কুমার সৌরভ
[জন্ম: ৫ মে ১৯৪৫ মৃত্যু: ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭]
প্রখ্যাত সাংবাদিক সুনামগঞ্জের সুসন্তান হাসান শাহরিয়ার তাঁর একটি নিবন্ধে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সম্পর্কে চারটি শব্দ বা শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন। সেগুলো হলো কালনীপাড়ের চন্দন বৃক্ষ, ভাটি শার্দূল, উচ্চাভিলাষী এবং নন্দিত ও নিন্দিত [সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত/কালনীপাড়ের চন্দন বৃক্ষ, যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা, হাসান শাহরিয়ার, উৎস প্রকাশন, ২০২০] । হাসান শাহরিয়ার নির্মেদ ভাষায় লেখালেখি করেন। তিনি জাত সাংবাদিক। তাই তিনি যা লিখেন তা স্পষ্টতই সোজাসাপটা, সেখানে বিশ্লেষণ ও তথ্য থাকে বেশি। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সম্পর্কে এই নিবন্ধে তিনি দুইটি শাব্দিক অলংকার ব্যবহার করেছেন উদার মন নিয়ে। কালনীপাড়ের চন্দন বৃক্ষ ও ভার্টি শার্দুল শব্দবন্ধ দিয়ে তিনি সেনগুপ্ত’র যথার্থ পরিচয় তুলে ধরেছেন। আবার উচ্চাভিলাষী (নেতিবাচক অর্থে নয় বরং ব্যক্তিত্বের দ্যূতি অর্থে তিনি এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন বলে আমি মনে করি) এবং নন্দিত ও নিন্দিত শব্দ দিয়ে তিনি এই নেতার জীবনের অর্জন ও হতাশাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি নাতিদীর্ঘ এই নিবন্ধে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সম্পর্কে যে অসাধারণ মূল্যায়ন করেছেন, তা এককথায় অখ-নীয়। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত’র সারা জীবনের চালচিত্রের ব্যবচ্ছেদ করা হলে এই চারটি শব্দের বাইরে অন্য কোনো বিশেষণ ব্যবহার করা সত্যিই কঠিন।
দীর্ঘদেহী সুপুরুষ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ভাটি অঞ্চলের মানুষের কাছে রূপকথার নায়ক হিসাবে বিবেচিত ছিলেন। তাঁর জ্বালাময়ী বাগ্মিতা, জ্ঞানগর্ভ বিশ্লেষণ, শব্দবাণে প্রতিপক্ষকে ফালাফালা করে দেয়ার ক্ষমতা, গণমন পাঠ করার কুশলতা; সবকিছু মিলিয়ে এই রূপকথার নায়কের চরিত্র তৈরি হয়েছিলো। তখন আমাদের ছোটবেলা। বালুর মাঠে (বর্তমান পৌরমার্কেট) ন্যাপের জনসভা। তিনি তখন ন্যাপ করতেন। প্রধান অতিথি পার্টি প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। রীতি অনুযায়ী সভাপতির বক্তব্যের আগে প্রধান অতিথি বক্তব্য দিয়ে থাকেন। অর্থাৎ প্রধান অতিথির বক্তব্যের পর আর কোনো বক্তা থাকেন না। কিন্তু সেই সভায় প্রধান অতিথি না হয়েও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন শেষ বক্তা। অধ্যাপক মোজাফফর বক্তব্য দেয়ার পর মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন সুরঞ্জিত। সভার আয়োজকরা সংগত কারণেই আশঙ্কা করেছিলেন সুরঞ্জিত বক্তব্য দেয়ার পর দর্শক কমতে শুরু করবে। তখন পার্টিপ্রধানের বক্তব্য শোনার মতো যথেষ্ট দর্শক উপস্থিত থাকবেন না। তাই কৌশলগত কারণেই আয়োজকরা সুরঞ্জিতকে শেষ বক্তা করে জনসমাগমকে ধরে রেখেছিলেন। এই হলো সেনগুপ্তের ক্যারিশমা। তিনি দর্শকশ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে কিংবা সম্মোহিত করে ধরে রাখতে পারতেন। তিনি যখন ন্যাপ ছেড়ে একতা পার্টি গঠন করেন তখন সুনামগঞ্জের এক জনসভায় ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে উদ্দেশ্য করে বক্রোক্তি ঝেড়েছিলেন এই বলে তিনি সারা জীবন অধ্যাপকই থেকেছেন অধ্যক্ষ আর হতে পারলেন না। এমনই ছিলো তাঁর কথার সুতীক্ষ্ন ধার। প্রখর মেধার সাথে এই অসাধারণ বাগ্মিতাই তাঁকে এক প্রত্যন্ত হাওর জনপদের অনালোকিত কোণ থেকে জাতীয় পর্যায়ের নেতায় পরিণত করতে সহায়তা করেছিল বললে অত্যুক্তি করা হবে না। শুধু জনসভায় নয়, যেকোনো একাডেমিক আলোচনায়ও তিনি সমান উজ্জ্বল। জাতীয় সংসদে সুরঞ্জিতের বক্তব্য শোনার জন্য অপরাপর সংসদ সদস্যরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন। জটিল