একজন ম্যাজিশিয়ান চাই

ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ
-তুমি ক্লাসে টপ করবে আমি কিন্তু এই চাইÑ।
বুঝলে চম্পক?
বাবার কথা শুনে মুখ তুলে সে। অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে। কত চেষ্টা করে সে, রাত জেগে পড়াশুনা করে। টিচার বলেন, শুধু মুখস্ত করলেই হবে না চম্পক, তোমাকে শিখতে হবে টেবিল ঘড়িটা সামনে রেখে প্রশ্নের উত্তর লেখার চেষ্টা করবে।
স্যারের কথা মন দিয়ে শুনেছে, চেষ্টাও করছে পড়ার সাথে সাথে খুব তাড়াতাড়ি  শিখতে। কিন্তু তা আর হলো কই? ঠোঁট দুটি নেড়ে গুনগুন করে অনেকটা সময় পড়া যায়, হাতের আঙ্গুল আর বলপেন যেন একসাথে আর চলতেই চায় না। এমন হলে বুঝি টপ পজিশনে যাওয়া যায়? মাঝে মধ্যে দশের ভেতরে এলেও এক নাগাড়ে সেঁটে আর থাকতে পারল কই?
চম্পক শুধু ভাবতেই থাকে। ঠিক এমন সময় মাও এসে হাজির।
মিমি ¯িœগ্ধ সুরে বলে, টিচাররা বলেন তোমাকে দিয়ে নাকি কিস্যু হবে না। তা কি সত্যি হতে পারে? তুমি কি ইচ্ছে করলে অঙ্ক আর ইংরেজীতে হাইয়েষ্ট নম্বর পেতে পারো না? ফাইনাল পরীক্ষায় দ্যাখো তুমি ক্লাসে হেডমার্ক পাবে।
মা আর বাবুর কথা ভেবে ভেবে ঢুলুনি আসে চম্পকের। চোখের পাতা জোর করে টেনে বইয়ের দিকে তাকায়। নাহ খুব পড়তে হবে, সারাদিন পড়তে হবে। অঙ্কে-ইংরেজীতে বেশি নম্বর পেতে হবে। পরীক্ষায় টপ পজিশনে যেতে হবে।
চুমকিদি এসে বলে, কি রে ঘুমোবি না? কত রাত হলো।
মলিন মুখে চম্পক বলে, পরীক্ষায় আমাকে অনেক ভালো করতে হবে চুমকিদি।
খুব হাসে চুমকি।
Ñতা বলে কি এত রাত জেগে পড়তে হবে? কাল থেকে রেগুলার পড়ে যাবি। একদম ফাঁকিবাজি করবি না। এবার ঘুমোতে যা।
বিছানায় কমলা-লাল-সবুজ-হলুদে আঁকা ব্যাট আর বলের চাদর। তার ওপর ক্লান্ত চম্পক চিৎপাত হয়ে শুয়ে থাকে।
সবাই আমার কাছে শুধু চায়। পরীক্ষায় ভালো করো, ফার্ষ্ট বয় হওÑসবাই তোমাকে ভালো ছাত্র বলবে। বেষ্ট বয় বলবে। প্রতিযোগিতায় হেরে গেলে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকবে তুমি। পাড়া প্রতিবেশী চেনা-জানা সবাইÑওমা ওকে চেন না? ও তো ঐ যে লাল বাড়িটা দেখতে পাচ্ছÑচম্পক তো এ বাড়ির ছেলে। ঐ তো ওর মা-বাবু।
মাথার নিচে বালিশ নেই, পাশ বালিশ ওপাশে পড়ে আছে।
ক্লাসে প্রথম হতে হবে, খবরের কাগজে কৃতী ছাত্র হিসেবে ছবি আসবে ওর, কি করলে ওর স্কুলের টিচাররা খুশি হয়ে বলবেন, হি ইজ আ মোষ্ট প্রমিসিং বয়। যতœ নিলে আর ও ঠিকঠাক মতো পড়াশুনা করলে এসএসসিতে দারুণ রেজাল্ট করবে।
যেমন টিচাররা তানভীর-সাকিবের কথা এমন করে বলেন।
¯িœগ্ধ নীল আলোয় ডুবে থেকে থেকে এক সময় ঘুম নেমে আসে চোখে।
হঠাৎ দেখে গুটি গুটি পায়ে বিশাল এক মানুষ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ও কি গলিভার? কিন্তু না তো ও তো আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপের দৈত্য। আঙটি না ঘসলে দৈত্যটি কি করে আসে? তাহলে ব্যাপরটি কি করে হলো?
