খসরু ভাইকে নিয়ে দুয়েক কথা

ইকবাল কাগজী
তিন ॥ পাঠাগারের সঙ্গে ডিকড়া (দিকদাড়া) দেওয়া মানুষ
সুনামগঞ্জ শহরটিতে একটি লাইব্রেরি আছে। লোকমুখে এর নাম পাবলিক লাইব্রেরি। প্রতিষ্ঠানটি প্রতষ্ঠিত হয় ১৯৫৯ সালের ১৭ জুন। একাত্তরের পর এর নাম বদলে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতির নামে রাখা হয়। মুতাসিম আলী লিখেছেন, ‘স্বাধীনতার পর সুনামগঞ্জের কিছু প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে কয়েকজন শহীদের নামে রাখা হয়। যেমন বিডি হলের নাম রাখা হয় আবুল হোসেন মিলনায়তন, পাবলিক লাইব্রেরির নাম হয় শহীদ জগৎজ্যোতি পাঠাগার।’ এখন এই লাইব্রেরিটির নাম শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইবব্রেরি। এর নামবদলের চাপান-উতরের একটি নাতিদীর্ঘ ইতিহাস আছে, সেটা এখানে কহতব্য নয়। একদা এর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন খসরু ভাই এবং কালক্রমে সহসভাপতিও হয়েছিলেন এবং এই সহসভাপতির পদে ছিলেন ২০১৮ সাল পর্যন্ত, তাঁর সঙ্গে আর একজন ছিলেন, তিনি স্বপনদা (স্বপনকুমার দেব অ্যাডভোকেট)। খসরু ভাই এই লাইব্রেরির অডিট কমিটির একজন সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন ১৯৮৮ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত, প্রায় ১০ বছর এবং ১৯৯৮ সালে লাইব্রেরির একটি ক্রান্তিকালে লাইব্রেরিটিকে পরিচালনার জন্য গঠিত একটি এডহক কমিটির তিনি ছিলেন সম্পাদক। আবার ২০০৩-২০০৪ এবং ২০০৭ ২০০৮ মেয়াদের কার্যনির্বাহী কমিটিতে তিনি ছিলেন সদস্য এবং ২০০৮ সালে লাইব্রেরির ৫০ বছরে পদার্পণ উপলক্ষ্যে স্মারকগ্রন্থ ‘পাঁচ দশকের ছায়াতরু’র সম্পাদনা পরিষদের ছিলেন আহ্বায়ক। ২০১৮ সালে স্বপনদা ও খসরু ভাই ছিলেন সহসভাপতি। এতো বিস্তর বয়ার্ণনা (বয়ান+বর্ণনা) ও বচনবাচনের নিহিতার্থ এই যে, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরির সঙ্গে খসরু ভাই নিবিভীরভাবে (নিবিড়+গভীর+ভাবে) ওতপ্রোত ছিলেন, এই প্রসঙ্গটিকে প্রতিপন্ন করা।
স্বপনদা ও খসরু ভাই ২০১৮Ñ২০১৯ মেয়াদের কার্যনির্বাহী কমিটিতে সহসভাপতি হওয়ার সদিচ্ছা সাতিশয় সঙ্গত কারণে পোষণ করেন নি, অর্থাৎ বলা যায় বিরত থেকেছেন। অবশ্য এর একটি বিব্রতকর কারণ আছে, সে-কারণের বিসদৃশ বয়ার্ণনা এখানে আপতত দাখিল করছি না। তবে যা-ই হোক, বাস্তবে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি তাঁদের সুযোগ্য পরিচালনামূলক সেবা থেকে বঞ্চিত হলো, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। লাইব্রেরির কার্যনির্বাহী কমিটিতে বিশেষ করে খসরু ভাইকে পেলেন না বলে সম্পাদক সালেহ্ আহমদের আফসোসের অন্ত নেই। তিনি মনে করেন, খসরু ভাই কমিটিতে থাকলে অনেক কঠিন কাজ সহজেই সমাধা হয়ে যেতো, বেশি করে কাঠখড় পুড়াতে হতো না, এতো গলদঘর্ম হতে হতো না তাঁকে। তবে লাভের মধ্যে লাভ হয়েছে এই যে, তাঁদের (স্বপনদা ও খসরু ভাই) উত্তরসূরি হয়ে আমরা যাঁরা তাঁদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছি তাঁরা ভালো করেই বুঝতে পারছি যে, কাজটা তেমন সোজা নয়। সব কাজ যে সহজেই হয়ে যাচ্ছে এমন নয়, তবে কাজের কাজি হতে চেষ্টার কোনও কমতি নেই কমিটির কয়েকজন বাদে সকলের। সম্পাদক সালেহ্ আহমদ লাইব্রেরির কাজের ব্যাপারে যৎপরোনাস্তি যেমন আন্তরিক আড্ডা জমাতেও তেমনি পারদরঙ্গম (পারদর্শী+পারঙ্গম)। তিনি লাইব্রেরিতে এলেই আড্ডা আর কাজ একাকার হয়ে এগিয়ে চলে, থেমে থাকে না। প্রয়োজনে আমার মতো অকর্মণ্যকে প্রায়ই তিনি ঢেকে নেন। ডাক পেয়ে না এলে আমারই ভালো লাগে না, তাই নিজের গরজেই চলে আসি। একদিন এমনি এসেছি। তুমুল চাড্ডার (চা+আড্ডা) ফাঁকে কাজও করে চলেছেন সম্পাদক। হঠাৎ করেই খসরু ভাই এসে হাজির। অভ্যস্ত ভঙ্গিতে সকলের সঙ্গেই শুভেচ্ছাকুশল বিনিময় করে আসীন হলেন। সেদিন তখন লাইব্রেরির সান্ধ্য চাড্ডার আড্ডাখোরদের সমাহার তেমন মন্দ নয়। ১০/১২ জনের একটি জম্পেশ দঙ্গল তো বটেই। চাড্ডা জমে তখন একেবারে ক্ষির হয়ে উঠেছে।
২০১৮ সালের কার্যকরী কমিটির নির্বাচনোত্তর সময়ে লাইব্রেরিতে খসরু ভাই খুব একটা যে আসেন এমন নয়, তবে মাঝ মাঝেই আসেন। আর যখন আসেন তখন আমরা বুঝতে পারি যে, শত ব্যস্ততার মধ্যেও লাইব্রেরি প্রতি তাঁর আন্তরিকতার সুতো তাঁকে ঠিকই ডিকরা (দিগদাড়া) দিয়ে রেখেছে। না এসে তাঁর রেহাই নেই। একেই বলে টান, যা কোনও মানুষের পক্ষে একেবারে উপেক্ষা করা সত্যি কঠিন। [চলবে]