সমস্যার তাৎপর্যপূর্ণ সমাধানসূত্রের জন্য নিজদল ও অন্যদল সকলেই সেনগুপ্তের উপর নির্ভর করতে পারতেন। আইনি ব্যাখ্যায় তিনি অসংখ্য রেফারেন্স সহকারে যে যুক্তি উপস্থাপন করতেন সংসদীয় প্রশিক্ষণে সেগুলো উচ্চমূল্যের। অন্যদিকে বিরোধী সদস্যরা তটস্থ থাকতেন কখন তিনি কাকে কোন শব্দতিরে রক্তাক্ত করে ফেলেন সে নিয়ে। তাঁর মৃত্যুর পর বিবিসির কাছে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে জ্যেষ্ঠ আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমদ বলেছেন, ‘‘তিনি যখন পার্লামেন্টে বক্তৃতা করতেন সকল সদস্য সেটা তন্ময় হয়ে শুনতেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নাম সব সময় লেখা থাকবে।’’ [সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত: অভিনেতা থেকে নেতা- মীর সাব্বির, বিবিসি নিউজ বাংলা, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭]। সংসদে দেয়া তাঁর বক্তব্যগুলো রাজনীতিবিজ্ঞানের অপরিহার্য পাঠে পরিণত হতে পারে অনায়াসে। কিন্তু তাঁর অমূল্য সংসদবক্তব্যের কোনো সংকলন আমাদের চোখে পড়ে না। এও এক জাতির জন্য দুর্ভাগ্য বটে।
সেনগুপ্ত সম্পর্কে একটি অপ্রচলিত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য দেখতে পাই সুশান্ত দাস নামক এক ভদ্রলোকের লেখায়। সুরঞ্জিতকে তিনি ‘‘চাঁনকপালী ঢেউয়ের মতো রাজনীতির গর্জন’’ এর সাথে তুলনা করে ১৯৭০ এর নির্বাচনে নৌকা প্রতীক ছাড়া তাঁর নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টিকে ‘‘গুন্ডা রুই মাছের ন্যায় দাপটী’’ উপমাবদ্ধ করেছেন [ www.kalniview.com ] । হাওরের বড় বড় ঢেউগুলোকে ভাটি অঞ্চলে চানকপালী ঢেউ বলেন স্থানীয়রা। আর হাওরস্থ গহীন বিলে বেড়ে উঠা সুস্বাদু অতিকায় রুই মাছগুলোকে গুন্ডা রুই বলেন তারা। সেনগুপ্তের জন্ম অঞ্চলের পরিবেশ প্রতিবেশ ও বুলি ব্যবহার করে সুশান্ত সেন-চরিত্রের যে চিত্রকল্প তৈরি করেছেন তা বেশ অসাধারণ লেগেছে আমার কাছে। ভাটি অঞ্চলের জীবন কতটা কষ্টকর ও সংগ্রামী তা ’ভাইট্যাইল্যা’রা ছাড়া আর কেউ বুঝবেন না। যেমন সেখানে জীবনের অনিশ্চয়তা তেমনি জীবিকার সীমাবদ্ধতা। হাওর ভরা জমি আর বিল ভরা মাছের উপর গণ-ভাইট্যাইল্যাদের অধিকার ছিল না। অবশ্য শ্রী সেনগুপ্ত আদতে ভাইট্যাইল্যা ছিলেন না। তাঁর পিতা কর্ম উপলক্ষে দিরাই এসেছিলেন। এখানেই জন্ম সুরঞ্জিতের। তাই বংশানুক্রমিক না হলেও জন্মসূত্রে তিনি ভাইট্যাাইল্যার উত্তরাধিকারত্ব পেয়েছিলেন। এই জন্মসূত্র আর ছিন্ন হয়নি জীবনাবধি। সুশান্তের দেয়া তথ্য মতে জন্মের আগেই তিনি বাবাকে হারান আর মা চিরবিদায় নেন তাঁর বয়স যখন এগারো তখন। অর্থাৎ জীবনের সবচাইতে কঠিন সময়টাতেই তিনি পিতৃ-মাতৃহীন হয়ে পড়েন। এমন অবস্থায় টিকে থাকাই যেখানে দুষ্কর সেখানে রীতিমতো স্বনামে প্রতিষ্ঠিত হওয়াটা প্রবল আফাল আর ঢেউ থেকে ছোট্ট একটি নৌকাকে বাঁচানোর মতোই কঠিন কাজ। জীবনের শুরু থেকেই তার হাওরের চানকপালী ঢেউয়ের সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকা ও গুন্ডা রুই মাছের মতো বেড়ে উঠাটা যে কতটা সংগ্রামমুখর ছিলো তা আমরা বেশ বুঝতে পারি। পেরেছিলেন বলেই তিনি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত হয়ে বাংলাময় ভাটিশার্দূল হিসাবে পরিচিত হতে পেরেছিলেন, হাসান শাহরিয়ার তাঁকেই হাওরের চন্দন বৃক্ষ অভিধায় অভিহিত করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর দৈনিক সুনাগঞ্জের খবর প্রধান সংবাদ শিরোনাম করেছিল ‘রাজনীতির কবি চলে গেলেন একেবারে’ [দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭]। রাজনীতিকে তিনি এমন শিল্প-সুষমাম-িত করে তুলেছিলেন যে, গণমাধ্যম সেটিকে উপেক্ষা করতে পারেনি। রাজনীতিও কবিতার মতো সর্বাঙ্গ সুন্দর হতে পারে সুরঞ্জিত-চরিত্র সেটি উদ্ভাসিত করতে পেরেছিল বলেই তিনি এমন বিদায়শংসাশোভিত হতে পেরেছিলেন।
