মতিয়ার চৌধুরী
২০১৬ সালের ১৫ আগষ্ট জাতির জনকের ৪১তম শাহাদাত বার্ষিকী। এই দিনটি বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক কলঙ্কময় অধ্যায়। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি ও মহান স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট কালো রাতে স্বপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ইতিহাসের নির্মম এই হত্যাকান্ড কারবালার নিষ্ঠুরতাকেও হার মানায়। বর্বর খুনিরা নারী শিশু সহ একে একে পরিবারের সকল সদস্যকে হত্যা করে। বিদেশে অবস্থানের কারণে বেঁচে যান জাতির জনকের দুই কন্যা নতুবা তাদেরও একই পরিণতি বরণ করতে হতো।
কেনইবা এই জঘন্যতম হত্যাকান্ড এর নেপথ্যে কি ছিল তা কি আমরা ভেবে দেখেছি? জাতির জনকের হত্যাকা-ের পেছনে ছিল স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি, ক্ষমতালোভী সেনা সদস্যের একটি অংশ এবং বিদেশী ষড়যন্ত্র। স্বাধীনতা বিরোধী ধর্মব্যবসায়ী জামাতিরা কোন দিনই বাংলাদেশকে মেনে নিতে পারেনি, তাই তারা একটি প্রভাবশালী দেশের গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে স্বাধীনতার পর পরই ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকে, এদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে কতিপয় বিপথগামী সেনা সদস্য। পরবর্তিতে এরাই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় এবং দেশে স্বাধীনতা বিরোধীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে।
জাতির জনকের খুনিরা প্রকাশ্যেই বিদেশী গণমাধ্যমের সাথে সাক্ষাৎকারে বলেছে জিয়াউর রহমান তাদের উৎসাহিত করেছেন। পরবর্তিতে এই জিয়া গোলাম আযমকে নাগরিকত্ব দিয়ে দেশে ফিরিয়ে এনেছেন, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে ১৫ই আগষ্টের হত্যাকা-ের বিচার যাতে না হয় সে ব্যবস্থাও করেন। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে স্বাধীনতা বিরোধীদের মন্ত্রী করেছেন। শুধু তাই নয় আওয়ামীলীগ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে যখন নির্বাচনী অঙ্গিকার পূরণে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করে তখন জিয়াউর রহমানের দল বিএনপি যুদ্ধাপরাধের বিচারকে বাধাগ্রস্ত করতে জামাতের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে দেশব্যাপী এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
এতেই পরিস্কার হয়ে যায় জাতির জনকের হত্যার সাথে জিয়াউর রহমান জড়িত ছিলেন। শুধু তাই নয় জিয়াউর রহমানের শাসন আমলে বিভিন্ন অজুহাতে দেশের শ্রেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর কারাঅভ্যন্তরে জাতীয় নেতাদের হত্যা করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে চিরতরে ধ্বংস করার ব্যবস্থা করা হয়।
সেই সর্বনাশা দৃশ্যপট মানসচক্ষে ভেসে উঠলেই শিহরিত হতে হয়। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ধানমন্ডির ৩২ নাম্বারে নিজ বাসভবনে স্বপরিবারে শহীদ হন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার সাথে সেদিন হত্যা করা হয় তাঁর প্রিয় সহধর্মিনী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেসা মুজিব, তিন ছেলে মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশুপুত্র শেখ রাসেল, নবপরিণীতা দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল, জাতির জনকের ছোট ভাই শেখ আবু নাসের, ভগ্নিপতি আব্দুর বর সেরনিয়াবাত, বেবী সেরনিয়াবাত, শিশুপুত্র সুকান্ত, জাতির জনকের ভাগনে শেখ ফজলুল হক মনি, তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রী আরজু মনি, শহীদ সেরনিয়াবাত, আব্দুর নঈম খান রিন্টু, জাতির জনকের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা কর্নেল জামিলকে।
স্বাধীন সংগ্রামের জন্য একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা, মরণপণ সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করা এবং স্বাধীনতার পর একটি যুদ্ধবিদ্ধস্থ দেশ গঠনে ভূমিকা রেখে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছিলেন একটি ইতিহাস। জাতির স্বাধীন সত্বা আর ঐক্যের প্রতিক। তার নেতৃত্বেই জাতিকে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ছিনিয়ে আনার প্রেরণা যুগিয়েছিল। পাকিস্তানী শাসদের অন্যায় অত্যাচার জুলুম নির্যাতন এবং বৈষম্য থেকে দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষকে মুক্তি দিয়েছিলেন তিনি। পাকিস্তানী শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২৪ বছরের আন্দোলন সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় জাতির জনক ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঘোষণা করেছিলেন ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তার ডাকে সারা দিয়ে দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। পরাধীনতার গোলামির জিঞ্জির ভেঙ্গে যে মানুষটি হাজার বছরের নিপীড়িত, নিগৃহীত, বঞ্চিত বাঙালি জাতির জন্য স্বাধীন আবাসভূমি সৃষ্টির লক্ষ্যে জীবনজয়ী সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে কৈশোর, যৌবন ও প্রৌঢ়কালকে উৎসর্গ করলেন ইতিহাসের সেই মহিমান্বিত মহাপুরুষের প্রাণসংহার করলো স্বাধীনতা বিরোধী ঘাতক চক্র।
নব্য স্বাধীন বাংলাদেশে পূর্ববাংলা কমিউনিষ্ট এবং সর্বহারা পার্টির উৎপাত, নতুন রাজনৈতিক দল জাসদের ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই ১৯৭৫ সালের পট পরিবর্তনের ক্ষেত্র তৈরিতে সহায়কের ভূমিকা পালন করে। যদিও তারা এখন সেই ভুলের মাশুল দিচ্ছেন। শুধু তারা নয় সমগ্র জাতিকে জাসদের ভুলের খেসারত দিতে হচ্ছে। ১৯৭৫ সালের হত্যাকা- সংগঠিত না হলে আজকের জঙ্গিবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠত না।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার পরাজিত শত্রুরা চেয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং তার স্বপ্নের সোনার বাংলাকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলতে সেইসাথে বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও অগ্রযাত্রাকে ধ্বংস করার অপপ্রয়াস চালায়। স্বাধীনতার শত্রুদের সে চেষ্টা আজও অব্যাহত রয়েছে। শত্রুরা তাদের কৌশল পরিবর্তন করে ধর্মের ছদ্মাবরণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করার নতুন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। তাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে বঙ্গবন্ধুর কন্যার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সকল ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করতে হবে।
লেখক: লন্ডনপ্রবাসী সাংবাদিক


