বিশেষ প্রতিনিধি, সিলেট থেকে
সিলেটে হাজার কোটি টাকার দেবোত্তর সম্পত্তি তারাপুর চা বাগান দখলে মন্ত্রণালয়ের চিঠি জালিয়াতি ও প্রতারণার মামলায় ছেলেমেয়েসহ রাগীব আলীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। বুধবার দুপুরে সিলেট মহানগর মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে পিবিআইর দাখিল করা অভিযোগপত্র উপস্থাপন করা হলে শুনানি শেষে বিচারক মো. সাইফুজ্জামান হিরো এক আদেশে সকল আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।
আদালতে আগামী ২৩ আগষ্ট এ মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানির তারিখ ধার্য করা হয়েছে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামিরা হলেন, ভুমি মন্ত্রণালয়ের স্মারক (চিঠি) জালিয়াতির মামলায় রাগীব আলী (৭৫) ও তাঁর একমাত্র ছেলে আবদুল হাই (৪৫), প্রতারণার মামলায় রাগীব আলী, ছেলে আবদুল হাই, মেয়ের জামাই আবদুল কাদির (৫৫), মেয়ে রুজিনা কাদির (৪৮), রাগীবের আত্মীয় মৌলভীবাজারের রাজনগরের বাসিন্দা দেওয়ান মোস্তাক মজিদ (৫৫) ও তারাপুর চা-বাগানের সেবায়েত পংকজ কুমার গুপ্ত। এদেরকে গত ১০ জুলাই পিবিআই দাখিল করা মামলার অভিযোপত্রে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।
মামলায় রাগীবের স্ত্রী রাবেয়া খাতুন ২০০৬ সালের ১২ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করায় তাঁকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছিল। বুধবার অভিযোগপত্র গ্রহণকালে আদালত রাবেয়া খাতুনের অব্যাহতি মঞ্জুর করেন। পরে এক আদেশে আসামিদের পূর্ব জামিন বাতিল করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
মহানগর মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতের অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি (এপিপি) মাহফুজুর রহমান জানান, আদালত আগামী ২৩ আগষ্ট দুটো মামলার অভিযোগ গঠনের জন্য শুনানির তারিখ ধার্য্য করেছেন।
আদালত সূত্র জানায়, দেবোত্তর সম্পত্তির তারাপুর চা-বাগানের জায়গায় বিধি বহির্ভূতভাবে স্থাপনা নির্মাণ করায় ১৯৯৯ সালের ২৫ আগস্ট ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত তৎকালীন সংসদীয় স্থায়ী কমিটি তদন্ত করে সত্যতা পায়। পরবর্তীতে সংসদীয় উপকমিটি চা-বাগানে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থার নেওয়ার সুপারিশ করে। এ সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সিলেট সদর ভূমি কমিশনার এসএম আবদুল কাদের বাদী হয়ে সিলেট কোতোয়ালি থানায় দুটো মামলা করেন। মামলায় রাগীব আলীসহ আসামিরা হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়। পরবর্তীতে এ মামলা উচ্চ আদালত থেকে স্থগিত করা হয় এবং পুলিশ তদন্ত করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছিল।
গত ১৯ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ দেবোত্তর সম্পত্তির তারাপুর চা-বাগান পুনরুদ্ধারে রায় দেন। এতে ওই দুটো মামলা সক্রিয় করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়। উচ্চ আদালতের এ নির্দেশনার বিষয়ে গত ১৬ মার্চ সরকারি কৌঁসুলির (পিপি) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সিলেটের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক সাইফুজ্জামান হিরো তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্তে তিন দফা সময় বৃদ্ধির পর সর্বশেষ পর্যায়ে গত ১০ আগস্ট আদালত পিবিআইকে সময় বেঁধে দেওয়ায় এ সময়ের এক মাস পূর্বেই গত ১০ জুলাই দুটো মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করে পিবিআই।
