গ্রেপ্তার এড়াতে ছেলে, ছেলের বউকে নিয়ে ভারত পালালেন রাগীব আলী

সিলেট অফিস
সিলেটে দেবোত্তর সম্পত্তির তারাপুর চা বাগান জালিয়াতির মাধ্যমে দখলের মামলায় আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির একদিন পরই ছেলে, ছেলের বউকে নিয়ে পালিয়ে ভারত চলে গেছেন সিলেটের আলোচিত রাগীব আলী। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে সিলেটের জকিগঞ্জ এমিগ্রেশন হয়ে তিনি ভারতের করিমগঞ্জে চলে যান।
খবর পেয়ে গতকাল শুক্রবার দুপুরে জেলা পুলিশের একটি দল জকিগঞ্জ গিয়ে এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে। সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজ্ঞান চাকমা জকিগঞ্জ কাস্টমস ইমগ্রেশন থেকে গতকাল বিকেল সাড়ে চারটার দিকে এ বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন।
জকিগঞ্জ এমিগ্রেশন স্টেশন ও পুলিশ সূত্র জানায়, রাগীব আলীর কয়েকজন ঘনিষ্ট একজন ব্যক্তি ভারতের ভিসা লাগানো পাঁচটি পাসপোর্ট নিয়ে জকিগঞ্জ সীমান্তের কাস্টমস ইমিগ্রেশনে যান। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে ভিসাসংক্রান্ত কাজ সম্পন্ন করা হয়। পরে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে রাগীব আলী, ছেলে আবদুল হাই, ছেলের বউ সাদিকা জান্নাত চৌধুরীসহ সিলেটের মালনীছড়ায় রাগীব আলীর বাংলোয় পালিত দুই শিশুÑএ পাঁচজনকে নৌকা দিয়ে কুশিয়ারা নদী পাড়ি দিয়ে ভারতের করিমগঞ্জ পৌঁছান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জকিগঞ্জ কাস্টমসের একজন কর্মকর্তা বলেন, রাগীব আলীকে নেওয়ার জন্য সেখানে অপেক্ষা করছিলেন কয়েকজন লোক। ছেলের বউয়ের বাড়ি ভারতের শিলচর। আপাতত ছেলের বউয়ের বাড়িতেই গেছেন বলে তাঁরা শুনেছেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজ্ঞান চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, আমাদের কাছে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার নথি পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে রাগীব আলী কৌশলে পালিয়েছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন পালাতে সহায়তাকারীদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নিয়ে ভাবা হচ্ছে।
তারাপুর চা বাগান দখল করে স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকার ভূমি আত্মসাৎ ও প্রতারণার পৃথক দুটি মামলায় রাগীব আলী ও তাঁর ছেলেমেয়েসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে গত বুধবার সিলেটের মহানগর মুখ্য হাকিম আদালতের বিচারক মো. সাইফুজ্জামান হিরো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। পরোয়ানাভুক্ত আসামিরা হচ্ছেন, রাগীব আলী, ছেলে আবদুল হাই, মেয়ে রুজিনা কাদির, জামাতা আবদুল কাদির, রাগীরের আত্মীয় মৌলভীবাজারের দেওয়ান মোস্তাক মজিদ, তারাপুর চা বাগানের সেবায়েত পঙ্কজ কুমার গুপ্ত।
দেবোত্তর সম্পত্তির তারাপুর চা-বাগান দখল করে বিধি বহির্ভূত স্থাপনা নির্মাণ করায় ১৯৯৯ সালের ২৫ আগস্ট ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত তৎকালীন সংসদীয় স্থায়ী কমিটি তদন্ত করে সত্যতা পায়। পরে সংসদীয় উপকমিটি চা-বাগানে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে। এ সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সিলেট সদর ভূমি কমিশনার এসএম আবদুল কাদের বাদী হয়ে সিলেট কোতোয়ালি থানায় দুটো মামলা করেন। পরবর্তীতে এ মামলা উচ্চ আদালত থেকে স্থগিত করা হয় এবং পুলিশ তদন্ত করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছিল।
গত ১৯ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ দেবোত্তর সম্পত্তির তারাপুর চা-বাগান পুনরুদ্ধারে রায় দেন। এতে ওই দুটো মামলা সক্রিয় করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়। উচ্চ আদালতের এ নির্দেশনায় গত ১৬ মার্চ সরকারি কৌঁসুলির (পিপি) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দুটো মামলা সক্রিয় করা হয়। ১০ জুলাই রাগীব আলীসহ ছয়জনকে অভিযুক্ত করে পৃথক দুটো অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
এদিকে উচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়নে সিলেটের জেলা প্রশাসন তারাপুর চা বাগান থেকে রাগীব আলীর স্থাপন করা মেডিকেল কলেজ, হাসপাতালসহ কেনাবেচা করে আবাসিক প্লটসহ সক অবৈধ স্থাপনা আজ শনিবারের (১৩ আগস্ট) মধ্যে সরাতে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। অবৈধ স্থাপনা না সরালে পরদিন থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়টি গণবিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।