ভেবে ভেবে থই পায় না চম্পক। তবে কি গেল জন্মদিনে দিদা যে সোনার আঙটি দিয়েছেন, খেলার সময় হয়তো পাথরে ঘষা লেগেছে। না হলে দৈত্যটি হাজির হলো কি করে?
ওর ঠা ঠা হাসির গমকে কেঁপে উঠে রাতের হাওয়া, সাদা রঙ ছাদ, নীল রঙ আলো।
চম্পক রিনিরিনি সুরে বলে, সবাই আমার কাছে শুধু চায়। আমি ফার্ষ্ট হব, অঙ্কে একশ পার, দারুণ ভালো ছাত্র হয়ে ছুটতে ছুটতে সবার আগে এগিয়ে যাব।
অনেক দূর যেতে হবে আমাকে।
বিশাল দৈত্য হলে কি হবে, বিকট হাসিতে সবাইকে কাঁপিয়ে দিলে কি হবেÑওর গলার স্বরটি ভারী মিষ্টি।
Ñতুমি কিছু চাইবে না চম্পু? এক্ষুণি এনে হাজির করে দেব আমি।
মিষ্টি আর আদুরে কথায় চোখে জল এসে যায় ওর।
আমতা আমতা করে, আমি আর কি চাইব তোমার কাছে। আমি না চাইতেই সব পাই যে। কোন আইসক্রিম, চকবার, চিপস, পিৎজা, বার্গারÑসব আমি যখন তখন পেয়ে যাই। আমার কিছু চাই না।
দৈত্য ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় নীল আলোর মাঝে।
চম্পক তেমনই ঘুমের মাঝে ডুবে থাকে। এক সময় ভোর হয়। পাখিরা মিষ্টি সুরে ডেকে উঠে। ভোরের হাওয়ার সাথে মিশে যায় ফুলের গন্ধ। এমনই সময় ঘুম ভেঙে যায় ওর।
ভাবে, কি হয়েছিল এই ঘরে? ঠা ঠা করে বুক কাঁপানো হাসি হাসতে হাসতে দৈত্য এসেছিল?
ও কিছু দিতে এসেছিল ওকে। বলেছিল, তুমি কিছু চাইবে না চম্পু? তুমি কি নেবে Ñবলো!
ওসব কি স্বপ্ন ছিল? তাই হবে।  নয়তো নিচে ডিউটিতে ছিল দারোয়ানÑসে কি এতটুকু জানতে পারত না?
কাউকে ওসব কথা বলা যায় না। সবাই মিলে খ্যাপাবেÑশুধু একজনকে বলা যায়Ñ সে হলো ছোটকা।
চুমকিদির জন্মদিনে দারুণ মজা হচ্ছে। দোতলা থেকে নিচে নামতেই জমজমাট আসর থেকে ছোটকা বলে উঠে,Ñআরে আসুন আসুন মি: চম্পক, আপনার জন্যই অপেক্ষা করছি।
সবাই খলখল করে হাসে।
চম্পক অবাক হয়ে বলে, আমার জন্য? বলছ কি ছোটকা?
ছোটকা কানে কানে বলে, তুই নাকি অঙ্কে একুশ পেয়েছিস?