সুরঞ্জিত-জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অধ্যায় হলো স্বাধীনতাযুদ্ধে তাঁর বীরত্বব্যঞ্জক অংশগ্রহণ। ১৯৭০ সনের ১৭ ডিসেম্বর তারিখে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে সিলেট-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনে ন্যাপের মনোনয়নে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আওয়ামী লীগের শক্তিশালী প্রার্থী অক্ষয় কুমার দাসকে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো এমপিএ নির্বাচিত হন। এই অক্ষয় কুমার দাস অবিভক্ত ভারতবর্ষ, পাকিস্তান এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশ আমলের এক ডাকসাইটে রাজনীতিক ছিলেন। অক্ষয় কুমার দাস ‘‘১৯৩৪-৩৭ সাল পর্যন্ত সুনামগঞ্জের লোকাল বোর্ডের সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩৭ সালে তিনি আসাম প্রাদেশিক আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩৮ সালে স্যার সাদ উল্লার মন্ত্রী সভায় যোগদান করেন। পরে তিনি মি: গোপীনাথ বড়দলই মন্ত্রী সভায়ও যোগদান করেছিলেন। ১৯৪৬ সালে তিনি দ্বিতীয়বার এমএলএ নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৪৭ সালের আগস্ট পর্যন্ত ভারতীয় গণপরিষদের সদস্য হিসাবে ভারতের শাসনতন্ত্র রচনার কাজে অবদান রাখেন। পরে তিনি ১৯৪৭-৫৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য হিসাবে পাকিস্তানের ৫৬ সালের প্রণীত শাসনতন্ত্র রচনায় অবদান রাখেন। তিনি ১৯৫৪ সালে তৃতীয় বারের মত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৫ সালে চৌধুরী মুহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে গঠিত পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার মন্ত্রী সভার অর্থনৈতিক বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯৫৬ সালে তিনি ড: খান সাহেব সভায়ও তিনি একই দপ্তরে বহাল থাকেন। ১৯৫৭-৫৮ সালে তিনি ফিরোজ খান নুন মন্ত্রী সভার শিক্ষাবিভাগীয় প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত হন ও সামরিক শাসন জারির পূর্ব পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন।’’ [সুনামগঞ্জ জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যÑ আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইন, জালালাবাদ এসোসিয়েশন, ঢাকা কর্তৃক প্রকাশিত, ১৯৯৫]। পরে তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। তফসিলি সম্প্রদায়বহুল দিরাই-শাল্লার এই তফসিলি নেতার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জিতে আসা যে মুখের কথা নয় সেটি বুঝাতেই অক্ষয় কুমার দাসের এইটুকু ঠিকুজি উল্লেখ করলাম। সকলের জানা, ১৯৭০ সনের নির্বাচন ছিলো বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের পক্ষে এক গণজোয়ার। গণজোয়ারের এই প্রমত্ত স্রোতে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে পরাজিত করে সুরঞ্জিতের বিজয় যেমন এক রাজনৈতিক বিস্ময় ছিলো তেমনি ব্যক্তি সুরঞ্জিতের পরবর্তী জীবনের গতিপথও নির্ধারণ করে দেয় এই বিজয়। প্রশ্ন আসে সুরঞ্জিত কেন তখন আওয়ামী লীগ না করে ন্যাপ করতেন। আমরা জানি, দিরাই-শাল্লায় বামপন্থীদের প্রভাব ছিলো বেশি। কমরেড বরুণ রায় আত্মগোপন অবস্থায় শাল্লা-দিরাই অঞ্চলে অবস্থান করে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করতেন। এসময় শ্রীকান্ত দাস, গুলজার আহমদ প্রমুখের সান্নিধ্য পেয়েছেন শ্রী সেনগুপ্ত। গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সাংগঠনিক সভা-সম্মেলন ইত্যাদি এই ভাটি অঞ্চলের গোপন আস্তানায় অনুষ্ঠিত হত। ফেরারী কমরেডদের নিরাপদ অবস্থান ছিল এই এলাকার বিভিন্ন ডেন। দুর্গম হাওরাঞ্চলে খুব সহজে পুলিশ সর্বত্র যাতায়াত করতে পারত না। তাই হাওরের গ্রামগুলো ছিল আত্মগোপনের জন্য আদর্শ এলাকা। