ব্যক্তিগত গদ্য-আমাদের মায়াবী শহর

ধ্রুব এষ
এই শহরে জন্মেছি এবং এই শহরে বড় হয়ে উঠেছি। ফরিদ, তুষার, মান্না, শামীম, অমিয়, রুমেন, রাজীব, আবেদীন বা অঞ্জন, এরা যত সহজে বলতে পারবে, আফসোস, আমি এত সহজে বলতে পারব না। এই শহরে আমি জন্মেছি এবং কিছুদূর বড় হয়েছি। পরের অংশ দূরের এক শহর না, নগরে। এত দূরে, এই নগর থেকে দূরবিন দিয়েও আমাদের শহর দেখা যায় না। তাও দেখি। দূরবিন লাগে না, গুগল আর্থ লাগে না, দেখতে পাই আমাদের শহরকে। খুবই স্পষ্ট ভাবে দেখতে পাই। আমার এই আমাদের শহরে এখনও আকল পন্ডিত হেঁটে বেড়ান, পিআই স্যার (শামসুদ্দীন আহমদ) জুবিলী স্কুলে অংকের ক্লাস নেন, মাতাল বোঁচাদা রোজ সন্ধ্যায় ‘লেকচার’ দেয় বাজারের পয়েন্টে, ফাঁকা স্টেডিয়ামে একা বসে থাকেন সুইপার কলোনির কাল মার্কসের মতো দেখতে মানুষটা, মমিনুল মউজদীনের শাদা গাড়ি যায় জোছনায়। আরও কত কি।
আমি এখন একটা উপন্যাস লিখছি আমাদের এই শহরটা নিয়ে। উপন্যাসের শুরুটা এরকম,
জাতির বিবেকের বউ আবার পোয়াতী।
আকল প-িত এখনও মরেন নাই।
হাছননগরের অমুকের মেয়ে অমুকা পালিয়ে গেছে কুড়িয়ারপাড়ের তমুকের ছেলে তমুকের সঙ্গে।
মুস্তফা ফোন করে এসব বলল।
ঘটনাটা কী?
আমাদের শহরে দেখি অনেকদিন ধরে তেমন কিছু ঘটে না।
…উপন্যাসের শুরুটা এরকম হলেও ঘটনা কিন্তু ঘটে। আমাদের শহরের মতো একটা শহরে নানা পদের ঘটনা ঘটবে না? যা যা ঘটে আমি সব কি লিখব? না। উপন্যাসের কাঠামোর বাইরে যাবে, মানে আমার যা পরিকল্পনা, এর বাইরে কিছুই লিখব না। কিছু ভালোমানুষের কথা লিখব,  কিছু জোচ্চোরের কথাও লিখব। লিখব ছোটবেলার একটা বন্ধু বড় হতে হতে কী করে একটা ‘বেজন্মা’ হয়ে যায়। বেজম্মা। বাস্টার্ড। বানিয়ে কিছু লিখতে হবে না, উপন্যাসের রসদ মজুদ শহর আমাদের। একটা না, অনেক উপন্যাস লেখা যায়। হাসন রাজা, রাধারমণের দ্যাশ, এই দ্যাশে কী বড় একজন ঔপন্যাসিক কখনোই জন্ম নেবেন না?
নিশ্চয়ই নেবেন। এবং নিশ্চয়ই উপন্যাস, মহাকাব্যিক, মহৎ উপন্যাস লিখবেন আমাদের শহরটাকে নিয়ে। আমি লিখব আমার যেটুকু সাধ্য। নগন্য মানুষ। ব্যক্তিগত বোঝাপড়া নিয়েই লিখব। দেখাশোনা মানুষজন এবং বন্ধুদের নিয়ে।
দেখাশোনা মানুষ।
রিকশাঅলা সাধু কাকার কথা কি লিখব?
লিখব।
ডাকবাংলোর বাচ্চু ভাইয়ের কথা কি লিখব?
লিখব।
কোর্ট প্রাঙ্গনের মেয়েদের কথা কি লিখব?
লিখব।
বন্ধুদের কথা?
ফরিদ, মান্না, বাপি, মৃদুল, তুষার, নাসের, রাহুল, মুস্তফা?
এদের কথা না লিখলে আমার উপন্যাস হবে নাকি?
