কুমার সৌরভ
আকস্মিক বজ্রাঘাতের মতো এই দুঃসংবাদটি আমার মগজকে কয়েক মুহূর্তের জন্য বিকল করে দিল। ধাতস্থ হতে কিছুটা সময় লাগল এবং তখন বুঝতে পারলাম বীর মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু এই নশ্বর পৃথিবীর মায়া ছেড়ে লোকান্তরিত হয়েছেন। চিকিৎসার জন্য বিন্দুমাত্র সময় না দিয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। যদি তিনি শয্যাশায়ী থাকতেন তাহলে মন এরকম দুঃসংবাদের জন্য প্রস্তুত থাকত। কিন্তু রোদ ঝলমল আকাশে যদি আকস্মিক বজ্রপাত শুরু হয় তখন সজ্ঞানে প্রফুল্ল থাকাটা মুশকিল হয়ে যায়। ২৪ ফেব্রুয়ারি রবিবারের বিকালটা আমাদের জন্য ছিল এমনই এক অভাবিত বিষাদময়তায় ভরা। একটি সংবাদ পুরো শহরকে স্তব্ধ করে দিল। শহর ছাড়িয়ে পুরো জেলা, তাঁর জন্মমাটি দোয়ারাবাজার, তাঁর সুহৃদমহল; সকলকে শোকস্তব্ধ করে দিল।
বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরুর এই চলে যাওয়ার মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠানের বিদায় ঘটল। বহু মানুষের হৃদয় খানখান করে দিয়ে তিনি চলে গেলেন। অনেকে কাঁদতেও ভুলে গেছেন। সাংবাদিক উজ্জ্বল মেহেদী তাঁর তাৎক্ষণিক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘‘বীর মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু, প্রিয় অভিভাবক আমার, কী করে বলি বিদায়? কাঁদতেও তো পারছি না।’’ এমন হৃদয় বিদারক খবর, এমন অনাহুত বাস্তবতা; মানুষের বোধশক্তিকে নিশ্চল করে দেয়। তাই তো চোখের পাতা বেয়ে অশ্রুধারা বইয়ে দিতেও ভুলে যায় মগজের কোষ। বহু মানুষ তাঁর সুশীতল স্নেচ্ছায়ায় থাকতেন। তাঁরা অভিভাবকহারা হয়ে পড়লেন। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের একজন অন্যতম উপদেষ্টা সম্পাদক ছিলেন তিনি। পত্রিকা প্রকাশের শুরু থেকেই তিনি উৎসাহ জুগিয়ে গেছেন অব্যাহতভাবে। এই উৎসাহ ও সমর্থন গত ৯টি বছর ধরেই ছিল সমভাবে প্রবহমান। তিনি যেমন কোনো সংবাদে আনন্দিত হয়েছেন তেমনি কোনো ভুল থাকলে ধরিয়ে দিয়েছেন। পত্রিকার সুসময়ে যেমন তিনি আনন্দে উজ্জ্বল হতেন তেমনি দুঃসময়ে ঢাল হয়ে বুক চিতিয়ে সাহসে সাহসী করতেন পত্রিকা কর্তৃপক্ষকে। আজ দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরও একজন পরম সুহৃদ অভিভাবককে হারাল।
জনাব খসরুর জীবন বৈচিত্রে ভরপুর। জীবনের একেবারে তারুণ্যে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। বেশ কয়েক বছর পশ্চিম জার্মানে প্রবাসী জীবন কাটিয়ে দেশে আইনজীবী হিসাবে থিতু হয়েছেন। আইন পেশায় নিজেকে অন্যরকম এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ইতিহাস নিয়ে চর্চা করেছেন। বই লিখেছেন। সংগঠন করেছেন। প্রগতিশীল মহলের সাংস্কৃতিক-সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিরন্তর পৃষ্ঠপোষকতা করে গিয়েছেন। মানুষের অধিকার নিয়ে আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। সর্বোপরি নিজের জীবনের পুরো সময়কালটিই তিনি শুভ ও সুন্দরের সাধনায় কাটিয়ে দিয়ে অবশেষে আকাশের তারা হয়ে গেলেন।