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত তরুণ থাকা অবস্থায়ই এসব নেতাদের সংস্পর্শে এসেছিলেন, এ ধারণা করা খুব সংগত। নইলে রাজনীতিতে তাঁর উত্থানের সম্ভাবনা ছিল খুব কম। ন্যাপ যদিও আওয়ামী লীগ ভেঙেই তৈরি দল, তবুও ১৯৬৯ সনের পূর্ব পর্যন্ত এই অঞ্চলে আওয়ামী লীগ খুব শক্তিশালী সংগঠন ছিল না। মূলত বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ছয় দফা পেশ করার পর আওয়ামী লীগের তুণমূলের সাংগঠনিক বিস্তৃতি সারা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭০ সন কিংবা সুরঞ্জিত যখন রাজনীতি শুরু করলেন তখন তাঁর আওয়ামী লীগের পরিবর্তে ন্যাপকে বেছে নেয়ার আরেকটি কারণ আমরা অনুমান করতে পারি। ১৯৭০ সনে আওয়ামী লীগে দিরাই-শাল্লা অঞ্চলে অক্ষয় কুমার দাস ও আব্দুস সামাদ আজাদ এঁর মতো ব্যক্তিরা নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। সামাদ আজাদ অবশ্য পুরো সিলেট জুড়েই নেতৃস্থানীয় ছিলেন। এমন একটি অবস্থায় সুরঞ্জিত বুঝেছিলেন, আওয়ামী লীগে যোগ দিলেও নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পাওয়া কঠিন হবে। জনপ্রতিনিধি হয়ে জনসেবা তথা দেশসেবার ইচ্ছা পূরণের জন্য তিনি তাই আওয়ামী লীগের চাইতে ন্যাপকেই পছন্দ করলেন। বরুণ রায়ও তাঁকে চাইছিলেন। এ প্রসঙ্গে নজির হোসেনের বক্তব্য এমন ‘‘শাল্লা-দিরাই এর এই এমপিএ পদটির জন্য রব্বানী ভাই ও গোলজার আহমদ প্রার্থী ছিলেন। সুনামগঞ্জ এর গোপন পার্টি সেল গুলজার আহমদকে প্রার্থী করার জন্য জেলা কমিটিতে প্রস্তাব পাঠায়। কিন্তু বরুণদার বিশেষ উদ্যোগের ফলে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে নির্বাচনে প্রার্থী করা হয়।’’ [সুনামগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধ যেভাবে দেখেছিÑ নজির হোসেন, দ্যু প্রকাশন, ২০১৯]। ১৯৭০ সনের নির্বাচনে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটিয়ে পুরো দেশকে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের ছায়াতলে নিয়ে আসতে পেরেছিলেন, এই সর্বপ্লাবী আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুময় সময়ে সুরঞ্জিতের জিতে আসার পেছনে শাল্লা-দিরাই অঞ্চলে বাম প্রভাব, বরুণ রায়ের সমর্থনের সাথে ব্যক্তি সুরঞ্জিতের ক্যারিশমাও ভাল ভূমিকা রেখেছে। বক্তৃতার মাধ্যমে সম্মোহিত করে রাখার অনায়াস দক্ষতা তাঁকে মানুষের অন্তরে জায়গা করে দিয়েছিল। এই ক্যারিশমা তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বজায় রাখতে পেরেছিলেন।
ঐতিহাসিক এই নির্বাচনের পরবর্তী পরিপ্রেক্ষিত হিসাবে আসে স্বাধীনতা যুদ্ধ। যুবক সুরঞ্জিতও বুঝে নেন কী তাঁর কর্তব্য। সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রামের সূচনালগ্নেই তিনি যথাকর্তব্য বেছে নেন। ভাটি তথা হাওর অঞ্চলব্যাপী বিস্তৃত টেকেরঘাট সাবসেক্টর গঠনে উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। এ জন্য যোগাযোগ করেন ভারতীয় সামরিক কর্মকর্তাদের সাথে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসাবে গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদার সাথে সুদর্শন ও সপ্রতিভ সেনগুপ্ত ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী হওয়ার কারণে দ্রুতই ভারতীয় সামরিক কর্তাদের নিজ বক্তব্যের সপক্ষে নিয়ে আসতে সক্ষম হন। টেকেরঘাট সাবসেক্টরের বীর মুক্তিযোদ্ধা সালেহ চৌধুরী ও নজির হোসেন লিখেছেন, শিলং-এ অবস্থিত ১০১ কম্যুনিকেশন জোন এর অধিনায়ক মেজর জেনারেল গুরখস সিং গিলের সাথে শিলংয়ের কোন এক স্থানে সেনগুপ্ত’র সাক্ষাৎ ঘটে। সেখানেই সিদ্ধান্ত হয় টেকেরঘাট সাবসেক্টর প্রতিষ্ঠার। গিল ওয়ারলেস আলাপনে মুজিবনগর সরকারের অনুমতি গ্রহণ করে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে সাবসেক্টরের কমান্ডার নিযুক্ত করেন [ভাটি এলাকার মুক্তিযুদ্ধ/ আমার অহংকার- সালেহ চৌধুরী, অন্যপ্রকাশ, ২০১৭ এবং সুনামগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধ যেভাবে দেখেছি- নজির হোসেন, দ্যু