Ñওহ-তাই বলো।
এ তো নতুন কিছু নয়। এভাবেই দিন চলছে। পরীক্ষা এলে বুকের ভেতর ধুকধুকানি, রেজাল্টের দিন বুক থির থির করে কাঁপাÑএই তো হয় সব সময়।
শুধু পরীক্ষা শেষ করে বাড়ি ফিরেÑসেদিন শুধু খুশি খুশি আর খুশি।
কিন্তু পড়াশুনা না করলে জীবন বরবাদ, ভালো রেজাল্ট না করলে ভবিষ্যত শেষ-তারপর সবাই অনেক অনেক সামনে এগিয়ে যাবে। চম্পক কোনদিনও ওদের ছুঁতে পারবে না।
বাবা বলেন, ওরা ইঞ্জিনিয়ার-ডাক্তার-সি.এ হবে। এম.বি এ করবেÑতুমি পেছনে পড়ে থাকবে, তবেই বেশ হবে।
জন্মদিনের সন্ধ্যায় উজ্জ্বল এই আলো, রঙ-বেরঙের বেলুন নকশা করা ঢাউস কেক, লুচি-মাংস আর পায়েসের মিশ্রিত মনকাড়া গন্ধের মাঝেও মন খারাপ হয়ে যায় চম্পকের। ভীষণ মন খারাপ।
বড়রা সবাই বলে, তুমি পড়াশুনায় পিছিয়ে যাচ্ছ, তোমার ভবিষ্যত অন্ধকার। তাহলে চম্পকের মতো মাঝামাঝি মেরিটের ছাত্রের কি হবে?
পিঠের মাঝে জোরসে থাপ্পর পড়ে।
Ñউরি ব্বাস, এই চম্পু-বুড়োদের মতো গম্ভীর মুখ করে বসে আছিস কেন?
ওহ ব্বা: তানভীর-বিটু-সাকিব ওরা সবাই এসে গেছে।
কিছু সময়ের জন্য বুকের ভেতরের সব দু:খ কোথায় যেন উধাও হয়ে যায়। সত্যিÑজন্মদিন এলে মন হঠাৎ করে প্রজাপতির মতো উড়ে যেতে চায় দূরে-বহুদূরে।
ডোনা ম্যাডাম বলেন, জীবনে উৎসবের প্রয়োজন আছে। চারপাশে হাসি-গান আর খাওয়া। লুচি আর মাংস গপাগপ খাওয়া হচ্ছে। চোখের পলক পড়তে না পড়তেই লুচি উধাও হয়ে যাচ্ছে। মাংসের বাটি মিনিটের মঝেই খালি।
স্কুলের পড়া, হোমওয়ার্ক, স্যার-ম্যাডামদের বকুনিÑ‘তোকে দিয়ে কিছু হবে নাÑসব ভুলে’ যায় চম্পক। পড়া না পারলে কান ধরে উঠা-বসা, ষ্ট্যান্ড আপ অন দা বেঞ্চ, নিল ডাউন-ওসব তো ডাল ভাত খাবার মতো।
এই মুহূর্তে কী যে আনন্দ হচ্ছে চম্পকের। শুধু কি ওর? সব বন্ধুদেরও।
চুমকিদিও দারুণ খুশি। নিজের জন্মদিন তো। পায়েসের বাটি এনে ওদের পাতেই প্রায় ওপুর করে ঢেলে দিল। দু’চামচ পয়েস মুখে দিয়ে ছোটকা উঠে দাঁড়ায়।
Ñএখানে যারা আছ সবাই শোন। মন দিয়ে শোন। এ বাড়ির ড্রয়িং রুমে অল্প দিনের মধ্যেই সবাই এসে আবার আমরা জমায়েত হব।
Ñ কেন কেন?
Ñআর কারো জন্মদিন নাকি?
ছোটকা পায়েস রেলিশ করে খেতে খেতে বলল, নো নো-নট এট অল।
Ñতাহলে?
Ñখুলে বলো ছোটকা।
চুমকি বলে, ছোটকা-ব্যাপরখানা কি? ঝেড়ে কাশো তো এবার।
ছোটকা এবার ঘোষণা দেয়ার মতো বলে, ম্যাজিশিয়ান আসবে রে ম্যাজিশিয়ান।
চম্পক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, তার মানে জাদুকর?
বিটু বলল, তার মানে ভেলকিবাজি দেখবÑতাইতো !