আইন পেশাটি ছিল তাঁর জীবন ও জীবিকার জায়গা। মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের বাইরে তিনি অন্য যে দুইটি কাজের জন্য মহত্ত্বম অভিধায় অভিষিক্ত হবেন তা হলো- মুক্তিযুদ্ধ চর্চা ও হাওরের বাঁধ আন্দোলন। সুনামগঞ্জ অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে অনুসন্ধানের কাজটি তাঁর মতো এতো গভীরে গিয়ে এখন পর্যন্ত আর কেউ করতে পারেননি। রক্তাক্ত ৭১ সুনামগঞ্জ গ্রন্থটির কয়েকটি সংস্করণ প্রকাশ এর বড় প্রমাণ। মুক্তিযুদ্ধ অনুসন্ধানের কাজটি শুরু করেন তাঁরা স্বাধীনতার পর থেকেই। গড়ে তুলেন মুক্তিযুদ্ধ চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র। এই সংগঠনের উদ্যোগে তাঁর ও রেহান উদ্দিন রাজুর যৌথ সম্পাদনায় আশির দশকে প্রকাশ হয় সংকলনগ্রন্থ একাত্তরের সুনামগঞ্জ। সম্ভবত এই সংকলনগ্রন্থটিই সুনামগঞ্জকেন্দ্রীক মুক্তিযুদ্ধ চর্চার প্রথম সংগঠিত উদ্যোগ। ‘রক্তাক্ত ৭১ সুনামগঞ্জ’ গ্রন্থটিতে তিনি বহু মূল্যবান প্রমাণ, তথ্য, দলিল ও ইতিহাস সংযোজন করেছেন। শুধু বই লিখে নয় বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে বহু উদ্যোগে প্রাণপুরুষ ছিলেন তিনি। সাবসেক্টর কমান্ডারদের নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্য দিয়ে পুরনো স্মৃতিকে তিনি সামনে নিয়ে আসার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। নিজেদের সম্মানী ভাতার টাকা নিজেরা না নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন ট্রাস্ট। অসহায় মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহায়তা করেছেন তিনি। এইসব কর্মপ্রয়াসের ফলে সুনামগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক অবস্থানে সর্বদাই তিনি অগ্রস্থানে থাকবেন। আরেকটি কাজ ছিল তাঁর, হাওর আন্দোলন। ২০১৭ খৃস্টাব্দে অকাল বন্যায় সুনামগঞ্জের সবগুলো বাঁধ ভেঙে হাওরের শতভাগ বোরো ফসল তলিয়ে যায়। এই প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠে হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন নামের অরাজনৈতিক সংগঠন। এপ্রিল ২০১৭ মাসে গঠিত এই সংগঠনের আহ্বায়ক ছিলেন বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু। সংগঠনটির উত্তাল আন্দোলনের কারণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ নির্মাণ বিষয়ক জাতীয় নীতিমালায় একটি মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হয়। আগে বাঁধের কাজের বড় অংশ ঠিকাদারী প্রথায় বাস্তবায়িত হত। অকাল বন্যার প্রাথমিক আঘাত না সামলিয়েই হাওর তলিয়ে যাওয়ার জন্য ঠিকাদারী প্রথার দুর্নীতিযুক্ত ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সামনে চলে আসে তখন। ফলে ২০১৮ সনে এসে সরকার শতভাগ বাঁধ স্থানীয় কৃষক ও সুফলভোগীদের সমন্বয়ে গঠিত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) এর মাধ্যমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেন। এই পদ্ধটিও এখনও প্রচলিত আছে। একটি আঞ্চলিক সংগঠনের কারণে জাতীয় নীতিমালা পরিবর্তন হয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চয়ই এই সংগঠন ও এর নেতৃবৃন্দের দৃঢ়তার পরিচয় বহন করে। জনাব খসরু এই কারণেও স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