প্রকাশন, ২০১৯]। শুরুতে মেজর রবীন্দর কুমার, মেজর বাথ, ক্যাপ্টেন ভার্মা প্রমুখ সামরিক কর্মকর্তা এই সাবসেক্টরে সেনগুপ্তকে সামরিক সহায়তা প্রদানের জন্য নিযুক্ত হন। তাহিরপুর, জামালগঞ্জ (একাংশ), জগন্নাথপুর (পশ্চিম), দিরাই, শাল্লা, ধর্মপাশা (আংশিক), মধ্যনগর, নবীগঞ্জের উত্তর দিক, বানিয়াচং (আংশিক), কিশোরগঞ্জের নিকলী থানা ছিলো এই সাবসেক্টরের অন্তর্ভুক্ত [রক্তাক্ত ৭১ সুনামগঞ্জ- বজলুল মজিদ খসরু, সাহিত্য প্রকাশ, ২০১২]। বিশাল এই ভাটি অঞ্চলে গেরিলা কায়দায় পাকবাহিনির বিরুদ্ধে সামরিক প্রতিরোধ শুরু হয় সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নেতৃত্বে। নদীপথ ও হাওরাঞ্চলের মতো ভৌগোলিকভাবে প্রতিকূল এই সাবসেক্টরটি কৌশলগত কারণে পাকবাহিনিকে পর্যুদস্ত করার জন্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নদীপথে পাকবাহিনির রসদ ও সামরিক সরঞ্জামাদি পরিবহন করাকে রীতিমত ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে সক্ষম হয় এই সাবসেক্টরের বীর মুক্তিযোদ্ধারা। দাসপার্টি খ্যাত জগৎজ্যোতি দাস এই সাবসেক্টরের অধীনে থেকেই অনেক ঝুঁকিবহুল অপারেশন পরিচালনা করেন। পরে অবশ্য এই সাবসেক্টরে ক্যাপ্টেন মুসলিম উদ্দিনকে সাবসেক্টর কমান্ডার হিসাবে পদায়ন করা হয়। সাবসেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব ছাড়ার পর সেনগুপ্ত মুক্তিযুদ্ধ সংগঠকের ভূমিকায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।
সুরঞ্জিত কেন অংশ নিয়েছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধে? এর উত্তর মিলে তাঁর নিজেরই লেখায়। খুবই কম লিখেছেন তিনি। তিনি কোনো আত্মজীবনী লিখে যাননি। লিখলে অনেক অজানা তথ্য জানা যেত। যাহোক তিনি বলেছেন, ‘‘মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধটা শুরু হয়েছে মুক্তির জন্য। সেই মুক্তিটা কী ? সেই মুক্তি দ্বিজাতিতত্ত্বের হাত থেকে বাঙালি জাতিসত্তাকে উদ্ধার করা। সেই মুক্তি সাম্প্রদায়িকতার হাত থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও তার সাহিত্য-দর্শনকে রক্ষা করে স্বকীয় স্বাধীন সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করা। সেই মুক্তিটা কী ? সেই মুক্তি একটি সমাজ বিপ্লব।’’ [ একাত্তরের প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য- সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, একাত্তরের সুনামগঞ্জ, বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু ও রেহান উদ্দিন আহমেদ রাজু সম্পাদিত, চৈতন্য, দ্বিতীয় প্রকাশ, মার্চ ২০১৫]। স্পষ্টতই তিনি রাজনৈতিক জীবনের সূচনালগ্নে মানবমুক্তির যে অঙ্গীকার অন্তরে ধারণ করেছিলেন যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করাই ছিলো তাঁর উদ্দেশ্য। সেনগুপ্ত বা ত্রিশ লাখ শহীদ অথবা রণাঙ্গনের সকল বীর মুক্তিযোদ্ধা, সম্ভ্রম বিলানো নারী, দেশত্যাগী শরণার্থী, যুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখা সকল ব্যক্তি; সকলেরই লক্ষ্য ছিলো একাত্তরের এই যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পাশাপাশি মানবমুক্তির মহান আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন ঘটানো। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে বলা যেতেই পারে, মানবমুক্তির পথের শেষ সীমানায় পৌঁছাতে হলে আমাদের আরও অনেক দূর হাঁটতে হবে। সেনগুপ্তও সেই সত্য বুঝতেন। বুঝতেন বলেই তিনি বলতে পেরেছেন, ‘‘তাই আমার মনে হয় যুদ্ধটা হয়েছে, মুক্তি হয়নি। সুতরাং মুক্তির এই যুদ্ধ চলছে, চলবে। …. এই যুদ্ধকে আমরা ইতিহাসে রেখে যাব আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য, যারা আরেকটি যুদ্ধ করবে। এই যুদ্ধের চূড়ান্ত রূপ দেবে তারা, আনবে প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ মুক্তি।’’ [প্রাগুক্ত]।