তানভীল বলে, ধ্যেৎ ভেলকিবাজি বলবি না, শুনতে কানে লাগে। বল ম্যাজিক-বুঝলি।
হ্যাঁ-এবার ঠিক ঠিক বুঝতে পেরেছে চম্পক। ছোটকার ছেলেবেলাকার বন্ধু সৌম্য। তার মানে চম্পকের ছোটকাকু।
সোমুকাকু আসছে, সোমুকাকু আসছে মাজিক দেখাতে।
জন্মদিনের আনন্দের সঙ্গে সোমুুকাকু আসছে-এ দুয়ের আনন্দ মিলে মিশে একাকার হয়ে গেল।
মা গম্ভীর গলায় বলে, সোমুকাকু আসছে, সোমুকাকু আসছে বাব্বা:-যেন টারজান আসছে এমন ভাবে লাফাচ্ছিস।
চম্পক বলে, লাফাব না মা? বলছটা কি? সোমুকাকু ম্যাজিশিয়ান-দা গ্রেট ম্যান। আমার দারুণ লাগছে।
ক্লাস ফাইভে পড়–য়া চম্পকের মনে একরাশ খুশির হাওয়া বয়ে যায়। সে হাওয়া জন্মদিনের উৎসবে আসা বিটু, আকাশ, তানভীর সবাইকে ছুঁয়ে যেতে থাকে। চুমকিদি আনন্দে হাসতেই থাকে।

সকাল থেকেই মিমির মেজাজ বিগড়ে আছে। মায়ের মেজাজ খারাপ দেখলে চম্পকও সিঁটিয়ে থাকে।
ঘরদোর ডাস্টিং করতে করতে নিজের মনে গজগজ করতে থাকে মিনি। চুমকির জন্মদিন উৎসবের রঙিন কাগজের বেলুন, কেক-সন্দেসের গুঁড়ো, মুঠো মুঠো ডালমুট এখানে-ওখানে ছড়িয়ে আছে।
এই হয়েছে আর এক ফ্যাশান। বুফে খাওয়া হাতে হাতে প্লেট নিয়ে টেবিল থেকে পছন্দ মতো খাবার তুলে নাও। আগেকার দিনের কথা ভেবে মিমির চোখ দুটি স্বপ্নে ভরে যায়। কী ভালো ছিল দিনগুলো।
টেবিল ঘিরে চেয়ার। বসে বসে ধীরে সুস্থে খাবার তুলে খাও। আর এখন? পপকর্নের ঠোঙ্গা নিয়ে এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দু’চারটি মুখে তোল।
হেঁটে হেঁটে বার্গার খাও, স্যান্ডউইচ খাও-ভেতর থেকে টম্যাটো-শশা-চিকেন টুকরো, পাউরুটির গুঁড়ো, টম্যাটো কেচাপের লাল রঙের আঠালো পদার্থ।
মায়ের মেজাজ দেখে ছোটকা বলে, কি গো বৌদি-মেজাজ এত খারাপ কেন তোমার?
মিমি ঝাঁঝালো গলায় বলে, আচ্ছা রবীন, তুমি বুঝি তোমার ম্যাজিশিয়ান বন্ধুকে নিয়ে আসার সময় পেলে না।
ছোটকা খুব জোরে হেসে উঠে। সে হাসিতেই ভেসে যায় ঘরের গুমোট। বই ফেলে চম্পক ছুটে যায় ব্যালকনিতে। ঘন নীল আকাশে রঙ-বেরঙের ঘুড়ি উড়ছে। পাশের বেশ কটি বাড়ির ছাদের উপরে কিশোরদের মেলা। বড়রাও রয়েছেন। ভোকাট্টা ভোকাট্টা আওয়াজে মুখরিত হয়ে উঠেছে চারপাশ।
ডিসেম্বরের আকাশ কী ঝকঝকে নীল! কুয়াশা কেটে গেছে। চারপাশে সোনালী রোদ। এমন সময় আকাশে রঙ-বেরঙের ঘুড়ি-দারুণ লাগে চম্পকের। মায়ের মেজাজের জন্য যা কিছু ভয়-আর মন খারাপ ছিল সব উধাও করে নিয়ে গেল ছোটকার ঠা ঠা।
ছোটকা হাসি মুখে বলে, পরীক্ষা এসে গেছে বলে বুঝি সোমুর আসা মানা। বাড়িতে ফের কারফিউ জারি করবে বুঝি?