জনাব খসরু সোনালী সকাল নামের একটি সংগঠনের প্রাণপুরুষ ছিলেন। মূলত স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য প্রভাত বেলা হাঁটার নিয়মিত অভ্যাস গড়ে তুলতেই এই সংগঠনের জন্ম। ক্রমে এই সংগঠনে বহু মানুষ যুক্ত হয়ে যান। সকালে হাঁটার ছলে সংগঠনভুক্ত সদস্যরা একটা সামাজিক শক্তিতে পরিণত হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁরা সকালে হাঁটার ফাঁকে নানা সচেতনতামূলক উদ্যোগ গ্রহণ করতেন, নিজেদের হৃদ্যতা বাড়াতে থাকত বিভিন্ন আন্তরিক আয়োজন। সোনালী সকাল নামের প্রভাতী হাঁটার সংগঠনটি এখনও থাকবে। তাঁরা হাঁটবেনও। কিন্তু থাকবেন না খসরু সাহেব। হাঁটার সাথীরা বহুদিন তাঁর অভাব অনুভব করবেন। হাঁটতে গিয়ে হুছট খাবেন তাঁর স্মৃতি স্মরণ করে।
১৯৫২ সনের ২ এপ্রিল তার জন্মতারিখ। এই হিসাবে তাঁর জীবনকাল ছিল ৬৯ বছরের কিছু কম। তিনি যেমন স্বাস্থ্যসচেতন ও শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন যাপনে অভ্যন্ত ছিলেন, তাতে এই বয়সে তাঁর চলে যাওয়ার কথা নয়। কিন্তু মৃত্যু বড় অনিশ্চিত, খুব বেশি অননুমেয়। তাঁর বন্ধু-সতীর্থ দীলিপ তালুকদার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, মৃত্যুর ২ ঘণ্টা আগেও তিনি তাঁর সাথে কথা বলেছেন। কী নিদারুণ আশ্চর্য- দুই ঘণ্টা, দুই মিনিট এমনকি দুই সেকেন্ড আগেও মৃত্যু কোনো পূর্বসংকেত প্রদান করে না। জীবনের পাশাপাশি মৃত্যুও এক বড় সত্য। সকলকেই এই মৃত্যুর অনিবার্যতার কাছে সমর্পিত হতে হবে। তবে সেইসব মানুষের মৃত্যু বুকের পাঁজর ভেঙে দেয় যারা জীবৎকালে নানা কীর্তিতে বহুজনকে প্রভাবিত করে গেছেন। বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু ছিলেন প্রভাবক মানুষ। তিনি নানাভাবে মানুষকে, সময়কে প্রভাবিত করেছেন। তাই তিনি হঠাৎবিস্মৃত হবেন না। মানুষের মনোলোকে জ্যোতিষ্মানই থাকবেন। এই মৃত্যুতে জগতের চলার গতি একটুও কমবে না জানি। কিন্তু আমরা প্রতিটি ক্ষণই তাঁর অভাব অনুভব করব। এই অভাব অনুভব করার নাম যদি হয় অমরত্ব তাহলে তিনি অমর পুরুষ হয়েই থাকবেন। ‘মানুষের মৃত্যু হলে’ কবিতায় জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন, ‘‘মানুষের মৃত্যু হ’লে তবুও মানব থেকে যায়;/ অতীতের থেকে উঠে আজকের মানুষের কাছে/প্রথমত চেতনার পরিমাপ নিতে আসে। আজকের আগে যেই জীবনের ভিড় জমেছিল/ তা’রা মরে গেছে/ প্রতিটি মানুষ তার নিজের স্বতন্ত্র সত্তা নিয়ে/ অন্ধকারে হারায়েছে;/ তবু তা’রা আজকের আলোর ভিতরে/ সঞ্চারিত হ’য়ে উঠে আজকের মানুষের সুরে’’। বজলুল মজিদ খসরুও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আমাদের ও ভাবী মানুষের অন্তরালোকে সঞ্চরিত হবেন নিশ্চয়ই। এইটুকোই তো তাঁর মানব জীবনের সার্থকতা।
তাঁর অমর স্মৃতির প্রতি এই অনুরক্তের অন্তহীন শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।