কিন্তু মানবমুক্তি আসলে কী ? মানুষ কি কখনও মুক্ত ছিলো নাকি আদৌ কখনও মুক্ত হতে পারবে ? কথায় আছে, মানুষ জন্মায় স্বাধীন হয়ে এরপর ক্রমশ সে নানা শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ে যায়। মানুষের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এই সত্যই জানা যায় যে, সর্বদা সর্বকালে মানুষ কোনো না কোনোভাবে কম-বেশি শৃঙ্খলিতই ছিল। পাখি যেমন যখন ইচ্ছা তেমন উড়ে যেতে পারে, পশু যেমন যদিচ্ছা চলতে পারে; মানুষ তেমন পারে না। কারণ প্রাণীজগতের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বুদ্ধিমান হচ্ছে মানুষ। তাই মানুষের মধ্যে শুভ ও অশুভ প্রবণতা তৈরির সুযোগ অবারিত। কিছু মানুষ বুদ্ধির জোরে শক্তিমান হয়ে অন্য আরও অনেক মানুষের উপর আধিপত্য কায়েম করতে পারঙ্গমতা দেখিয়ে আসছে সেই আদিকাল থেকেই। পরিমাণগত পার্থক্য বাদ দিলে এই আধুনিক যুগেও এমন প্রবণতার গুণগত কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। কিছু শৃঙ্খল ছাড়া কিছু বন্ধন ছাড়া কিছু নিয়ম ছাড়া মানুষের সভ্যতা টিকতে পারে না। তবে আমরা এখন যখন মানুষের মুক্তির কথা বলি, তখন সেই কথার মধ্যে কিছু আকাক্সক্ষা থাকে । তা হলোÑ কিছু মানুষের তৈরি আধিপত্যবাদের অবসান ঘটিয়ে সকল মানুষের স্বস্তিদায়ক একটি সমাজ বিনির্মাণ করা। সম্পদের উপর সমগ্র মানবগোষ্ঠীর সুষম অংশিদারিত্ব নিশ্চিত করা। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, জাতি বা অন্য যেকোনো পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের অবলোপন। মানুষের সৃজনশীলতার ধর্ম অনুসারে সর্বদা প্রগতির পথে ধাবিত হওয়া। যখন কোনো সমাজ, রাষ্ট্র অথবা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এমন অর্জন সম্ভব হবে তখনই কেবল বলা সম্ভব মানুষের সত্যিকার মুক্তি অর্জিত হয়েছে। কিন্তু তা তো বলার মতো অবস্থা নেই। পৃথিবীর অসীম সম্পদরাশিকে করায়ত্ত করে রাখতে দরকার ক্ষমতার। ক্ষমতার কারণে দরকার বিভেদ, শাসন, অন্ধবিশ্বাস ও নানারকম ফন্দিফিকির। পৃথিবী যত আধুনিক হচ্ছে এইসব চাতুরীপনার বিস্তৃতি তত বেড়ে চলেছে। কোনো রাষ্ট্রই এর বাইরে নয়। এর বিপরীতে ইতিহাসের নানা সময়ে নানাজন এইসব চাতুরিপনার স্বরূপ উন্মোচন করেছেন, প্রয়াসী হয়েছেন তদপেক্ষা উন্নততর জীবনবোধের। সম্পদের সামাজিকীকরণ ও চিন্তার অন্ধত্ব দূরিকরণের মধ্য দিয়ে মানুষে মানুষে বৈষম্য দূর করার রাজনৈতিক দর্শনের উদ্ভব, অনুশীলন, রূপায়ণ ও পতন দেখেছি আমরা গত শতক ও এর আগের শতকে। একসময় বিশ্ব-রাষ্ট্রের ধারণার মর্মার্থ ছিলো আধিপত্যের সীমানা বাড়ানো। প্রাচীনকালে যেমন আলেকজান্ডার বিশ্ব জয় করতে চেয়েছিলেন, সম্রাটরা যুদ্ধবিগ্রহের মধ্য দিয়ে নিজেদের শাসন-শোষণ ভূমির পরিমাণ বাড়িয়েছেন, ঔপনিবেশিক আমলে ইংল্যান্ডের রাজশক্তি যেমন ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যে সূর্য অস্তমিত না হওয়ার বাসনা করেছিলেন; তেমনি এই আধুনিক কালেও কোনো রাষ্ট্রবিশেষ অন্য রাষ্ট্রগুলোেকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। আধিপত্যবাদী এই বিশ্ব-রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিপরীতে আরেকটি বিশ্ব-রাষ্ট্র ব্যবস্থা স্থাপনের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন কার্ল মার্কস। তিনি শ্রেণিশোষণের অবসান ঘটিয়ে এক সাম্যবাদী বিশ্ব গড়ে তোলার তাত্ত্বিক ভিত্তি দিয়ে গিয়েছেন। ১৯৩২ সনের ২৫ এপ্রিল জওহরলাল নেহেরু কন্যা ইন্দিরা গান্ধীকে এমন বিশ্ব-ব্যবস্থা মাথায় রেখে লিখা এক চিঠিতে বলেছিলেন, ‘‘এ হচ্ছে বিশ্ব-প্রজাতন্ত্র, যেখানে এক জাতি বা শ্রেণী অন্য জাতি বা শ্রেণীকে শোষণ করতে পারবে না। অদূর ভবিষ্যতে এই পরিকল্পনা বাস্তব রূপ পাবে কিনা বলা শক্ত। তবে এ ধরনের কিছু-একটা গড়ে না তুললে পৃথিবী দুর্দশার হাত থেকে রেহাই পাবে না।’’ [গ্লিম্পসেস অব ওয়ার্লড হিস্ট্রি- জওহরলাল নেহেরু, আহমদ হেলাল কর্তৃক বালায় অনুদিত ও সম্পাদিত, চারদিক কর্তৃক প্রথম বাংলাদেশ সংস্করণ ২০১৩]। কিন্তু এর আগেই ভ. ই. লেনিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্রীয় সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র স্থাপনের মধ্য দিয়ে এমন বিশ্ব-ব্যবস্থার উন্মেষ শুরু হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু অন্তর্ঘাত ও বাইরের চক্রান্তের কাছে পরাভূত হয়ে ওই মানবিক সমাজ ব্যবস্থার পতন ঘটে গত শতকে। এভাবে পৃথিবী কখনও দুই পা এগিয়েছে তো কখনও এক পা পিছিয়েছে। পরিবর্তনের নিরন্তর ইতিবাচক প্রক্রিয়াই হলো এগিয়ে যাওয়ার পূর্বশর্ত। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তরা এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায়ই নিজেদের সমর্পণ করেছিলেন ইতিহাসের ওই মহাসন্ধিক্ষণে। ফলাফল কী, পরবর্তী সময়ে তাঁদের কী ভূমিকা; সেসব নির্ধারণের দায়িত্ব ইতিহাসের। আমরা সেই বিতর্কে না গিয়ে শুধু এটুকু বলতে পারি, শ্রী সেনগুপ্ত রাজনৈতিক জীবনের প্রারম্ভে যে সাম্যবাদের শপথ গ্রহণ করেছিলেন একাত্তরে সেই আলোকেই তিনি ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিলেন।
বিজয় লাভের পর স্বাধীন রাষ্ট্রের সংবিধান রচনার জন্য রাষ্ট্রপতির আদেশে ৪০৩ সদস্যের যে গণপরিষদ গঠন করা হয়, এমপিএ হিসাবে সুরঞ্জিত ছিলেন তার একমাত্র বিরোধীদলীয় সদস্য। সংবিধান পরিষদের সদস্য হিসাবে তিনি মনে রেখেছিলেন নিজের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কথা। তাই ‘‘জনগণের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি বলে তৎকালীন বিরোধীদলীয় (ন্যাপ) একমাত্র গণপরিষদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এতে সাক্ষর করেননি।’’ [ বাংলাদেশের রাজনীতি ১৯৭২-১৯৭৫Ñ হালিম দাদ খান, আগামী প্রকাশনী, ২০০৪]। সংবিধানে স্বাক্ষর না করার সুনির্দিষ্ট একটি কারণ জানা যায় হাসান শাহরিয়ার এর লেখা থেকে। তিনি বলছেন, ‘‘শেষমেশ সংবিধান প্রণীত হলো, কিন্তু অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক না করায় তিনি সংবিধানের মূল দলিলে স্বাক্ষর করেননি।’’ [প্রাগুক্ত]। যেকোনো জাতির অগ্রগতির প্রধান পূর্বশর্ত হচ্ছে শিক্ষা। তিনি সেটি বুঝেছিলেন। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই শিক্ষার যে গুরুত্ব তিনি বুঝেছিলেন, কয়েক দশক পর সরকার সেটি অনুধাবন করতে সক্ষম হয়। এখন প্রাথমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক রাষ্ট্র কর্তৃক বিনামূল্যে সরবরাহ, নারী শিক্ষার্থীদের বিশেষ সুযোগ প্রদান, উপবৃত্তি চালু; ইত্যাদির মধ্য দিয়ে যেন সুরঞ্জিতের সেই দাবির যথার্থতা প্রমাণ করা হলো। ১৯৭২ সনে তাঁর বয়স ২৭ বছর। মানে স্পর্ধিত যৌবন। কবি হেলাল হাফিজ তো বলেই দিয়েছেনÑ‘‘এখন যৌবন যার, মিছিলে যাওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’’ [নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়- কবি হেলাল হাফিজ, কাব্যগ্রন্থ যে জলে আগুন জ্বলে]। সুরঞ্জিত যৌবনের অমিত সাহস দেখাতে সক্ষম হয়েছিলেন যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে। সারা জীবন প্রতিবাদের অগ্নিলাভা সমানভাবে উদগীরণ হয়তো তিনি করতে পারেননি। রাজনৈতিক অবস্থান, দর্শন, বিশ্বাস কিছুটা বদলেছে তাঁর। রাজনীতিক হয়ে উঠার সূচনালগ্নের অটল আস্থা ‘সাম্যমন্ত্রে’ অবিচল থাকেননি। তবে প্রবল ব্যক্তিত্ববোধের কারণে আত্মাভিমানকে কখনও বন্ধক দিতে পারেননি। সাম্যবাদ না হলেও গণতন্ত্রে আস্থা একচুল টলেনি। আর স্পষ্টভাষী, কটূভাষীর দুর্নাম বা সুনাম জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তার গায়ে লেপ্টে ছিলো অলংকার হয়ে।