বেশ বলেছে ছোটকা। সত্যি কারফিউ জারি করেছে মা। বকুনি চলতেই থাকে এ সময়।
Ñপড়া ছেড়ে ব্যালকনিতে এসেছ। কেন এলে শুনি?
সারাক্ষণ বই নিয়ে বসে থাকল্ েখুশি হয় মা। চারপাশে শুধু বারণ আর মানা।
চুমকি আর চম্পক কোথাও বেড়াতে যেতে পারবে না। বাড়িতেও কেউ হুটহাট করে আসতে পারবে না। খেলাধুলা সব বন্ধ।
চম্পক গাইগুঁই করে।
Ñআমি আমি কার্টুন দেখব না? ভিডিও গেম এক্কেবারে খেলব না?
বাবা এসব শুনে বলেন, মা তো তোমার ভালোর জন্যই বলে চম্পক। এখন কম্পিটিশনের যুগ। ভালো করে পড়াশুনা করে ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট না করলে হেরে যাবে তুমি।
হেরে যাবার কথা শুনলে ভীষণ ভয়ভয় করে চম্পকের। বুকের ভেতরটা শিরশির করে উঠে। ক্লাসের বন্ধু বিটু আকাশ তানভীর সবাই ছুটে ছুটে বহু দূরে চলে যাবে। পেছনে পড়ে রইবে শুধু চম্পক। একা ভীষণ একা হয়ে যাবে।
ঢং ঢং করে ওর ছোট্ট বুকের ভেতর স্কুলের ঘন্টির মতো পরীক্ষা পরীক্ষা শব্দটি বাজতে থাকে। অদ্ভুত এক শিরশিরে ভয় চম্পকের শিরদাঁড় বেয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে যায়।
এই বুক কাঁপানো রাশি রাশি ভয় এক পলকে উড়িয়ে দিতে পারে ছোটকা, শুধুই ছোটকা। স্কুল থেকে রিপোর্ট কার্ড এলে মা-বাবা তখন গম্ভীর হয়ে যান, ছোটকা শুধু খুশি মাখা গলায় বলে,
‘মৎস্য মারিব খাইব সুখে
লেখাপড়া শিখিব মরিব দু:খে’
তাই নারে চম্পু। লেকে নয়তো পুকুরে আমরা ছিপ ফেলে বসে থাকব। ফৎনা তিরতির করে নড়ে উঠলে কী দারুণ লাগবে বলতো?
চম্পক ভাবে, সত্যিই তো! বরশি দিয়ে মাছ ধরে মাকে এনে দিলে মা মাছের ঝোল রান্না করবে। ব্যস হয়ে গেল, আর কি চাই। আনন্দে দিন কেটে যাবে। কিন্তু তা তো হবার নয়। পড়তে হবে, পড়তে হবে অনেক দূর যেতে হবে যে।
ছোটকা এবারে ঘোষণা দেয়।
Ñআসছে শনিবারে কিন্তু সোমু আসবে। জাস্ট নাও ফোন করে আমাকে বলল।
চুমকি আর চম্পক হাততালি দিয়ে উঠে।
-তাই বুঝি? তাই বুঝি ছোটকা? ইসস তুমি কী ভালো।
এায়ের মুখে এক পোঁচ কালি।
গলায় বিরক্তি মেখে বলে, বন্ধু আসার আর সময় পেল না বুঝি? কবে থেকে বলছি বন্ধুকে নিয়ে এসো ম্যাজিক দেখিয়ে যাক-তখন তো এল না সোমু।
ছোটকা ব্যাংকে কাজ করে। তার বন্ধু সোমু ইঞ্জিনিয়ার। এর বাইরে নামকরা ম্যাজিশিয়ান। এটা তার হবি। ঘরোয়া অনুষ্ঠানে অদ্ভুত সব খেলঅ দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দেন সবাইকে। মাঝে মাঝে বাড়িতে এসে হৈ চৈ ফেলে দেন।
চুমকিদির বন্ধুরা আসে, তানভীর, আকাশ, বিট্টুরা আসে। এই ম্যাজিশিয়ান আংকেলের সাথে পরিচয় রয়েছে Ñএ ভারী গর্বের ব্যাপার। নেহাৎ ছোটকার বন্ধুÑতাই বাড়িতে আসেন। না হলে তো উনি চম্পক ওদের ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকতেন।
