ হয় না। আমি গাগলী যাওয়ার জন্য কাঁদছি। কেমনে যাবো আম্মার কাছে! এই শব্দ তো গাগলী পর্যন্ত যাওয়ার কথা। আম্মা চিন্তা করছেন আমার জন্য জানি। হয়তো ভাবছেন আর আসবো না। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানাই ঐ দিন সকালে রেজা মামার সঙ্গে চলে আসতে পেরেছি। নইলে যে আটকা পড়তাম। এই যুদ্ধ তো শেষ হবে না। দুপুর পর্যন্ত গুলি চলতেই থাকে। এক সময় থাকে। ঐ দিনও আমার গাগলী যাওয়া হয় না। উজানীগাঁও থমথমে। কিছুই বুঝা যাচ্ছে না। পাশাপাশি হাঁটিবান্ধা বাড়ী একেকজন এসে একেক রকম খবর দিয়ে চলছে। এতো গুলির মাঝেও শান্তি লাগে। মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করছে দেশ স্বাধীন হবে। শফিক ভাই সঠিক খবর নিয়ে আসে। ছত্তার মিয়ার চাচাতো ভাই। আলতা ফুফুর ছেলে। আহসানমারা ফেরী মুক্তিযোদ্ধারা উড়িয়ে দিয়েছে। সিলেট থেকে কোন আর্মি সুনামগঞ্জ যেতে পারবে না। আর সুনামগঞ্জ থেকেও আসবে না। তাদের গ্রামের রাজাকাররা খুব ভয় পেয়েছে বাড়ীতে ছত্তার মিয়া বশীর সবাই আছে। তারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে এসেছে। মুক্তিযোদ্ধা কয়জন মরছে সে বলতে পারবে না। তবে মারা গেছে। বশীররা বলছে রব্বানীর গায়ে গুলি লাগছে। আমরা বিশ্বাস করি না। ঐ দিনও আমার যাওয়া হয় না। সারারাত আমি কাঁদি। আম্মার কাছে যাবো বলে। সকালে বড় চাচী সেই কামলা ছেইছা ভাইকে দিয়ে ছোট্ট একটা নৌকায় আমাকে তুলে দেন। শফিক ভাইকে খবর দিয়ে এনে আমার সঙ্গে দেন। ভয়ে ভয়ে রওয়ানা হই আর সকাল আটটার মাঝেই গাগলী পৌঁছে যাই। ওরা একই নৌকায় ফেরত যায়। আম্মা আমাকে দেখে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন। আর কেনো আমাকে পাঠালেন তার জন্য আফসোস করতে থাকেন। আমি বৃত্তির দুইশত পঁচাত্তর টাকাই আম্মার হাতে তুলে দিই। যাওয়ার সময় আম্মা আমার হাতে দশ টাকা দিয়েছিলেন। সেটাও ফেরত দিই। কারণ খরচ হয় নাই। লঞ্চ ভাড়া ছোট চাচা দিয়েছিলেন। আসার সময় রেজা মামার জীপে। আর সুনামগঞ্জে তো আমি হেঁটে হেঁটেই চলেছি। সব টাকা আম্মার হাতে দিয়ে আমার খুব শান্তি লাগে। বাকী কয়মাস আমরা টাকার কষ্ট করি নাই।
সে যাই হউক। আহসানমারা ফেরী যে ধ্বংস হয়েছে তা এ গ্রামের সবাই জেনে গেছে। পঞ্জাবীরা নাকি অন্য ফেরী এনেছে। এরপরই জয়কলসের পুলে মুক্তিযোদ্ধারা গ্রেনেড মারে কিন্তু পুরো ভাঙতে পারে নাই। এখনপ্রতি দিন যুদ্ধের খবর আসছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে আহসানমারা ফেরী ধ্বংসের খবর দেয়। আমার মনে হয় আমি যেনো যুদ্ধে ছিলাম। এতো তাড়াতাড়ি এই খবর স্বাধীন বাংলা বেতার জানলো কেমনে? অবাক হই। বুঝি মুক্তিযোদ্ধারা সংঘঠিত হচ্ছে। বাঘা ছিদ্দিকীর বীরত্ব গাঁথা প্রতিদিন স্বাধীন বাংলা বেতারের এক বিশেষ অনুসঙ্গ ছিলো। পুরো আগস্ট মাস জুড়ে গুলি পাল্টা গুলির আওয়াজ গাগলীতে বসেই শুনতে পাই। যুদ্ধ যে জোরে শোরে চলছে বুঝতে পারি। আশায় বুক বাধি। আজ জয়কলস তো কাল আসামপুর পর শুগনিগন্জ যুদ্ধ চলতেই থাকে। নভেম্বরের দিকে নবাব ভাইর কাজ বেড়ে যায়। দু’একজন নুতন লোক নিয়ে আসা নিত্য নৈমিত্তিক হয়ে যায়। আমরা বুঝেও বুঝতে চাইতাম না। এসময় গনিগঞ্জ গাগলীর