১৯৭০ সনে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এমপিএ নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে জনপ্রতিনিধিত্বের যে মুকুট মাথায় পড়েছিলেন মৃত্যু অবধি তাঁর মাথায় সেই মুকুট পরিহিত ছিলো। ১৯৭০ এর প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি সাত বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর জীবিতাবস্থায় বাংলাদেশে যে দশটি সংসদীয় নির্বাচন হয় তার সাতটিতেই তিনি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে যে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন সেটি তার ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তার প্রমাণ। তিনি স্বল্পকালীন রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেখান থেকে তাঁকে সরে যেতে হয়। রেলমন্ত্রী হওয়ার পর সুরঞ্জিত বলেছিলেন- আমি শেষ ট্রেনের যাত্রী। সত্যিই এরপর আর কোনো ট্রেন তাঁকে বহন করতে আসেনি। সুরঞ্জিতের মতো প্রাজ্ঞ রাজনীতিক, যিনি স্বাধীনতা যুদ্ধ, সংবিধান প্রণয়ন, সংসদীয় বিতর্ক, সংবিধান সংশোধনসহ নানা জটিল জাতীয় ইস্যুতে মুখ্য ভূমিকা রেখেছেন তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে দেখতে চেয়েছিলেন সকলে। কিন্তু তিনি সেই সুযোগ পাননি। এটি বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দুর্ভাগ্য বটে। এই হতাশা শেষ জীবনে তাকে তুষের আগুনের মতো দগ্ধ করেছে। যথাযথ মূল্যায়ন না পাওয়ায় বরং কূটকৌশলের শিকার হওয়ায় তিনি শেষ বয়সে অশেষ মনোবেদনায় আক্রান্ত ছিলেন। এই সময় সম্পর্কে সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ারও বলছেন, ‘‘গত বেশ কিছুদিন ধরে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত খুব ভেঙে পড়েছিলেন। রোগের চেয়ে মানসিক চিন্তাটাই বোধকরি বেশি ছিল।’’ [প্রাগুক্ত]।
শ্রী সেনগুপ্ত জীবনে যত বক্তৃতা দিয়েছেন, জনসভায়, সংসদে, সেমিনারে; এসব হতে পারে রাজনীতি সাহিত্যের অমূল্য উপাদান। কিন্তু তাঁর বক্তব্যের কোনো সংকলন আমার চোখে পড়েনি। জানি না কেউ এ নিয়ে কাজ করছেন কিনা। তবে রাজনীতিবিদদের রাজনীতিবিদ হয়ে উঠার জন্য, কুশলী সাংসদ হওয়ার জন্য, তেজস্বী বক্তা হওয়ার জন্য, মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখার কৌশল রপ্ত করার জন্য সেনগুপ্ত’র বক্তৃতাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই এ নিয়ে কেউ কাজ করলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনই সমৃদ্ধ হবে। তিনি কোনো আত্মজীবনী লিখে যাননি, অন্তত এখন পর্যন্ত আমরা তা পাইনি। বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনীতিকই লিখালিখির ক্ষেত্রে ততটা তৎপর নন। শ্রী সেনগুপ্তের লিখিত প্রবন্ধ-নিবন্ধ-বিশ্লেষণ তেমন একটা চোখে পড়ে না। সময়ের অভাবই বোধ করি এমনটা না হওয়ার কারণ। তবে যারা তাঁর কাছাকাছি হয়েছেন নানা সময়ে তারা যদি কিছুটা অভিজ্ঞতা লিখে যান তাহলে আমাদের লাভ।
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে-বিলে, ডুবায়, জলাভূমিতে লাল শাপলার প্রাচুর্য দেখা যায়। অক্টোবর-নভেম্বর মাসে লাল শাপলা পাঁপড়ি মেলে এক নয়ন মনোহর দৃশ্যের অবতারণা করে। সম্প্রতি শাপলাশোভিত কয়েকটি জলাশয় রীতিমত পর্যটন এলাকায় পরিণত হয়েছে। শাপলা বাংলাদেশের জাতীয় ফুলও বটে। এই শাপলার বিশেষত্ব হলো- এটি দীর্ঘজীবী। জল যখন নেমে যায়, বেরিয়ে আসে মৃত্তিকা, তখন সেখানে চাষবাস হয়। ফলে ধান বা অন্য কোনো কৃষিজ পণ্য। এর মধ্যেই বেঁচে থাকে শাপলার প্রাণ। আবার যখন জলে প্লাবিত হয় মাটি, জলের স্পর্শে তখন আবার সুপ্ত শাপলা-বীজগুলো জীবন্ময় হয়ে উঠে। জলের গভীর থেকে সবুজ লতা লকলকিয়ে উপরে উঠে আর জলের প্রান্তভাগে পাঁপড়িগুলো রূপের ডালির বিস্তার ঘটায়। বছর বছর কারো পরিচর্যা ছাড়া এরা নিজেরাই নিজেদের বংশ রক্ষা করে চলতে পারে। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আমাদের জলভাটির ঐতিহ্য-ঐশ্বর্য শাপলার মতোই মাটির গভীর ভিতরে লুকিয়ে থাকা প্রাণ-প্রাচুর্যের অফুরান উৎস। তিনি রাজনীতির সৌন্দর্যকে লাল শাপলার রূপময়তার মায়াজালে যেভাবে বন্দি করেছেন তেমনি এই সৌন্দর্যকে ছড়িয়ে দিয়েছেন দিগ থেকে দিগন্তে। রূপসী শাপলার মতোই তাঁর জীবন ও কীর্তি দীর্ঘজীবী হয়ে থাকবে।


