দেশে ঝূঁকিপূর্ণ কাজে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ থাকার পরও এমন বিপজ্জনক কাজে কেন শিশুশ্রম বন্ধ করা যাচ্ছে না তার কারণ অনুসন্ধান করে করণীয় ঠিক করতে হবে। নতুবা সমাজ থেকে শিশুশ্রম বন্ধ করার আকাক্সক্ষাটি বাস্তবায়ন করা খুব কঠিন কাজ হবে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে শহরে ইজিবাইক চালানোয় ব্যাপকভাবে শিশু চালকদের অংশগ্রহণের উপর একটি উদ্বেগজনক খবর প্রকাশিত হয়েছে। যেকোন যান চালানো অতিঅবশ্যই ঝূঁকিপূর্ণ কাজ। এসব কাজে শিশুদের অংশগ্রহণের ফলে তাদের জীবন বিপন্ন হতে পারে। বিশেষ করে যানবাহন চালানোর কাজে শিশুরা জড়িত থাকলে সেখানে তার নিজের প্রাণসহ যাত্রীদের সুরক্ষাও হুমকি কবলিত হয়। তবে একটু দৃষ্টি বুলালেই বুঝা যায়, শুধু ইজিবাইক চালানোর মধ্যেই শিশুদের অংশগ্রহণ থেমে নেই। বরং রিক্সা, গাড়ির হেল্পার, ওয়ার্কশপ, মিস্ত্রির জোগালো, হোটেল বয় এমন বহুক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে শিশুরা কাজ করছে। এখন প্রশ্ন হলো বিভিন্ন বিপজ্জনক কাজে এই যে ব্যাপক মাত্রায় শিশুরা জড়িত হয়ে পড়েছে সেটি কি শিশুরা ইচ্ছা করে খুশি মনেই করছে? শিশুদের যে বয়সে স্কুলে যাওয়া ও খেলাধূলা করার সময় সেই বয়সে তারা অর্থ উপার্জনের জন্য কষ্টকর কাজে নিয়োজিত হচ্ছে মনের আনন্দে সেটি ভাবার কোন কারণ নেই। এই শিশুরা বাধ্য হয়েই লেখাপড়া ছেড়ে অর্থ উপার্জনের জন্য কঠিন কঠোর শ্রমনির্ভর কাজে নিয়োজিত হচ্ছে। পরিবারের নিত্যকার অভাব একটুখানি ঘোচানোর জন্যই তাদের এই প্রয়াস। খোঁজ নিলে দেখা যাবে অনেক শিশুর এই সামান্য উপার্জনের উপরই তার পরিবারের ভরণপোষণ নির্ভরশীল। সুতরাং শিশুর পরিবারে অভাব রেখে তাদেরকে শ্রম বিক্রি করা থেকে বিরত করার চিন্তা হবে একটি অবাস্তব চিন্তা। তাই দেশে শিশুশ্রম নিষিদ্ধকরণ আইন থাকা সত্বেও মহামারির মতো এই অমানবিক প্রপঞ্চটি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। শিশুশ্রম নিবারণের একমাত্র উপায় হচ্ছে সমাজ থেকে দারিদ্র দূরিকরণ, রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্ব পালন তথা একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রীয় দর্শনের উপস্থিতি।
এখন হয়তো আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে শিশুদের কাজ করা থেকে বিরত রাখতে বাধ্য করা যেতে পারে। এটি করা হলে শিশুর পরিবারে নেমে আসবে অভাবের ভয়াল থাবা। শিশুটি তখন কাজ করতে পারবে না সত্য, কিন্তু এর মধ্য দিয়ে শিশুর নিজের ও তার পরিবারের জীবন ধারণ চরম বিপন্ন অবস্থায় পতিত হবে। এরকম অবস্থায় রাষ্ট্র বা সমাজ ওই শিশু পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করবে না। দায়িত্ব গ্রহণ না করলে তাকে শ্রম বিক্রি করা থেকে বিরত রাখা যাবে কোন মানবিক বোধ দ্বারা? এই প্রশ্নের উত্তর মিলানো না পর্যন্ত কঠোরভাবে সমাজ থেকে শিশুশ্রম নিবারণের চেষ্টা অমানবিক বিষয় হিসাবেই বিবেচিত হবে। তবে চরম ঝূঁকিপূর্ণ কাজ থেকে শিশুদের বিরত রাখতে অবশ্যই রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ও সমাজের বিভিন্ন অঙ্গকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। কর্মক্ষেত্রে শিশুদের সাথে মানবিক আচরণ করাও সমান জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিশুদের দিয়ে কাজ করিয়ে তাদেরকে উপযুক্ত মজুরি থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতির কারণে শিশুদের শারীরিক নির্যাতন করা হয়। অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। যারা এমন অমানবিক কা- করেন নিশ্চিতভাবেই তারা সভ্য মানব সমাজের কলঙ্ক। শিশুদের সাথে যারা এমন আচরণ করবেন তাদেরকেই আগে শাস্তি দিতে হবে।
ফুলের কুঁড়ির মতো প্রস্ফুটনন্মুখ শিশুদের বিকশিত করা তাদেরকে ভবিষ্যত রাষ্ট্রের উপযুক্ত নাগরিক হিসাবে গড়ে তোলার জন্য রাষ্ট্রের কল্যাণমুখী চরিত্র নির্ধারণে সর্বাগ্রে কাজ শুরু করতে হবে। তবেই একটা সময়ে শিশুশ্রমের মতো অমানবিক প্রপঞ্চকে দূরীভূত করা সম্ভব হবে।