পাশের গ্রামে বড় যুদ্ধ হয়। মুক্তিযোদ্ধারা নাকি পাকসেনা আর রাজাকারদের তুলোধুনো করেছে। এই সময় নদীতে বিভিন্ন লাশ ভেসে যেতে দেখা যায়। লাশ ভেসে আসছে খবর পেলেই আম্মা দৌঁড়ে নদীর ঘাটে যেতেন লাশ দেখার জন্য আকুল হতেন। উনার ধারনা মতিউর মামা দস্যি ছেলে যে কোন সময় যুদ্ধে মারা যাবেন। যে কোন মুক্তিযোদ্ধা মারা গেছে বা লাশ ভেসে আসছে খবর পেলে উনি দাদা আর মতিউর মামার জন্য আহাজারী শুরু করতেন। লাশ ভেরানোর জন্য সবাইকে কাকুতি মিনতি করতেন। কেউ তা শুনতো না। তিনি নদীর পাড়ে বসে থাকতেন। আর বলতেন আহা এনে মাটি দেয়ার ব্যবস্থা করো না। কে এই পচা গলা লাশ আনবে। উনার আহাজারী শুধু আমারই সামলাতাম। তবে যুদ্ধ যে জোরেশোরে হচ্ছে তার সংবাদে উল্লসিত হতাম। আগস্টের পর থেকেই প্রায় প্রতি রাতে এখান সেখান থেকে গুলির শব্দ শুনা যেতো। কান পেতে তা শুনার জন্য অপেক্ষা করতাম। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের খবরেও এসময় জোশ আসে। মনে হয় স্বাধীনতা বুঝি দ্বার প্রান্তে। কিন্তু এতাটা দ্বার প্রান্তে তা আমরা চিন্তাও করিনি।
৬ই ডিসেম্বর স্বাধীন সুনামগঞ্জ
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র মারফত যখন জানতে পারলাম ভারত বাংলাদেশকে একটা দেশ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে তখন থেকেই আশায় বসে থাকি এবার একটা কিছু হবে। আকাশে প্লেনের আনাগোনা বাড়তে থাকে। গ্রামের এরা পলিটিক্স ভালোই বুঝে। গোল হয়ে বসে তারা আমাদের বরাদ্দকৃত ঘরে স্বাধীন বাংলা বেতার শুনে আর একেকজন একেক মন্তব্য করে। বেশী লাফান সোনা চাচা। হারুন মামু টনেশনে থাকেন। আর কামাল চাচা যেনো এখনই যুদ্ধে চলে যাচ্ছেন। কারও কারও মুখ আবার আমশী হয়ে গেছে। ভোল পাল্টাবার চেষ্টা করছেন। আশায় বুক বাধি আমরা আবার নিজ আলয়ে যাবো। তবে কতদিন লাগবে এই যুদ্ধ জয় করতে কেউ বলতে পারে না। যুদ্ধ যখন হচ্ছে তখন অবশ্যই শেষ হবে। কিন্তু না আমাদের অপেক্ষা করতে হয়নি। ৬ ডিসেম্বর দুপুরের দিকেই খবর পেয়ে যাই, সুনামগঞ্জ থেকে সব আর্মি পালিয়ে গেছে। কোন বড় যুদ্ধই করতে হয়নি। নারী পুরুষ সবাই ঘরের বাইরে চলে আসে। ঘটনা সত্য কিনা ? আবার আলোচনার তুফান ছুটে। জয়কলস থেকে খবর আসে ছত্তার মিয়ার বাহিনীর কেউ বাংকারে নেই। বাংকার খালি করে সবাই পালিয়েছে। ছত্তার মিয়া নাকি তার বৌ বাচ্চা নিয়ে সুনামগঞ্জ ছেড়েছে। তার বড় বৌ তার বাচ্চা মেয়েদের নিয়ে গ্রামে তার ভাইয়ের বাড়ীতে উঠেছে। তার কান্নাকাটিতে বিষয়টা সত্য বলে সবাই মনে করছে। বিকালের দিকে দেখি নদী তীর দিয়ে এক গ্রুপ মুক্তিযোদ্ধা জয় বাংলা শ্লোগান দিয়ে যাচ্ছে। এই গ্রুপের নেতা আউয়াল চাচা। আবদুস সামাদ আজাদ চাচার ভাগ্নীর ঘরের নাতী। তিনি এই গ্রাম পেরুনোর সময় কার কাছ থেকে জেনেছেন যে আমরা এই গ্রামে আছি। তিনি আমাদের বাসায় থেকে ইন্টার মিডিয়েট পরীক্ষা দিয়েছেন। আমাদের খুব প্রিয় আওয়াল চাচা। তিনি দলবল সহ বাড়ীতে উঠেন। আম্মাকে সালাম করেন। আর সুনামগঞ্জ মুক্ত এই সু-খবর সঠিক তা নিশ্চিত করেন। উনি বেশীক্ষণ বসেন নি। আম্মা সঙ্গে সঙ্গে কামাল চাচা সোনা চাচাকে বলেন নৌকা যোগার করো আমি কালই সুনামগঞ্জ যাবো।
(চলবে)