সুব্রত দাশ খোকন, শাল্লা
শাল্লা উপজেলার বাহাড়া ইউনিয়নের শান্তিপুর গ্রামের ভূমিহীন বাবুল মিয়ার (৫৫) চার ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে অন্যের বাড়িতে দিনমজুরি করে সংসার চালান। স্ত্রী, ছেলে-মেয়েকে নিয়ে যে ঘরে বাস করেন, সেটি সরকারি খাস ভূমিতে বাঁশের খুঁটির সাহায্যে চর্তুদিকে কার্টনের কাগজ আর চাটাই দিয়ে মোড়ানো। এর উপরে জং ধরা টিন দিয়ে ছোট ঝুপড়ি ঘর। হবিবপুর ইউনিয়নের নারকিলার আছাব উদ্দিনের (৭০) স্ত্রী, চার মেয়ে ও এক ছেলেসহ সাতজনের সংসার। ছেলেসহ অন্যের বাড়িতে রোজবন্দী কাজ করে সংসার চালান। থাকতেন অন্যের জায়গায় ঘর বেঁধে।
বাড়ি আর ভূমিহীন বাবুল মিয়া ও আছাব উদ্দিনের এ দুর্দশা কেটে গেছে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তাঁদের ঠাঁই মিলেছে মাথা গোঁজার। অন্যের জায়গায় ভাঙা ঘরে থাকার দুঃখ ঘুচেছে। তাঁরা জানান, এ জীবনে কোনোদিন তাঁরা ভাবেননি নিজের বাড়ি-ঘর হবে। তাঁরা পাকা বাড়িতে থাকবেন, এমনটা কল্পনায়ও ছিল না তাঁদের। কিন্তু মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা বাস্তবায়নের লক্ষে সরকারি উদ্যোগে তাঁদের জন্য আধাপাকা ঘর তৈরি হয়েছে। দুটি কক্ষ ছাড়া সে ঘরের সামনে থাকছে বারান্দা, পেছনে রান্নাঘর ও টয়লেট। ঘরের দুই শতাংশ জমিও বন্দোবস্ত দিয়ে তাঁদের নামে লিখে দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে তাঁরা জায়গা ও ঘরÑদুটোই বুঝে পেয়েছেন। সে জন্য তাঁরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
শাল্লা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শাল্লা উপজেলায় গত বছরের ১ ডিসেম্বর থেকে ১৬০টি ঘরের কাজ শুরু হয়। এরপর শাল্লার পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে আরও ১ হাজার ৪২১টি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়। বর্তমানে শাল্লা উপজেলায় মোট ঘর নির্মিত হবে ১ হাজার ৫৮১টি। আগামী ২৬ মার্চের মধ্যে উপকারভোগী সবাইকে ঘর ও জমি বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
বাহাড়া ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামের সুমিত্রা রানী (৫০) জানান, তাঁর পরিবারে কোনো উপার্জনক্ষম ব্যক্তি না থাকায় নিরুপায় হয়ে নারী হয়েও বর্ষায় খেয়া পারাপার এবং হেমন্তে মাটি কাটার কাজ করে পরিবারের সদস্যদের ভরনপোষণ করান। তিনি থাকেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধের উপর নিজের নির্মিত ছোট খুপড়ি ঘরে। এখন প্রধানমন্ত্রীর বদৌলতে তিনিও জমিসহ ঘর পাচ্ছেন। তাঁর ঘরের নির্মাণকাজও শেষ পর্যায়ে।
গত ৩১ ডিসেম্বর থেকে টানা দুইদিন সরেজমিনে বাহাড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, প্রতাপপুর গ্রামের ১৫টি ঘরের মধ্যে ২টি ঘর প্রস্তুত হয়েছে। এর বাইরে ৪টি ঘরে ইটের গাঁথুনি শেষ। বাকি ৯টি ঘরে মালামাল পৌঁছলেও কাজ শুরু হয়নি। এ সময় বাহাড়া ইউনিয়নের ঘর তদারকির দায়িত্বে থাকা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা দীন মোহাম্মদ ও মাধ্যমিক অ্যাকাডেমিক সুপারভাইজার কালীপদ দাসকে কাজ তদারকি করতে দেখা যায়। ভেড়াডহর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সেখানকার ৬১টি ঘরের মধ্যে ৪টি প্রস্তুত হয়েছে, ৬টির ইটের গাঁথুনি শেষ। বাকি ৫১টি ঘরের মালামাল পৌঁছলেও মেস্তুরির অভাবে কাজ শুরু হয়নি। মেদা গ্রামের ১৫টির সবকটিতেই মালামাল পৌঁছেছে। দু-একদিনের মধ্যে মেস্তুরি এলে কাজ শুরু হবে। সুখলাইন গ্রামের ২১টি ঘরের মধ্যে ৩টি ঘরের কাজ শুরু হয়নি। বাকিগুলোর কাজ প্রায় ৬০ শতাংশ হয়েছে। রঘুনাথপুর গ্রামের ২২টি ঘরের প্রত্যেকটিতে কাজ শুরু হয়ে কোনোটির ৪০ শতাংশ, কোনোটির ৭০ শতাংশ কাজ সমাপ্ত হয়েছে। মেঘনাপাড়া গ্রামের ১৯টি ঘরের মধ্যে ১২টি ঘর প্রস্তুত হয়েছে। বাকি ৭টি ঘরের কাজ প্রায় সমাপ্তের পথে। শান্তিপুর গ্রামের ২৫টির মধ্যে ১০টি ঘর প্রস্তুত হয়েছে। ৫টি কাজ শুরু হয়েছে এবং বাকি ১০টির মালামাল পৌঁছলেও কাজ শুরু হয়নি। মন্নানপুর গ্রামের ১৫টির মধ্যে ৪টি ঘর প্রস্তুত হয়েছে।
গত ২ জানুয়ারি হবিবপুর ইউনিয়নের চাকুয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সেখানকার ২২টি ঘরের প্রত্যেকটিতে ইট, বালু পৌঁছেছে। কিন্তু সিমেন্ট না যাওয়ায় কাজ শুরু হয়নি। নারকিলা গ্রামের ২৫টি ঘরের মধ্যে ১০টি ঘর প্রস্তুত হয়েছে। ৫টি ঘরের গাঁথুনি শেষ এবং বাকি ১০টির মালামাল পৌঁছেনি। গতকাল ৩ জানুয়ারি আটগাঁও ইউনিয়নের চিকাডুপি ও বল্লভপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সেখানকার ৫১টি ঘরের মধ্যে ৫টি প্রস্তুত হয়েছে। ৬টির কাজ শুরু হয়েছে এবং বাকি ৪০টিতে ইট-বালু পৌঁছলেও কাজ শুরু হয়নি।
শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল-মুক্তাদির হোসেন বলেন, ‘উপজেলাটি দুর্গম হাওর অঞ্চলে হওয়ায় মালামাল পৌঁছাতে সমস্যা হচ্ছে। এরপরও অধিকাংশ ঘরে ইতিমধ্যে মালামাল পৌঁছে গেছে। অল্প কিছু বাকি আছে, তা আগামী দু-একদিনের মধ্যেই পৌঁছে যাবে।’ তাঁরা দ্রুত কাজ শেষ করার চেষ্টা করছেন বলেও জানিয়েছেন। তিনি আরও জানান, আগামী ২৫ মার্চের মধ্যে সবগুলো ঘরের কাজ শেষ করে ২৬ মার্চ সুবিধাভোগীদের হাতে তাঁদের ঘরগুলো বুঝিয়ে দিতে সব প্রস্তুতি শেষ করবেন।
শাল্লা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ (আল-আমিন) বলেন, ‘শাল্লায় ১ হাজার ৫৮১টি ঘর বরাদ্দ দেওয়াটা ভাটির জনপদ শাল্লার জনগণের জন্য মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শ্রেষ্ঠ উপহার। আমরা ঘরগুলোর কাজ আগামী ২৫ মার্চের মধ্যে সম্পন্ন করার জন্য গত ২০ ডিসেম্বর উপজেলা পরিষদ গণমিলনায়তনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সভাপতিত্বে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে আলোচনা করে সংশ্লিষ্ট এলাকার শিক্ষককে তদারকির দায়িত্ব এবং প্রতিটি ইউনিয়নে ২ জন কর্মকর্তাকে মনিটরিংয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত করেছি। উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষেও একটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাগণ প্রতিদিনের কাজের অগ্রগতি কন্ট্রোল রুমে জানাচ্ছেন। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। সবার আন্তরিক সহযোগিতায় অবশ্যই আমরা আগামী ২৬ মার্চ সুবিধাভোগীদের হাতে তাঁদের ঘর বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হব।’