সিলেট নগরের পাঠানটুলার উপকণ্ঠে ৪২২ দশমিক ৯৬ একর জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠা তারাপুর বাগান পুরোটাই দেবোত্তর সম্পত্তি। ১৯৯০ সালে ভুয়া সেবায়েত সাজিয়ে বাগানটির দখল নেন রাগীব আলী। গত ১৯ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের রায়ে তারপুর চা-বাগান দখল করে গড়ে ওঠা সব স্থাপনা ছয় মাসের মধ্যে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
রায় বাস্তবায়ন করতে উচ্চ আদালত থেকে সিলেটের জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়ায় গত ১৫ মে চা-বাগানের বিভিন্ন স্থাপনা ছাড়া ৩২৩ একর ভূমি সেবায়েত পঙ্কজ কুমার গুপ্তকে বুঝিয়ে দেয় জেলা প্রাশাসন। রায়ের পরবর্তী নির্দেশনা বাস্তবায়নে সিলেটের জেলা প্রশাসন মেডিকেল কলেজ, হাসপাতালসহ সব অবৈধ স্থাপনা স্থাপনা আগামী ১৩ আগস্টের মধ্যে সরাতে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে।
‘রাগীব আলী মহাজালিয়াত’
গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশে আদালত আদেশের পর্যালোচনায় বলেন, ‘মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আসামিগণ গুরুতর অসুস্থ বলে আদালতে উপস্থিত হতে পারেননি। রাষ্ট্রপক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবী মিসবাহউদ্দিন সিরাজ আদালতকে জানান যে, রাগীব আলী দেশের শীর্ষ জালিয়াত। তাঁর বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি জালিয়াতির সুনির্দ্দিষ্ট অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। এ ছাড়া, রাগীব আলীকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত মহাজালিয়াত মর্মে সিদ্ধান্ত প্রদান করেছে। গুরুতর অসুস্থ্য বলে যে মেডিকেল কলেজ (জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ) থেকে ডাক্তারি সার্টিফিকেট দাখিল করা হয়েছে, সেই মেডিকেল কলেজও রাগীব আলীর জালিয়াতির মাধ্যমে দখল করা। আসামিদের সময় প্রার্থনার আবেদন না মঞ্জুর করা হোক।’
রাগীব আলীর পক্ষে সময় প্রার্থনার আবেদন, অসুস্থ হওয়ার ডাক্তারি পরীক্ষার কাগজপত্র ও মামলার নর্থি পর্যবেক্ষণ করে আদালত আদেশে বলেন, ‘মামলাটি মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা মোতাবেক গত ২২ মার্চ চালু করা হয়। এ ব্যাপারে আসামি পক্ষের আইনজীবীকেও অবহিত করা হয়। কিন্তু সম্পূর্ণরূপে অবহিত থাকা সত্ত্বেও কোনো আসামি পর পর চারটি ধার্য তারিখে আদালতে উপস্থিত হন নাই। তাই পূর্ব জামিনের শর্ত ইতিমধ্যে লংঘন করেছেন মর্মে প্রতীয়মান হয়। ডাক্তারি কাগজপত্রাদি বিবেচনাযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য প্রতীয়মান না হওয়ায় আসামিদের পক্ষে সময় প্রার্থনার আবেদন নামঞ্জুর করা হলো। সেই সঙ্গে আসামিদের পূর্ব জামিন বাতিল করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হলো।’
আদালতের এ আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করে সিলেটের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মিসবাহউদ্দিন সিরাজ বলেন, ‘রাগীব আলী ও তাঁর ছেলে গুরুতর অসুস্থ বলে আদালতে যে মেডিকেল কলেজের চিকিৎসা-ব্যবস্থাপত্র দেওয়া হয়েছে, সেটি রাগীব আলীর জালিয়াতির মাধ্যমে স্থাপন করা প্রতিষ্ঠান। আদালতকে আমি ওই বিষয়গুলো উপস্থাপন করেছি। আদালত বিষয়গুলো আমলে নিয়ে এ আদেশ দিয়েছেন। এতে উচ্চ আদলতের রায়েরই প্রতিফলন হয়েছে।’
- আব্দুজ জহুর সেতু এলাকায় পরিবহন শ্রমিকদের সংঘর্ষ, ৪ সিএনজি ও ১ লেগুনা ভাংচুর
- কনসালটেন্ট ও টেকনোলজিস্ট না থাকায় সদর হাসপাতালের এক্স-রে রুম তালাবদ্ধ