আর বেজন্মাটার কথা যে বললাম? গার্লস স্কুলের পয়েন্টের বেজন্মা?
লিখব না কেন? তার কথাও অবশ্যই লিখব। ছোটবেলার বন্ধু, বেজন্মা হয়ে গেছে। বেজন্মা বলছি। এটা কি কম কষ্টের? আমি আমার কষ্টের কথা লিখব না? একদা চোর প্রবাসী বেজন্মাটা, নকল মানুষ, মাঝখানে দেশে ফিরে একবার যে ভোগান্তিতে ফেলেছিল আমাকে, কিছু গুরুজন সহায় না থাকলে, জেলের ঘানি টানতে হতো এতদিনে।
সুমু, সুমিত এষ। আমার ছোট ভাই। তার বিয়েতে অনেক বছর পর মাত্র দুই দিনের জন্য গিয়েছিলাম আমাদের শহরে। আমার সঙ্গে ছিলেন কবি নাসের মাহমুদ। কবি এবং আমাকে ‘মা’ ডাকেন ইনি। কিন্তু সে অন্য কথা। শহরের দিন দুটোর কথা বলি। কী বলব? দিন দুটো পরাবাস্তবের মতো কেটেছে। এত মায়াময়! এত মায়াময়! কতজনের সঙ্গে দেখা হয়েছে। কতজন বুকে জড়িয়ে ধরেছেন। এত মায়ার কথা কী লিখব না? আমার নিরীহ ভালোমানুষ বাবাকে একবার অপমান করেছিল কিছু অমানুষ, তারা কারা, কোন অ-পাড়ার, সব লিখব। আমাদের শহরের সব মনে থাকে আমার। মনে থাকবে। লিখব। লেখার জন্য যে ফরমেটটা নিয়েছি, কী বলা যেতে পারে এটাকে? সন্দীপন চট্টোপ্যাধায় একটা চমৎকার টার্ম ব্যবহার করেছেন, ‘জীবনীমূলক আত্মোপন্যাস’। আমাদের শহর নিয়ে আমি আসলে একটা ওই জীবনীমূলক আত্মোপন্যাসই লিখছি। চরিত্রদের নাম পরিচয়? ফরিদের নাম ফরিদই থাকবে। মান্নার নাম মান্নাই থাকবে। লিখন, মুস্তফা, সুধাংশু, মিসবাহ,Ñ লিখন, মুস্তফা, সুধাংশু, মিসবাহই থাকবে। বেজন্মাটা?
স্বার্থান্ধ বাস্তবতা! আমার সঙ্গে কী করেছে জানে, তাও আমার বন্ধুদের মধ্যে এমন বেজন্মারও শুভাকাঙ্খী থাকে। কাল তেমন একজন, ফোনে কথাবার্তা উপন্যাসের কথা উঠতেই বলল, ‘ঘটনা লিখ ঠিক আছে, কিন্তু নাম-টাম দেওয়ার কী দরকার?
আমি তাজ্জব। জেলজুলুমের কথা বলেছি, বেজন্মাটা যে ‘প্যানিক’ দিয়ে গেছে, নিতে পারিনি, স্বাভাবিক হতে হয়েছে একজন কাউন্সিলরের (মানসিক চিকিৎসক) কাছে গিয়ে, এর নাম আমি আমার জীবনীমূলক আত্মোপন্যাসে লিখব না?
লিখবই।
প্রগাঢ় পিতামহীর মতো চোখ ওল্টানো এক বীমার দালাল বন্ধুর কথাও লিখব। মহৎপ্রয়াণ বিদুৎকান্তি রায়, অকাল প্রয়াত আপ্পাদার কথাও লিখব। লিখছি।
আড়াই ফর্মার মতো লেখা হয়ে গেছে। উপন্যাসের নাম এখনও চূড়ান্ত করে উঠতে পারিনি। খসড়া একটা নাম দিয়ে রেখেছি আমাদের মায়াবী শহর। শেষতক হয়ত এই নামই থাকবে। আমাদের শহর-তো মায়াবী শহরই। এত মায়াবী শহর আর হয়?
ভালো লিখি, মন্দ লিখি উপন্যাসটা যেন লিখে শেষ করতে পারি, আমাদের শহরে মানুষ, আপনারা আমার জন্য দোয়া- আশীর্বাদ রাখবেন। মায়া রাখবেন।