ম্যাজিশিয়ান আসছেন, ম্যাজিশিয়ান আসছেন। বাড়ি জুড়ে উৎসব শুরু হলো। ঘরের ঝুল ঝাড়া হলো। মেঝের টাইলস গুলো কেমন যেন মলিন হয়ে গেছে। ভিক্সন আর ব্রাশ দিয়ে ঝকঝকে তকতকে করা হলো।
ঠাম্মা-বাবু-ছোটকা-চুমকি-চম্পক সবাই শনিবারের আশায় বসে রইল। বড্ড দেরি করে আসছে এ দিনটা। চম্পক ভাবে, পাখির ডানা লাগিয়ে ছুটির এ দিনটা উড়ে আসতে পারে না?
বিকেল থেকেই কিচেন সরগরম হয়ে উঠে। সোমু আংকেল খেতে খুব ভালোবাসে। ওর জন্য কত কী তৈরি হচ্ছে।
এক সময় জলতরঙ্গের সুরে ডোরবেল বেজে উঠে।
কোনদিন বাড়ির লোকদের কাছে এত সুরেলা হয়ে বাজে না। আজ পরীক্ষার কারফিউ জারী করা মা গিয়ে কট করে হাসিমুখে দরজা খুলে দেয়।
Ñআরে সোমু এসো এসো।
মুহূর্তে জমজমাট হয়ে উঠে গল্পের আসর। কত কী গল্প জানে আংকেল।
মিক্সিতে ফলের রস তৈরি হচ্ছে। ননস্টিক প্যানে ড্রামস্টিক ফ্রাই হচ্ছে। রুই মাছ ওভেনে গ্রিল করা হচ্ছে।
গল্পে আর খাবারের গন্ধে অন্যরকম হয়ে উঠেছে সন্ধ্যারাত।
তানভীর ফিসফিসিয়ে বলে, তোদের বাড়িতে দারুণ রান্না হচ্ছে রে চম্পক।
খুব ফুরফুরে মেজাজে আছে সবাই। আজ বিশেষ গেস্ট এর অনারে পড়া নেই, অঙ্ক কষার চাপ নেই।
সোমু আংকেল এক সময় বলে, এখন তো পরীক্ষার সিজন, তোমাদের ডিস্টার্ব করলাম।
Ñনো নো নট এট অল।
চম্পক বলে,Ñপড়া আর পরীক্ষা তো সব সময়ই আছে, তোমাকে তো রোজ রোজ পাব না।
মা এতক্ষণে বলে, সোমু তুমি কি বলছ ! পড়া আর চম্পক? তবেই হয়েছে। সারাদিন শুধু খেলা আর খেলা।
সোমু আংকেল অবাক হয়ে বলে, খেলবেই তোÑ ও কি, বুড়ো নাকি? ছোটরা তো খেলবেই। এটা কোন প্রবলেম নয় বৌদি।
বাবু বলল, না না সোমু তুমি বুঝতে পারছ নাÑজটিল ব্যাপার এটি। টিচাররা তো বলে-ওকে দিয়ে কিস্যু হবে না।
ফলের রসের গ্লাসে লম্বা চুমুক দিয়ে সোমু আংকেল বলে,
Ñঅবজেকশান দাদা। মুখ গুঁজে শুধু পড়লেই হলো? ঊইয়ের পোকা হওয়া কি ভালো? চম্পক যে ভালো তবলা বাজালো, আবৃত্তি শোনালোÑ সে সব কিছু নয়? টিচাররা-আপনারা কেন ওর এই গুণগুলো হাইলাইট করুন না।
বেশ লাগছে ম্যাজিশিয়ান আংকেলের কথাগুলো শুনতে। চম্পকের যেন ঠিক কাছের মানুষ। সোমু আংকেল যখন বলল, ইসস কী ভালো বোল তুলিস রে তবলায়, ঠিক যেন জাকির হোসেনÑতখন চম্পকের বুকের ভেতরে একরাশ পাগলা হাওয়া যেন উথাল পাথাল করে ওঠে।
বাড়ির সবার উপর কেমন যেন রাগ হতে থাকে।
সারাদিন সবাই শুধু পড়ার কথা বলো, আার তবলা বাজানো, আবৃত্তি করা ওসব তো হাইলাইট করো না তোমরা। তোমরা সবাই খারাপ, তোমরা ভীষণ বিচ্ছিরি আর পচা।
আংকেল থামে না। বলে, পড়ার এতো লোড ওরা নিতে পারে?
বাড়ির বড়রা সবাই একমত হলেন। সত্যিই তো ছোট ছোট এইটুকুন বাচ্চারা পিঠি টাউস ব্যাগ নিয়ে স্কুলে এত বোঝা কি ওরা বইতে পারে?
ভেরি ভেরি ইম্পরটেন্ট মানুষের কথা শুনে মোমবাতির মতো গলে যেতে থাতে চম্পক।
খাবার টেবিলে মজার ঘটনা ঘটতে থাকে একের পর এক।
কাচের গ্লাসের ভেতরে ন্যাপকিনগুলোকে মা গোলাপ ফুলের মতো সাজিয়ে দিয়েছেন। সোমু আংকেল হাতের কৌশলে ইঁদুর বানিয়ে ফেলল-ওদের। সবাই অবাক হয়ে অপলক তাকিয়ে থাকে। ঠাম্মা বলেন, এ মা ছি: ছি:। ভালো ভালো জিনিস বানিয়ে দেখা রে সোমু। সাপ-ব্যাঙ দেখাস না বাপু। ছোটকা বলে, এ তো কাপড়ের ইঁদুর মা, অসুবিধে নেই।
খাওয়া শেষ করে ডিল্লিশাস ডিল্লিশাস বলে বেসিনে হাত ধুতে গেল আংকেল। ঠাম্মার বানিয়ে দেয়া সুগন্ধি মশলা মেশানো পান খেয়ে ফের জমিয়ে বসে।
এক গ্লাস জল খেয়ে ছোখের পলকে দশ গ্লাস ভর্তি দুধ টেবিলে চলে এল। সবার সামনে শূন্য গ্লাস কিভাবে দুধে ভর্তি হয়ে গেল ভেবে থই পায় না।
আংকেল বলে, কি রে,Ñআরও দুধ চাই? আরও? এরপর আংকেল বলে, চম্পুÑতুমি কি ফ্রিজ থেকে ডিম বের করেছ?
Ñআমি? কই না তো।
কী লজ্জার কথা। ওর পকেট থেকে একটির পর একটি ডিম বেরুতেই থাকে।
ওরি ব্বাস! কী যে অদ্ভুত সব কান্ড ঘটাতে থাকে সোমু আংকেল। মলিনমুখো যে মাÑসবাই যাকে মিমি বলে ডাকে, যে কিনা পড়াশুনা ছাড়া কিছুই বোঝে নাÑসেই মায়ের আঁচল থেকে যখন ডানা ঝাপটানো কবুতর, প্রজাপতি, একশ আর পাঁচশ টাকার নোট বেরোতে থাকে-তখন খিলখিল করে হাসতে থাকে মা। মায়ের এমন মিষ্টি হাসি কখনোই শোনেনি চম্পক।
সব কিছু কি সোমু আংকেলের ম্যাজিক?
কি যে ভালো লাগে চম্পকের। মাকে দেখতে ঠিক ছোট্ট খুকুর মতো লাগে।
রাত বাড়ছে। এক সময় হাসিমুখে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল সোমু আংকেল। চম্পকের বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করতে থাকে। রাত আরও গাঢ় হয়। চারপাশটা একেবারেই যেন শূন্য হয়ে গেল। হাওয়ার বাঁশিতে মৃদু ও করুন সুর বাজতে থাকে।
চম্পকের কান্না পায়। ভীষণ কান্না। ওর কোঁকরানো চুলে ঠোট্ট চিবুকে পিঠে এখনও যেন ম্যাজিকের ছোঁয়া লেগে আছে। আংকেল যাবার আগে আদর করে বলেছে, শুধু পড়লেই কি বড় হওয়া যায় রে? হ্যাাঁ Ñপড়াশুনা করা দরকার অনেক কিছু জানার জন্য। কিন্তু তুমি জীবনে তাই করবে –যা তোমার করতে ভালো লাগবে। ফুটবলের ম্যারাডোনা, ক্রিকেটের ম্যাকগ্রেথ ওদের কথা ভাবো তো চম্পক।
সত্যি ছোটকার ছেলেবেলার প্রাণের বন্ধু জাদুকর আংকেল নতুন এক দুয়ার যেন খুলে দিয়েছে ছোট্ট ছেলেটির সামনে।
সোমু আংকেল গল্প শুনিয়েছে, Ñ‘পনেরো বছরের ম্যাকগ্রাথ তখনও ক্রিকেটের বাইশ গজ জমিতে ঝড় তুলেনি, বাচ্চা ছেলে ট্রেনিং দেয়ার সময় ক্যাপ্টেন বলেছিলেন,Ñআর যাই হোক তোমাকে দিয়ে বোলিং হবে না। যাও পারলে সাঁতার কাটো গে। তোমার টিঙটিঙে শরীর নিয়ে ওখানে কিছু করতে পারবে। ব্যাট-বলে তিনি যে আলো ছড়াবেন তা বুঝতে পারেননি ক্যাপ্টেন। সফল ফার্স্ট বোলার বলা হয় ডেনিস লিলিকে, ম্যাকগ্রাথ তাকেও ছাড়িয়ে গেছেন। ’
স্বপ্নে দেখা সেই বিশাল দৈত্যটা মিষ্টি করে জিজ্ঞেস করেছিল,Ñ তুমি কিছু চাইবে না চম্পু?
সেদিন ওর ‘পড়াটা’ শুধু চাওয়ার ছিল। কিন্তু সে তো বাজার থেকে, শপিং মল থেকে কিনতে পাওয়া যায় না। তাই দৈত্যটির কাছে কিছুই চাইতে পারেনি সে।
আজ এই শীতের গভীর রাতে কিছু চাইতে ওর ইচ্ছে করছে।
Ñহ্যাাঁ-আমি ম্যাজিশিয়ানকে চাই। সোমু আংকেল আবার আসুক, বারবার আসুক। নতুন নতুন সত্যিকারের গল্প শোনাতে আসুক। আশ্চর্য্য সব খেলা দেখানোর সাথে সাখে মানুষকে কী অদ্ভুতভাবে পাল্টে দিতে পারে আংকেল। ছোট্ট চম্পকও একদিন সন্ধ্যা রাতেই অনেকখানি পাল্টে গেছে। ও সারাদিন মন দিয়ে চাইতে থাকে, ফেড জিনসের প্যান্ট পরে, চকরা বকরা গেঞ্জি পরে, তেল পিছলানো জুতো মচমচ করে. রাশি রাশি কথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে সোমু আংকেল রোজ আসুক। আসুক ম্যাজিশিয়ান তার ম্যাজিক স্টিক নিয়ে।
ওয়েলকান জাদুকর। তুমি এসো, বার বার এসো তোমার জাদুর কাঠি নিয়ে।
জলভরা চোখে চোখ নিয়ে গাঢ় নিঝুম রাতের দিকে তাকিয়ে চম্পক বলে,
Ñসোমু আংকেল তুমি আসবে তো? প্লিজ তুমি এসো।